দয়াল খ্যাপা সাধন দাসের আস্তানাতে বসে যে গান আমাকে শুনিয়েছিলেন সেখানেও রাধা কিন্তু শরীরের পদ্মচক্রেই রয়েছেন আর কৃষ্ণকে পদকর্তা রসাকার করেছেন। অর্থাৎ শুক্ররক্ষার চিহ্নস্বরূপ কৃষ্ণ দাঁড়িয়ে আছেন সাধক রাধার শরীরস্থ পদ্মচক্রগুলোকে–’প্রেম সুখদ্বার কৃষ্ণ রসাকার রসনাতে তার কর আস্বাদন/ সে যে যোগাযোগ-স্থলে মৃণাল পথে চলে/ সহজ কমলে সুধা বরিষণ।
কৃষ্ণের চলাচলকে ‘মৃণাল পথ’ হিসাবে চিহ্নিত করেছেন পদকর্তা হাউড়ে গোঁসাই। মৃণাল পদ্ম। তাহলে দেখা যাচ্ছে কৃষ্ণপথ পদ্মচক্রেরই পথ। কৃষ্ণবস্তুর রসনা আস্বাদন এই পথেই সম্ভবপর। ‘কৃষ্ণ রসাকার’ বলবার কারণ কৃষ্ণ হল শুক্রবস্তু। রজকেও বাউল রস বলেন। মূত্রও তাঁর কাছে রস। শরীরস্থ পদার্থ বাউল শরীরেই ফিরিয়ে নেন। তিন রস শরীরস্থ পদার্থই। বাউল সাধক শুক্ররস ব্রহ্মরতে উঠিয়ে নিতে পারেন। মূত্রও শিক্ষা দীক্ষার সময় পান করে শরীরে ফিরিয়ে নেন তিনি। তবে বাউল সঙ্গিনী রজ পান করেন বলে কোনোদিন শুনিনি। সঙ্গিনী মূত্র ও মলও শরীরে ফিরিয়ে নেন না। এ কার্য কেবল বাউল সাধকেরই। সঙ্গিনীর নয়। যুগল মিলনকে, সম্ভোগকে বাউল বলেন ‘অপ্রাকৃত মিলন’। তাঁদের মতো শরীরে শরীরে মিলন হয় না, মিলন হয় আত্মায় আত্মায়। আত্মার। সঙ্গেই আত্মার রমণ চলে। এভাবেই প্রাকৃত দেহ ভাবদেহ হয়ে ওঠে। এই দেহস্থ মিলনের অপার মহিমা কেবল রসিক হলেই জানা যায়। রসিক হল রসধারণকারী মানুষ। বীর্যরক্ষার মানুষ। কৃষ্ণ সাধনের মানুষ।
মৃণাল-পথে কৃষ্ণ-যোগাযোগ কীভাবে হয় বাউল সাধকের? সাধক বলেন অন্ত্রে বায়ুর প্রকোপ কমিয়ে এনে দেহকে সর্বপ্রথমে হালকা করতে হয়। দেহের মধ্যে বায়ু উনপঞ্চাশের প্রধান পাঁচটি নিয়ে সাধক শুরু করে দেন দেহসাধনা।
পাঁচ গুরুত্বপূর্ণ বায়ুর(প্রাণ, অপান, সমান, ব্যান, উদান) প্রধান দুই বায়ুর (প্রাণ, অপান) যে শ্বাসক্রিয়া তা চলে আবার শরীরের প্রধানা তিন নাড়িকে ঘিরেই। ইড়াতে চলতে থাকে প্রাণ বায়ুর ক্রিয়া। অপান বায়ুর ক্রিয়া হয় পিঙ্গলাতে। শ্বাস যখন নেওয়া হয় তখন প্রাণ বায়ু অপান বায়ুকে টেনে একেবারে নীচের দিকে নামিয়ে দেয়। শ্বাস ছাড়ার সময় প্রাণ বায়ু অপান বায়ুকে উপরে উঠিয়ে দেয়। শ্বাস উপরে ওঠাকে আমরা বলতে পারি চেতনার বিকাশ। প্রাণ বায়ু থাকে হৃদয়দেশে। অপান বায়ু গুহ্যদেশে। সাধক প্রাণ বায়ুকে ‘রা’ বলেন আর ‘ধা’ হল অপান বায়ু। দিনরাত আমাদের শরীরে দুই বায়ুর খেলা চলছে। সদানন্দ বাবাজি আমাকে বলেছিলেন, কৃষ্ণের লীলা হয় গো শরীরে। রাধার সঙ্গে খেলে।
জিজ্ঞাসা করেছিলাম, কৃষ্ণপ্রাপ্তি কীভাবে হয়?
বললেন, কৃষ্ণ হল গিয়ে আত্মসাক্ষাৎকার। তা হয় কুম্ভকে।
বললাম, কীভাবে হয় তা?
–তা বাবা এ তো বলে বোঝানো যাবে না। এ যেন করণক্রিয়া।
বাবাজি হাসলেন। আমি তাঁর হাসির রেখায় যেন দেখলাম আত্মসাক্ষাৎকারের প্রতিবিম্ব সব জড় হচ্ছে।
— শরীরে সব সময় রাধা নাম চলে।
শ্রীপাঠের বৃদ্ধা বৈষ্ণবী আমাকে বলেছিলেন।
–কীভাবে চলে?
–অভিমান, অভিসারে। এই অথর্ব শরীর এখনও অভিসারে যে বের হয়। তাঁর জন্যই তো অসুস্থতাতেও বেঁচে থাকা বাঁচার ইচ্ছা।
বৈষ্ণবীয় ‘অভিমান’ ‘অভিসার’কে আমরা যদি সংগ্রাম ধরি তাহলে বিষয়টি স্পষ্ট হবে আরও কীসের এই সংগ্রাম? না হয় সহজিয়া মত নিয়ে প্রেম সংগ্রামই আমরা ধরলাম।
সাধক বলেন জীবাত্মা বিস্তৃতপ্রায় হয়ে এলেই তবে পরমাত্মার সাক্ষাৎ পাওয়া যায়। আসলে যেটা হয়, প্রাণ বায়ু অপান বায়ুকে কাছে টানে। ভাবি যদি প্রতীককল্পে তবে দাঁড়ায় এই : ‘রা’ টানছে ‘ধা’ কে। রাধাকে উল্টোলে হয় ধারা। অর্থাৎ অব্যাহত। এই টানাটানি সব সময় চলে। এই টানকে বৃদ্ধা বৈষ্ণবীর বিশ্বাসের বা প্রতীকী কল্পনার অভিমান, অভিসারও ধরা যেতেই পারে। টানার এই অভিমানে, অভিসারে যেটা হয় তা হল–এক সময় যোগে অপান বায়ুর পরাজয় ঘটে। প্রেম সংগ্রামে অপান বায়ু নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে। প্রাণ বায়ু বিজয় লাভ করে। অপান বায়ু না থাকায় তখন ক্রিয়া চালানোর ক্ষমতা থাকে না সাধকের। শ্বাস প্রশ্বাস ক্রিয়া বন্ধ হয়ে যায় দেহসাধকের। এই দশাকে সাধকরা বলেন কুম্ভক। কুম্ভকে জলপূর্ণ কলসির ন্যায় বায়ু ধারণ করে রাখা হয় শরীরে। সাধক এখানে শ্বাস প্রশ্বাসের ক্রিয়া বন্ধ করে দিয়ে কুম্ভকের মতই পূর্ণ হয়ে ওঠেন অতীন্দ্রিয় তরঙ্গে। সদানন্দ বাবাজি একেই বলছেন কৃষ্ণ। আত্মসাক্ষাৎকার। সাধক এই দশাকে হংস বলে থাকেন। হং হল শ্বাস, স হল প্রশ্বাস।
‘হংকারো নির্গমে প্রোক্তঃ সকারন্তু প্রবেশনে। / হংকারঃ শিবরূপেণ সকারঃ শক্তিরুচ্যতে।।’ শ্বাস পরিত্যাগ করে যদি আর গ্রহণ না করা হয় তবে তাঁকে মৃত্যু বলে। হং হল শিবস্বরূপ বা মৃত্যু। স হল গ্রহণ বা শক্তির স্বরূপ। ক্রিয়াযোগ বন্ধ মানেই সাধক জীবাত্মার খোলস ফেলে দিয়ে পরমাত্মাকে লাভ করে ফেললেন যোগবলে। না হলে শ্বাস প্রশ্বাসই তো জীবত্বের দশা। হংসই জীবের দশা। তা থেকে সরে এলে সাধক হয়ে ওঠেন। পরমহংস।
বাউল সাধকও শ্বাসক্রিয়াতেই ‘সহজ কমল’ লাভ করেন। তার সুধা অনুভব করতে পারেন। পদকর্তা তাই বলেছেন–’সর্ব ঘটে বটে পটে পট্ট স্থিতি / শক্তিতত্ত্ব গুণে আনন্দ মুরতি।‘ ‘সর্ব ঘট’ দেহের চক্ৰন্থ অধ্যায় সব। যে অধ্যায়তেই বায়ুক্রিয়ায় যুগল মিলনে ‘শৃঙ্গার আকার’ সাধারণ জনের না ধরতে পারার কথা বলা হয়েছে গানে। পদকর্তা বলেছেন ‘ইন্দু বিন্দু গতি সদা বিরাজয়। / জীবে নাহি জানে সাধুসন্ত চেনে/ রসপানে জানে তারা অমৃত-সেবন।’
