বলেছিলাম, বাউলের আত্মতত্ত্বের বিকাশ কীভাবে হয়?
বললেন, সহচরীর ভাবনায়।
বললাম, দেহসঙ্গী কীভাবে বাউলকে আত্মতত্ত্বের বিকাশ দিতে পারে?
–দেহ কী শুধু শরীর? দেহ আনন্দস্বরূপ চৈতন্য। যার নারী নেই, পুরুষ নেই।
–একশরীরী মতবাদের কথা বলছেন আপনি?
— যুগল সাধনা তো এক শরীরেরই। এই সাধনায় নারীই ইষ্ট। আবার নারে অন্বিষ্ট। কখনও কখনও অনিষ্টও বটে নারী। নারী গুরু। নারীই দেহ দিয়ে দুই দেহের আত্মসম্বিতকে। এক করে দেন। চণ্ডীদাসকে রামী যেভাবে পার করেছিলেন। বিল্বমঙ্গলকে চিন্তামণি। পদ্মাবতী পার করে দিয়েছিলেন জয়দেবকে। বাউলকে পার করেন তাঁর রাধারানি। রাধারানি মোহ কাটান। আবার তিনিই মোহগ্রস্ত করে দেন। তিনি যে টানেন। কৃষ্ণ যেভাবে। টেনেছিলেন তাঁকে। যুগল সাধনায় এই টানাটানির খেলাতেই যখন দুই দেহ এক হয়ে ওঠে তখনই সাধক তাঁর আত্মতত্ত্বের ব্রহ্মাণ্ডে শুক্রকে জমা করে অটল হয়ে যান। সাধনায় সিদ্ধ হন বাউল। রাধারানি তাঁকে পার করেন।
বলতে বলতে একতারা তুলে নিলেন সাধন। গাইতে লাগলেন। হাটগোবিন্দপুর আশ্রমে বিকেল যেন রাধা হয়ে আসন পাতল সাধনের গলা আর একতারায়।
ওই গোরা কি শুধুই গোরা।
আছে রাধা-রূপে রসান করা।।
তামাতে সোনা হল করিলে চিনে নেওয়া কি কঠিন বলে;
এমনি রাধার অঙ্গ,অঙ্গ পরশিলে তাইতো কালোরূপে গৌর রূপের পারা।
আহা মরি মরি, এ কি রে ভাব অন্য, অন্তরে কালো রূপ বাহিরে গৌরাঙ্গ;
গোরা পেয়েছিল ভালো ভাবিনীর সঙ্গ তাইতে রূপে রূপ ব্যেপে রেখেছে ধরা।।
গোরার ভাব বুঝিতে পারে কে এমন ছিল পুরুষ করল নারীর বেশ ধারণ,
গুরু অনুসারে কহিছে লালন, আছে শতদলে ভাব নিহারা।
নটবরের গানে আমরা কৃষ্ণকে প্রকৃতি হিসাবে পেয়েছিলাম। অর্থাৎ রাধা যেন। ধরে আছেন কৃষ্ণকে। চালিত করছেন। তাঁর সাধনাসম্পৃক্ত দেহ, দেহী সাধকের যুগলে সাধনবস্তুকে কৃষ্ণানুষঙ্গের পরিমণ্ডল দিচ্ছেন। পদকর্তা দুদ্দু বলছেন–’কৃষ্ণবস্তু নিগম ঘরে জীবদেহে বিরাজ করে/ রসিকের করণ সে কৃষ্ণ ধারণ করণ গম্ভীর অতি।‘ ‘কৃষ্ণ ধারণ’ বস্তুরক্ষা। আর এই বস্তুরক্ষা আত্মতত্ত্বকে না জানলে কখনও সম্ভব নয়। আত্মতত্ত্বতেই তো ইন্দ্রিয়ের আসক্তি নাশ হয়। কামেন্দ্রিয় প্রেমেন্দ্রিয়তে রূপ পায়। রূপের দরজা দিয়ে সোজা এগোলেই তখন প্রতিভাত হয় কৃষ্ণ, যিনি লালনের কথা অনুযায়ী রাধা-রূপে রসান করা।
ব্রহ্মবৈবর্তপুরাণে শ্রীকৃষ্ণজন্মখণ্ডে আছে–’কুম্ভকার বিনা-মৃত্তিকায় ঘট করিতে পারে না, স্বর্ণকার স্বর্ণ বিনা কুন্ডল গড়িতে পারে না। তেমনই আমি তোমা ব্যতীত সৃষ্টি করিতে পারি না। আমি যখন তোমা ব্যতিত থাকি, তখন লোকে আমাকে ‘কৃষ্ণ’ বলে, তোমার সহিত থাকিলে শ্রীকৃষ্ণ বলে…তুমি বিশ্বের মূল প্রকৃতি… এই বিশ্বের সমস্ত স্ত্রী তোমার কলাংশের অংশকলা যেমন দুগ্ধ ও ধবলতা, তেমনই যেখানে আমি, সেইখানে তুমি। আমি দীপ্তিমানদিগের মধ্যে সূর্য, তুমি সঙ্গে থাকিলে আমি দীপ্তিমান হই, তুমি না থাকিলে হই না।
দুদ্দু শাহের গানে যে ‘কৃষ্ণ প্রকৃতি’ সে কৃষ্ণ কৃষ্ণত্বের আমির ‘তোমা ব্যতীত’ থাকা ব্রহ্মবৈবর্তপুরাণ অনুযায়ী। আবার সাধন দাস বাউলের গানে যে কৃষ্ণরূপ দেখি–’ওই গোরা কি শুধুই গোরা। / আছে রাধা-রূপে রসান করা। এই রস ব্রহ্মবৈবর্তপুরাণ অনুযায়ী ‘তোমার সহিত থাকিলে’র রসস্থ কৃষ্ণ।
রামকৃষ্ণদেব বলেছেন–’অনন্ত রাধার মায়া কহনে না যায়/ কোটি কৃষ্ণ কোটি রাম হয় যায় রয়।।‘ রাধার এই মায়াকে যদি কৃষ্ণ ও রামের রক্তমাংসে স্থাপনা করি তবে সাধনের গাওয়া লালনের গানটিই সামনে আসে–’এমনি রাধার অঙ্গ, অঙ্গ পরশিলে তাইতে কালো রূপে গৌর রূপের পারা।।‘ গৌর তো গৌরাঙ্গ স্বরূপ ঠিকই কিন্তু সেই গৌর ‘অনন্ত রাধার মায়া’ নিয়েই প্রতিভাত বাউলের কাছে। ‘রাধার মায়া’ বাউল সাধকের ‘রাধারানি’। স্বামী বিবেকানন্দ বলেছিলেন–Radha was not of flesh and blood, Radha was froth in the ocean of love.’ রাধা রক্তমাংসের নয়, প্রেমসাগরের একটি বুদবুদ। বাউল সাধকের প্রেম দুদ্দু শাহের গানে বর্ণিত ‘আত্মতত্ত্ব’ জেনে ‘কৃষ্ণ-সেতু’ চিনে নেবার প্রেম। কৃষ্ণ-সেতু কৃষ্ণবস্তুর গৌরবী সমুজ্জ্বলতা। কৃষ্ণ মুখ্যত একটা প্রতীকী সাবয়ব নিয়ন্ত্রণের ধারা। যুগল সাধনায় এই নিয়ন্ত্রণ ইন্দ্রিয়ের সীমানাগুলোতে সচেতন অস্তিত্বের সহসা সঞ্চারণ যেন। অস্তিত্ব দেহসাধকের ‘আত্মতত্ত্ব’। যা কিনা ‘কৃষ্ণ সেতু’কে নির্ণয় করতে পারে। ঋগ্বেদে রাধা কথার অর্থ করা হয়েছে ধন বা ঐশ্বর্যের দেবী-রা-ধা, রয়িং বা রায়।
এই দেবীরূপ দেহস্থ চক্রের মধ্যস্থ বিভিন্ন শক্তির ভেতর দেহসাধক কল্পনা করেন। ডাকিনী, হাঁকিনী, লাকিনী ইত্যাদি নাম্নী শক্তিরূপের কথা আমরা বলেছি, যা কিনা চক্রপদ্মে অবস্থিত। ঋগ্বেদে রাধাকে যে ধন বা ঐশ্বর্যের দেবী বা অধিষ্ঠাত্রী হিসাবে দেখানো হয়েছে সেই ঐশ্বর্য কিন্তু দেহসাধক অনাহত পদ্মচক্রে ধ্যানে লাভ করে থাকেন। তাহলে দেখা যাচ্ছে রাধাও পদ্মচক্রে অধিষ্ঠান করছে। নাড়ি জাগৃতিতে তাঁকে তো আমরা ইতিমধ্যে বিশিষ্টতার স্থান দিয়েই দিয়েছি। বাউল সাধক রাধাকে পদ্মচক্রে প্রতীকী করে রেখে কৃষ্ণকে জাগৃতি দিয়েছেন উৰ্দ্ধরেতাতে। কৃষ্ণ মদনমোহন কেন? কারণ তিনি কামকে মোহিত করে নিচ্ছেন। কামকে বশীভূত করে রাখছেন। আর এই কাম আসছে কোথা থেকে? আসছে কিন্তু সঙ্গিনীর শরীর থেকেই। তার জন্যই সাধক বাউল সঙ্গিনীর শরীরের কামকে সাড়ে চব্বিশ চন্দ্ৰস্পর্শে একেবারে ভোঁতা করে দেন। সঙ্গিনীর কামকে বাউল সাধক ভোঁতা করেন। তাহলে দাঁড়ালো, রাধাই মদনমোহন। কারণ রাধার কামকেই বাউল ভোঁতা করে দিচ্ছেন কিন্তু। বাউলের পদে রাধা যে পদ্মচক্রে শরীরস্থ হয়ে রয়েছেন যে কথা তো বললামই। তেমনই একখানি গান ফটিক গোঁসাইয়ের–’আমার দয়া, ও দয়া কর। বৃন্দাবন বিলাসিনী রাই। / রাধে গো রাধে প্রেমময়ী, তুমি মৌন ভাবে মনমোহিনী/ তুমি চতুর্দলে কুণ্ডলিনী তুমি স্বাধিষ্ঠানে নারায়ণী/ তুমি দশম দলে কালরূপিনী তুমি হৃদকমলে কমলিনী/ রাধে আমায় দয়া কর হে, রাধে গো।।/ তুমি বিশুদ্ধাখ্যে পঞ্চাননী, দ্বিদলে আনন্দরূপিনী/ সহস্রারে ব্রজবিলাসিনী, রাধে আমায় দয়া কর হে, রাধে গো।।‘
