তন্ত্রেও এই শক্তিগুলোর আনাগোনার কথা বলে থাকেন দেহসাধক। বাউল সাধনের শক্তি এরূপ কল্পিত শক্তি নয়। যোগশক্তি অবশ্যই রেচকে, পূরকে, কুম্ভকে তাঁরা শরীরকে জাগান কৃষ্ণবস্তু রক্ষার তাগিদে। যোগশাস্ত্রে আটপ্রকার কুম্ভকের কথা উল্লেখ আছে তা কিন্তু তাঁরা করেন না। প্রয়োজনই নেই তাঁর। কেননা বাউলের পরম নিরাকার মহাশূন্যতার জ্যোতি কখনওই নয়, তাঁর পরম শরীরে কৃষ্ণবস্তু রক্ষা। নটবর দাস বাউল যুগলমেলায় মঞ্চে যে গান শুনিয়েছিলেন সে গানে স্পষ্টই বলা আছে–’কৃষ্ণবস্তু নিগম ঘরে জীবদেহে বিরাজ করে/ রসিকের করণ সে কৃষ্ণ ধারণ করণ গম্ভীর অতি।’ হৃষীকেশ গোঁসাইয়ের পদে বলা হচ্ছে–’বিন্দুর প্রভাবে/ চৌদ্দভুবন ডুবে যায়। চৌদ্দভুবন হল দুই চোখ, দুই কান, দুই নাক, মুখ, মাজা, লিঙ্গ, যোনি, বুক, স্তন, নাভি, ব্রহ্মরন্ধ্র। যা কিনা যুগলেরই প্রত্যঙ্গ সব। বিন্দুর প্রভাব’–বীর্যর ঊর্ধ্ব ধারা, যাতে দুই শরীর আর বাহ্য শরীর থাকেনা। স্কুল, প্রবর্ত, সাধক পেরিয়ে সিদ্ধ হয়ে ওঠে। আর এখান থেকেই তো প্রশ্ন ওঠে। প্রতিবাদ ওঠে। ঝড় ওঠে নারী বাউল সমাজে। তন্ত্রে ভৈরবীর কিন্তু অতখানি নগণ্য দশা নয়। কারণ সিদ্ধা ভৈরবী কিন্তু ছিলেন অনেকেই। যারা অষ্টসিদ্ধি রপ্ত করেছেন রীতিমত। তারাও তন্ত্র সাধকদের মতো অণিমা(ক্ষুদ্র হবার ক্ষমতা), মহিমা(বৃহৎ হবার ক্ষমতা), লঘিমা(হাল্কা হবার ক্ষমতা), গরিমা(ভারী হবার ক্ষমতা), প্ৰাপতি(যা ইচ্ছা লাভের ক্ষমতা), প্রকাম্য(যে কোনো জিনিস পাবার ক্ষমতা), ইশিত্ব(যে কোনো কিছুর ওপর নিজের প্রাধান্য স্থাপনের ক্ষমতা), বশিত্ব(বশ করার ক্ষমতা) অর্জন করতে পারেন। এরকম সাধিকা ভারতীয় আধ্যাত্মবাদে কম নেই কিন্তু। তাই ভৈরবীদের যথার্থ মর্যাদা আছে। যদিও সেই সাধনেও ধস নেমেছে এখন। স্বাভাবিকই। কারণ তন্ত্র করা, কিছুটা শক্তির সিদ্ধি পেয়ে ভক্তশিষ্য জোগাড় করে পেট চালানো একটা জীবিকাই হয়ে উঠেছে অনেকটা বাউলের কেবল গান গাওয়ারই মতো। বাউল আটপ্রকার কুম্ভক না করলেও হঠযোগ করেন। বৈষ্ণবরাও নানাবিধ প্রাণায়াম করে থাকেন। একবার চৈতন্য ডোবার প্রভু বলেছিলেন আমাকে, কৃষ্ণ তো প্রতিনিয়ত আমাদের শরীরে ঢোকেন আর বেড়িয়ে চলে যান।
জিজ্ঞাসা করেছিলাম, কীভাবে কৃষ্ণ শরীরে ঢোকেন আর কীভাবে বা তিনি শরীর থেকে বেড়িয়ে চলে যান?
বললেন–যোগে, আসনে, প্রাণায়ামে। বায়ুগ্রহণ হল শরীরে কৃষ্ণের প্রবেশ আর ত্যাগে হল তাঁর বেড়িয়ে যাওয়া। জপ তো আসনে উপবিষ্ট হয়েই করতে হয়। জপে তো কৃষ্ণ ঢোকেন আর বেরোন। তাই কৃষ্ণ যাতে সব সময় শরীরে বিরাজ করেন তাঁর জন্যই তো সব সময় ধ্যানজপ।
যোগশাস্ত্রে আট প্রকার কুম্ভকের উল্লেখ আছে। ‘সহিতঃ সূৰ্য্যাভেদশ্চ উজ্জায়ী শীতলী তথা। / ভস্ত্রিকা ভ্রামরী মূৰ্ছা কেবলী চাষ্টকুম্ভিকা।।’ সহিত, সূৰ্য্যাভেদ, উজ্জায়ী, শীতলী, ভস্ত্রিকা, ভ্রামরী, মূৰ্ছা, কেবলী–এই আট প্রকার কুম্ভক। যোগীপুরুষই যা রপ্ত করেন। চক্র জাগাতে এগুলো সবই গুরুত্বপূর্ণ। অনাহত চক্রে বায়ুবীজ লং অবস্থিত। দশ বায়ু আছে–‘প্রাণোহপানঃ সমানশ্চোদানব্যানৌ চ বায়বঃ/ নাগঃ কুম্মোহথ কুকরো দেবদত্তো ধনঞ্জয়ঃ।।‘ প্রাণ, অপান, সমান, উদান, ব্যান, নাগ, কুর্ম, কূকর, দেবদত্ত ও ধনঞ্জয়–এই হল দশ বায়ু। এর মধ্যে প্রধান পাঁচ বায়ু প্রাণ, অপান, গুহ্যদেশে; সমান নাভিমণ্ডলে; উদান কণ্ঠদেশে; ব্যান সমস্ত শরীরে অবস্থান করে। দশ বায়ুর দশটি গুণ বর্তমান। যার গুণগুলো ঠিকমতো জেনে নিতে পারলে সাধক শরীরের উপর ইচ্ছামত আধিপত্য স্থাপন। করতে পারেন। এতে সাধক শরীর সুস্থ ও নিরোগ থাকে।
প্রাণবায়ু খাবারকে পরিপাক করে; পানীয়কে স্বেদ ও মূত্ররূপে এবং রসকে। বীর্যরূপে, রজঃরূপে প্রতিস্থাপন করে দেয়। অপান বায়ু খাবার পরিপাকের জন্য অগ্নিপ্রজ্জোলন করে। গুহ্যে মল নিঃসারণ করে, উপছে মূত্র এবং অণ্ডকোষে বীর্য। তাছাড়া ঊরু, জানু, কটিদেশ ও জঙ্র কাজও সম্পন্ন করে থাকে। সমান বায়ু পরিপক্ক রসকে সমস্ত নাড়িতে চালিত করে; দেহের পুষ্টিসাধন করে। আমাদের প্রত্যঙ্গগুলোকে উন্নত করে উদান বায়ু। ব্যান বায়ু চোখ, কান, গলা ইত্যাদির কাজ সম্পন্ন করে। নাগবায়ু উদরের কাজ, কুর্মবায়ু সংকোচনের কাজ করে থাকে। খিদে-তৃষ্ণার তৈরি হয় কুকর বায়ুর কাজে। নিদ্রা হয় দেবদত্ত বায়ুতে। শোষনাদির কাজ করে থাকে ধনঞ্জয় বায়ু। সাধক এইসব বায়ুগুণকে আত্মস্থ করে নেন যোগক্রিয়ায়। তন্ত্রে এই বায়ু প্রয়োগ দরকার। বাউল সাধনায় এতখানি দরকার নেই। তাঁদের ক্রিয়াকল্পে হঠযোগ, রেচক, পূরক, কুম্ভক ইত্যাদিই যথেষ্ট।
যুগলের মেলায় কমিটির মঞ্চে নটবর দাস বাউল আমাকে বাউলের কৃষ্ণকে যেন প্রতীকী অনুষঙ্গের পরিধি বাড়াতে সাহায্য করেছিলেন। তিনি বললেন, ‘খ্যাপারা সব কৃষ্ণবস্তু নিয়ে বসে আছেন।’
পুরাণ কাহিনী কিন্তু কৃষ্ণকে সেভাবেই উপস্থিত করে প্রাণময় করে রেখে দিয়েছে। পুরাণকারেরা কৃষ্ণকে যে সব অধিবিদ্যা দিয়ে বসেছেন সেগুলো কিন্তু সব আসলেই একেকটি স্মারক। যা তুলে দেওয়া যায় অনায়াসে মানুষের হাতে। আর এভাবেই। মানুষ ‘কৃষ্ণবস্তু’কে ইচ্ছে করলেই লাভ করতে পারেন। যেটা মনে হয় কৃষ্ণ হল আমাদের অন্তদৃষ্টি। সুসাৰ্থক প্রতীক সব কৃষ্ণকীভাবে?
