কৃষ্ণকে সাধক শরীর আমরা ধরেছি আগেই। গোপীরা সব নাড়ি। কৃষ্ণ শরীরস্থ আত্মা বা অনুভব। যোগের প্রসারিত অঞ্চল সব। দেহস্থ নাড়িগুলো গোপী সেজে কৃষ্ণকে সবসময়ই বিরক্ত করেন। সাধকের বিরক্তি এতে। নাড়ি অর্থাৎ কিনা গোপীরা সব যোগক্রিয়াতে সাড়া দিচ্ছে না ঠিকমতো। চক্ৰস্থ শক্তিগুলোকে দেহসাধক একীভূত করে নিতে পারছেন না কিছুতেই। তাই তাঁদের শিক্ষা দেবার জন্য, উপদ্রব কমাবার জন্য কৃষ্ণ তাঁদের পাশমুক্তি দিয়ে বসলেন। এই পাশমুক্তি হল আবরণ উন্মোচন। বাসনার বস্ত্রকে সাধনার শরীর থেকে টেনে খুলে ফেলা। নাড়িগুলো যদি গোপী হয়, তাহলে তো কৃষ্ণ তাঁদেরই কাপড় সব টেনে খুলে একেবারে ন্যাংটা করে দিচ্ছেন। আবার নাড়িগুলো যদি প্রতীকী আবরণের গোপী হয়, তাহলে তো কৃষ্ণ তাঁদের সঙ্গে লীলাও করবেন না কী! কীভাবে করবেন সাধক কৃষ্ণ এই লীলা?
গোপীদের বশ করে নেবেন তিনি। বস্ত্র যদি বাসনা হয় তাহলে বাসনা মুক্ত শরীরে সর্বদাই চলবে নাড়িগুলোর ছন্দগত ক্রিয়াকরণের সব লীলা। এঁদের মধ্যে তো রাধাও বর্তমান ভেবে নিয়েছিলাম আমরা। দাঁড়াল এই–সাধক কৃষ্ণ মহিমায় মহিমান্বিত। হয়ে এভাবেই গোপীরূপী সব নাড়ি আর রাধারূপী সুষুম্নার সঙ্গে বিশেষ লীলা করে থাকেন। সুষুম্না হল প্রধানা নাড়ি। তাঁর দুই পাশে ইড়া, পিঙ্গলা। রাধার অষ্টসখিকেও নাড়ির প্রতীকী অবয়ব দিয়েছি আমরা। ইড়া, পিঙ্গলাও তাহলে এই অষ্টসখিরই অন্তর্গত।
কৃষ্ণের যে কালীয়দমন তাঁকে তো আমরা কুণ্ডলিনীর পাশ খোলাও অনায়াসে ধরতে পারি। শিবের গলার সাপকেও একই অভিধায় রাখতে পারি। ত্রিশূল দিয়ে দুর্গা। অসুরকে বধ করেছিলেন। ত্রিশূলের ‘ত্রি’ কে যদি আমাদের সত্ত্ব, রজ, তমগুণ সব ভাবি তাহলে ত্রিশূল দিয়ে দুর্গা অপান বায়ুকে বধ করেছিলেন। প্রাণায়াম, যোগে একে তো বশীভূত করা, পরাস্ত করা একান্তই জরুরি। অসুরকে তো অপান বায়ুর প্রতীকময়তা আমরা আগেও দিয়েছি। কুণ্ডলিনী তো সাপের মতই পেচিয়ে থাকে। সমুদ্রমন্থনের গল্পটি যদি এ প্রসঙ্গে আমরা মনে করি তাহলে দেখব সমুদ্রকে মন্থন করা হচ্ছে সাপ দিয়েই। বাসুকি যার নাম ছিল। সমুদ্রকে যদি সাধকের স্থূল দেহ মনে করি তবে তাঁকে মন্থন করা হচ্ছে। আমাদের শরীরের যেসব ইন্দ্রিয় তা যদি সাধক মন্থন করে নেন তবে সেই মন্থনেও হলাহল ও অমৃত দুই-ই তো উঠবে। অমৃত হল সিদ্ধির দিব্যতা বা জ্ঞান আর হলাহল বা বিষ হল বশীভূত সত্তা। যার মোহ সাধককে কাটাতে হয়। কুলকুণ্ডলিনীকে সর্প আকার দিয়েছি। যোগে তা জাগলে রস ক্ষরণ হতে থাকে সব, যা মদ্যর নামান্তর (‘সোমধারা ক্ষরে যাতু ব্রহ্মরন্ধ্রাদ বরাননে।‘) তাহলে দাঁড়াল এই–শরীররূপী সমুদ্রমন্থনেই। প্রতীককল্পের বিষ ও অমৃত উঠে আসছে সব। কুণ্ডলিনী বেঁকিয়েচুরিয়ে সর্পগতিতে হিস হিস ধ্বনিতে চক্ৰস্থ শক্তির দিব্যতা সাধক অমৃতস্বরূপ পান করছেন। আর তাঁর জন্যই তন্ত্রসাধক করছেন মদ্য, মাংস, মৎস্য, মুদ্রা, মৈথুনরূপী পঞ্চ ‘ম’ কারের সাধনা। বৈষ্ণবসাধকও ভিন্ন প্রতীকী অর্থে করেছেন একই সাধনা। বাউল সাধকও তাই করছেন। সকলেই ষড়রিপু, অষ্টপাশ, পঞ্চভূতকে নিয়ে দেহস্থ উপাচারে ব্রতী হচ্ছেন। আমরা সচ্চিদানন্দের কথা এর আগেও বলেছি। সৎকে নিউট্রন, চিৎকে প্রোটন ও আনন্দকে যদি ইলেক্ট্রন হিসাবে বিজ্ঞানের প্রতীকী অবয়ব পরিয়ে দেখি তাহলে দেখব এই সকল সৎ, চিৎ, আনন্দ শূন্যতার মধ্য থেকে বস্তুহীন প্রবাহে ধাক্কা খেতে খেতে পুঞ্জ পুঞ্জ বস্তুফেনা নিয়ে বিন্দু হিসাবে প্রতিভাত হচ্ছে। এই তিনভাগকে যদি ত্রিভঙ্গ হিসাবে ভাবি তাহলে রাধাকৃষ্ণের যুগল মূর্তিখানির যে ত্রিভঙ্গ মুরতি নাম তাঁর প্রতীকী অর্থময়তাও স্পষ্ট হবে। তিনের যোগফলে ত্রিভঙ্গ যা কিনা ধাক্কায়, আঘাতে বেঁকেচুরে যাচ্ছে। ত্রিভঙ্গর মানেও তো তাই, তিন অংশে বাঁকা। তাহলে দাঁড়ালো এই–সৎ শূন্যতা/ নিউট্রন + চিৎ/ শক্তিপ্রবাহ প্রোটন+ আনন্দ ভাঙাচোরা বস্তুফেনা/ ইলেকট্রন। এই তিনের একত্র সমন্বয় ত্রিভঙ্গ। নটবর বাউলের বলা কৃষ্ণবস্তুকে কি প্রতীকী ভাবনার বিচ্ছুরণ দিয়ে একেবারের জন্যও এভাবে ভাবা যেতে পারে না।
গানে রীতিমতো প্রশ্ন তোলা হয়েছে যেন–’কোন কৃষ্ণ হয় জগৎপতি।‘ উত্তরও তাঁর সাজানো–’মথুরার কৃষ্ণ নয় সে সে-কৃষ্ণ হয় প্রকৃতি।‘
বাউল বলেন শরীর হল গিয়ে বিশ্বব্রহ্মাণ্ড। এই বিশ্ব আমির স্বরূপকে নিয়ে সাকার হয়ে ওঠে বাউলের কাছে। আত্মতত্ত্ব ধরে থাকে আমি। হুল আমি যখন আস্তে আস্তে প্রবর্তস্তরে গিয়ে মেশে, গুরু হাল ধরেন। ত্রিকাল বিস্তৃত মহেশ্বরের মতোই গুরু আমির তীব্র মুহুর্তের এষণাকে জাগিয়ে দেন। বাউল তখন আমির স্বরূপকে চিনতে পারেন। আমি পঞ্চেন্দ্রিয় বাসনার থেকে মুক্ত হতে হতে, ষড়রিপুকে কম্পমান নক্ষত্রটুকুর আলোবিজ্ঞান পরাতে পরাতে, অষ্টপাশকে প্রসন্ন উন্মেষের কাছে নিয়ে যেতে যেতে ক্রমবর্ধমান আত্মসম্বিতের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে পড়ে। আর তখনই গুরু সাধক বাউলের আমিতে একশরীরী আকুলতার জন্ম দিতে ব্যাকুল হয়ে পড়েন। কীভাবে গুরু সাধক বাউলের আমিতে একশরীরী আকুলতার জন্ম দেন? সাধন দাস বৈরাগ্যকে একবার জিজ্ঞাসা করেছিলাম।
