কৃষ্ণ দেখছি রূপকের আড়ালেই বারবার সাধকের শান্ত আত্মসমর্পনের আবেগ দিয়ে শরীরের জন্মদিন পালন করছে। চিত্রল-মুগ্ধতায় সদর্থক মিতায়ন নিয়ে এমন সব। প্রতীক নিবন্ধকে গানে সংগত আড়াল করে দিচ্ছে যে প্রতীকে বসে সদর্থক সাধনতত্ত্ব সব বারবার আলো ফেলছে।
কৃষ্ণের প্রেমকে ‘কৈতব’ নয় ‘অকৈতব’ প্রেম বলে অভিহিত করেছেন পদকর্তা। ছলনা, কপটতাহীন প্রেম। তাই অকৈতব। ‘জম্বুনাদ হেম’ও বলেছেন পদকর্তা কৃষ্ণপ্রেমকে। জন্ধুনদের শীতার্ত সাদা বরফ জমা রূপ-স্বরূপের সঙ্গে তুলনীয় কৃষ্ণপ্রেম। বোঝা যাচ্ছে। প্রেমকে বিম্বিত আরশি দিতে চাইছেন পদকর্তা হৃষীকেশ গোঁসাই।
যেটা এখানে বলতে হয়: ‘কৃষ্ণ’ শব্দের প্রতিবিম্বিত আধারেই কিন্তু ‘প্রেম’ শব্দটি বর্তমান। কৃষ্ণের যে স্বরূপ তা কিন্তু লীলারূপ। এই লীলা যোগীরা বিশ্বাস করেন শুরু হয় ভূলদেহে। ‘প্রেম’ কথাটি, শব্দটি যদি স্থূল অর্থে দেখি তবে তাঁর শব্দরূপের যে দুই সংখ্যার সমষ্টি ‘কৃষ্ণ’ কথাতেও তাই বর্তমান আছে। সুতরাং প্রেম আর কৃষ্ণকে সাংখ্যিক অনুপাতে আমরা পরস্পরের কাছে নিয়ে যেতে পারি। আমাদের স্কুল দেহ নাশ হয় যোগে। তা শুরু হলেই দেহ ছাড়খাড় হয়ে যায়। কুণ্ডলিনী জাগে। মূলাধার থেকে সহস্রারে সেই শক্তি মিশে যায়। নাড়িগুলো সব আনন্দিত হয়ে পড়ে। নাড়িগুলোকে গোপীর কথা বলেছেন বাবাজি। তা। যদি হয় নাড়িগুলোর জাগৃতি সব নৃত্যরত গোপিনী। রাধাও আছেন সেখানে। তাহলে দাঁড়ালো এই, গোপীদের সঙ্গে অর্থাৎ কিনা শরীরের নাড়িগুলোর সঙ্গে সাধকের যে বোঝাপড়া তাই কৃষ্ণের লীলা। স্থূল শরীর যোগে, সাধনায় নাশ হয়ে সূক্ষ্ম শরীর কৃষ্ণ হয়ে গিয়ে রাধা ও গোপী সহ নৃত্য করছেন, আনন্দ করছেন সাধক কৃষ্ণ। প্রেমময় জাগতিক আনন্দ এ নয়। এ আনন্দ সাধকের। কৃষ্ণ সাধকের দিব্যতা। বাউলও তাই-ই করছেন কিন্তু। ‘প্রকৃতি’কে কৃষ্ণ বলছেন তাঁরা। প্রকৃতিকে আমরা সঙ্গিনী, সাধিকা না ধরে যদি ধরি অপার অনন্ত শূন্যতা–তবে তাঁর রূপ তমোময়। এই তমসা উত্তীর্ণ জ্যোতি আহ্বান করছে। প্রকৃতির বর্ণচ্ছটাতে আমাদের নৃত্য করতে। অর্থাৎ কিনা আনন্দ করতে। নৃত্যকে, আনন্দকে ‘গোপী’ বললে গোপীর ‘গ’ হল প্রকৃতি। ‘পী’ হল ডাকা বা আহ্বান করা। আপ্যায়ন বললে ঐকতানটা যেন আরওই ঠিক থাকে। বৈষ্ণবরা তো রাধাকে মহাপ্রকৃতি বলেন। গোপীদের তাহলে ধরি বিশ্বপ্রকৃতি। যে গোপীরা সব শরীরের মধ্যেই অবস্থান করছেন। সাধকের শক্তির আধারে লীলা করছেন, আনন্দ করছেন, নৃত্যকলা প্রদর্শন করছেন। বলতে পারি বিশ্বপ্রকৃতিকে আহ্বান করছেন, ডাকছেন, ইশারা করছেন প্রকৃতি। বাউল সাধককেও ডাকছেন প্রকৃতি। মহাযোগে বৈষ্ণবীয় নামান্তরের মহাপ্রকৃতি বাউল সাধককে উর্দ্ধরেতা দান করে কৃষ্ণ করে দিচ্ছেন। কৃষ্ণকে শুদ্ধতা নয়–সিদ্ধতা হিসাবে দেখছি আমরা। বাউলের কৃষ্ণ বীর্য। বস্তুরক্ষা। ‘কৃষ্ণবস্তু’ বলেন তাঁরা কিন্তু বীর্যকে। রজ, প্রকৃতির প্রবাহ বা আনন্দ রাধাবিন্দু। ‘বিন্দুসাধন’ বলেন বাউল। বিস্কুধারণ আর পতন। ধারণ হল উর্ধ্বারেতা দান করে সিদ্ধতা। পতন-যোনিতে পতন। অকৃতকার্যতা তা আর কী।
গানে পদকর্তা রামীকে প্রেমের ‘গুরু’, ‘কল্পতরু’ বলেছেন। বলেছেন এই কারণে বাউলের সঙ্গিনী প্রকৃতি। তিনিই তো সাধককে কৃষ্ণবস্তু রক্ষা করার সাহায্য করে সিদ্ধাসনের ‘প্রেমভাণ্ডার’ খুলে দেন। পদকর্তা বলছেন–’মা বাশুলীর পূর্ণ কৃপায়/ যেমন দ্বিজ চণ্ডীদাস অপূর্ণ সম্পূর্ণ প্রেমে/ মিটলো প্রেমের আশ, / প্রেমের রামী হয় গুরু, / কল্পতরু/ প্রেম-ভাণ্ডার দেয় খুলে।
কৃষ্ণপ্রেমকে ‘সুধাসিন্ধু’ বলছেন পদকর্তা। সুধা হল জল। জল হল শুক্র বা মূত্র। এদের রস’ও বলেন বাউল। সঙ্গিনীর রজ’কে তাঁদের ‘রূপ’ বলতে শুনেছি। বাউল তো চারচন্দ্র ভেদ করেন। শুক্র, রজ, মল, মূত্রকে শরীরে ধারণ করে শরীরে ফিরিয়ে দেন। ‘শুক্র’কে তাঁরা ধারণ করেন। গানে নটবর সেকথাই বলেছিলেন–’কৃষ্ণপ্রেম সুধাসিন্ধু/ বিন্দুর কণা যদি পায়, / বিন্দুর প্রভাবে/ চৌদ্দভুবন ডুবে যায়। এ তো কইবার কথা নয়, কে করিবে প্রত্যয়,/ প্রেমের ভজন না জানিলে।।’
সাধকের বীর্য আর সঙ্গিনীর রজ এই দুই বস্তুকে বাউল দেহ গঠনের মুখ্য হিসাবে ধরেন। শুক্রের যে প্রাণকনা তা বাউলের কৃষ্ণবস্তু বা তাঁরা বলেন কৃষ্ণবিন্দু। সঙ্গিনীর রজর ডিম্বানু তাঁদের কাছে রাধাবিন্দু। এই দুইয়ের মিলিত যে প্রাণ বাউলের তা হল সুধাসিন্ধু। বাউল সাধনায় সন্তান সাধনপ্রনালীর অঙ্গ নয় মোটেই। যদিও এখন বাউল পুত্রকন্যা নিয়ে রীতিমত ঘর করেন। তবে সাধক বাউল সন্তানের জন্ম দেন না। অনেক বাউল সাধক-সাধিকা আছেন যারা সংসার ত্যাগ করে দীর্ঘদিন সাধনায় নিমগ্ন আছেন। যেমন মীরা মা-কাকা গোঁসাই, হরিপদ গোঁসাই–নির্মলা মা, সাধনা-গৌরখ্যাপা–এঁদের কথা আমরা জানি। তন্ত্রেও সন্তান জন্ম নিষিদ্ধ। তন্ত্রসাধক তাঁর সঙ্গিনীকে শরীরে বীর্যকে উর্ধ্বগতি দিয়ে প্রেমের দিব্যতায় ডুবে যান। তান্ত্রিক সাধুর যুক্তি ভৈরবীকে তাঁরা মা বলেন কারণ–মাতৃভাব আর রমণীভাব দুটোই আরোপিত ভাব। আসলে নারীর দুই রূপ। যেই রূপে ভাব আরোপ করা হয়, নারীর যে জননীরূপ, মাতৃভাব তাও যেমন আরোপিত তেমনি নারীর যে রমণী বা ভৈরবী হয়ে ওঠা তাও তো আরোপিত প্রকৃতিকে আমরা নারী। হিসাবে দেখি। আকাশকে পুরুষ। মানে হল আকাশের বিশালতা, ব্যাপ্তি প্রকৃতিকে ধরে রাখার জন্য। সাধক যে সঙ্গিনীকে ধরে রাখেন দেহ সাধনায় বা যুগল সাধনায় তাঁর কারণ তাঁরা সৃষ্টিপথকে প্রসারিত করেন। সৃষ্টি এখানে প্রাণ নয় কোনো প্রেমস্বরূপ প্রাণতরঙ্গ। সৃষ্টি হল শক্তির ব্যাপ্তি। বিশালতা। যোগীপুরুষ শরীরস্থ সমস্ত চক্রের শক্তিকে জাগিয়ে নিয়ে এই ব্যাপ্তি বা বিশালতাকে অনুভব করে থাকেন। প্রত্যেকটি চক্রে যোগী শক্তিরই আরাধনা করেন। মূলাধারে থাকে ডাকিনী শক্তি। ডাকিনী কথাটি তিব্বতী ঘেঁষা শব্দ। তিব্বতের ডাক শব্দ থেকে যোগশাস্ত্রে ডাকিনী শব্দটি এসেছে। তিব্বতে ডাকের অর্থ হল জ্ঞান। যোগশাস্ত্রে ডাকিনী হল জ্ঞানী রমণী। বলা হয় এই চক্রেই সাধকের মধ্যে প্রথম জ্ঞানের উদয় হয়। তাই এই চক্রে সাধক ডাকিনী শক্তির ধ্যানজপ, আরাধনা করে থাকেন। স্বাধিষ্ঠানে শক্তির নাম রাকিনী। অনেকে বলেন আবার কাকিনী। ডাকিনীও মতান্তরে শাকিনী। মণিপুরে থাকেন। শক্তিরূপিণী লাকিনী। অনাহতে কাকিনী। বিশুদ্ধে শাকিনী। বৌদ্ধরা বলেন এঁকে সুবেশা যোগিনী। কারণ এই চক্রে ধ্যানে যোগশক্তির মাত্রা অতিরিক্ত নাকি বেড়ে যায়। আজ্ঞাচরে হাঁকিনী। বৌদ্ধরা বলেন আবার, চিৎকারকারিণী যোগিনী। এখানেই নাকি শক্তির বিস্ফোরণ ঘটে সাধন শরীরে। সেজন্যই হাঁকিনী। সহস্রারে সন্ধিনী শক্তির বিকাশ। কারণ এই চক্রেই পরমের বা চিপিণী শক্তি বা সম্বিত জাগে পুরো মাত্রাতে সাধক শরীরে। সাধক নির্বাণত্ব লাভ করেন এখানে এসেই।
