দয়ালের কথা আমি বলছি না। দয়াল সাধনস্তরের মানুষ। তাঁর মুখেই শুনেছি বহু। সাধকের সঙ্গ করেছেন তিনি। এক জায়গাতে তাঁর মন টেকে না। দীর্ঘদিন হল সাধনের আশ্রমে আছেন। আগে ছিলেন নবাসনে। হরিপদ গোঁসাইএর আখড়ায়।
সাধনের আশ্রমে গন্ধরাজ ফুটেছিল তখন। দয়ালের গানের আর ফুলের ভুর ভুর গন্ধ কেবল বাতাসে মিশে যাচ্ছে। ফাঁকা আশ্রমে দয়ালের গান যেন একাই ধরে রেখেছে। কৃষ্ণের কলরব।
দয়াল গাইছেন–
প্রেম সুখদ্বার কৃষ্ণ রসাকার রসনাতে তাঁর কর আস্বাদন
সে যে যোগাযোগ স্থলে মৃণাল পথে চলে
সহজ কমলে সুধা বরিষণ।।
সর্ব ঘটে বটে পটে পট্টস্থিতি
শক্তিতত্ত্বগুণে আনন্দ মুরতি।
শৃঙ্গার-আকার ধরে সাধ্য কার
ওই যে স্বরতি-সঞ্চার নবীন মদন।।
আদ্য সুখসাধ্য, বাদ্য কারুর নয়,
ইন্দু বিন্দুগতি সদা বিরাজয়।
জীবে নাহি জানে সাধু সন্ত চেনে,
রসপানে জানে তাঁরা অমৃত-সেবন।
মন আত্মা বপু যত রিপুচয়,
দেহেন্দ্রিয় সবাই তাহাতে মিশায়।
তাঁদের ব্রজ-প্রাপ্তি দেহ, তৃপ্ত হয় জীবন।।
কাম-প্রেম-রতি হবে এক ঠাঁই
সুখ-দুঃখ-আদি তথায় কিছু নাই,
নির্মল সে পথে হাউড়ে চায় যেতে
ওই শক্তি আত্মশক্তি হলে যায় দর্শন।।
ঘোষপাড়া মেলায় বেশ রাতের দিকে বাউল আখড়াগুলো সব জমজমাট। সাধুদের ওখানেও তেমন ভিড় নেই। আর বৈষ্ণবীরা সব মাছি তাড়াচ্ছেন। ভিড়ে, মানুষের ঘেঁষাঘেঁষিতে তখন আমার অস্বস্তি হচ্ছে বেশ। জিরোতে ফাঁকাতে এলাম। দেখি অতিবৃদ্ধা এক বৈষ্ণবী নিমগ্ন হয়ে বসে আছেন। বুঝলাম এ বয়সে সঙ্গী নেই আর তাঁর। গিয়ে বসলাম তাঁর একটু পাশে।
মাটিতে ঘাসের ’পরেই বসলাম আমি। তিনি টের পাননি। চোখ খোলা। ঘুমে যে ঢুলছেন না তা বেশ স্পষ্ট। সম্বিৎ ভাঙলে বললেন, ভাই এখানটাতে বসো। একেবারে মাটিতে কেন? ঠাকুমার ঘেঁড়া চাটাইটা ‘তালে আছে কী করতে? নাতি আমার মাটিতে বসবে তা কী হয়!
শতছিন্ন চাটাইতে আমি বসলাম।
বললেন, এখন আর ঘুম হয় না ভাই। তাই চেয়ে চেয়ে তাঁর অপেক্ষাতে থাকি। তবে তিনি সাত তাড়াতাড়ি না এলেই ভালো।
বললাম, না না। এত তাড়াতাড়ি মৃত্যু আপনাকে টানবে না। বলতে নেই, আপনার বয়স হলেও দেখে তো মনে হচ্ছে আপনি অসুস্থ নন।
আমি তার কথা বলছি নে। বলছি ঘনশ্যামের কথা।
মানে! আমি চমকে গেলাম।
বৈষ্ণবী বললেন, একটা কথা আছে ভাই। যতক্ষণ শ্বাস, ততক্ষণই আশ। এই যে তিনি আসবেন। অপেক্ষা–এটাই তো জেবন। তিনি এলে, শ্যাম এলে তো আর আশা থাকবে না। না আসাটুকুই শ্যাম ভাই। এসব তুমি বুঝবা না। তা ভাই তোমার সাথে কেউ নেই কেন? রাধা ছাড়া কৃষ্ণ কি মানায় ভাই? সেজন কোথা?
তার কোনো খোঁজ পাইনি ঠাকুমা।
বৃদ্ধা হাসলেন।
বললেন, পাবা ভাই পাবা। তাড়া কিসের? প্রত্যেক কৃষ্ণর জন্য প্রত্যেক রাধা থাকে। খোঁজো খোঁজো। গরু খোঁজা করে ফেলো। দেখবা পাবা একদিন। কৃষ্ণ ছাড়া সে থাকবে ক্যামনে শুনি?
ঠাকুমা কৃষ্ণ কী? জিজ্ঞাসা করলাম আমি।
কী আবার ভাই! কৃষ্ণ হল গিয়ে আসলে সুর। অপেক্ষার সুর। তাঁকেই শুনতে হয়, ধরতে হয়, বুঝতে হয় দাদুভাই। বাঁশি কেন তাঁর হাতে?
কেন ঠাকুমা।
বাঁশিই তো সুর দাদু। বাঁশি বাজানো মানে আমাদের কামকে, ক্রোধকে, লোভকে, মোহকে, মাৎসর্যকে, মদকে বাজানো। এই দুইকে মন দিয়ে বাজাতে হবে দাদুভাই। তবেই না কৃষ্ণ বাজবে। বাঁশি বাজবে। বাঁশির সাতখান ফুটোর মানে হল। ষড়রিপুকে মন দিয়ে বাজানো। আর বাজাতে পারলেই কৃষ্ণ মিলবে। তাঁকে বাজাবা ভাই। তাহলে মানুষের ঊর্ধ্বে উঠবা। তোমার বাঁশিখান তোমাকেই তো বাজাতে হবে। তবেই না রাধা আসবে।
রাধা কী ঠাকুমা?
রাধা আগমন। অপেক্ষার শেষ। তাঁর জন্যই তো কানাইয়ের পথ চেয়ে বসে থাকা। এই তুমি যেমন আছো ভাই।
ঠাকুমা আপনার আশ্রম কোথায়?
হাসলেন তিনি।
বললেন, আশ্রম নেই ভাই। একখান বাড়ি আছে। পোড়া বাড়ি। তিনি চলে যাবার পর বাড়িটা বাজে। ষড়রিপু নিয়ে বাজে গো বাড়ি। বাড়ি ছেড়ে তাই ভাই পথে-পথে ঘুরি। যাও যাও, খোঁজো তারে। আমি খুঁজি আমার সেই ঘনশ্যামরে।
পার্শ্ববর্তী আখড়া থেকে তখন ভেসে আসছে কৃষ্ণ খোঁজার সেই অতি পরিচিত গান। আমি শুনতে শুনতে এগোচ্ছি আর ঘুরে তাকিয়ে দেখছি, এ কী! বৈষ্ণবী ঠাকুমা বসে নেই সেখানে। তবে গেলেন কোথায় তিনি এই মধ্যরাতে? কৃষ্ণ খুঁজতে কি!
আমি শুনতে পাচ্ছি বাউল গাইছেন–
এমন মন ব্যবসা ছেড় না ওগো সুখের ধানভানা
কর কৃষ্ণপ্রেমের ভান কুটো কোনোই কষ্ট থাকবে না
তোমার দেহ ঢাকশালে অনুরাগের ঢেঁকি বসালে
ভজন সাধন পাড়ুই দুটো দু দিকে দিলে
আবার নিষ্ঠা আঁশ কলাই লাগালে
ঢেঁকি চলবে ও সে টলবে না।।
রাগ দরদী দুইজন ভানুনী তাঁদের নাম কৃষ্ণ মোহিনী
তাঁদের একজন সদা গোপের মেয়ে একজন তেলেনী
তারা ধান ভানে ভালো জানে ভালো গায়ে তাঁদের উপাসনার গহনা।
রাগ বিবেকের মুষল আঘাতে বাসনা তোর
যাবে ছেড়ে পাহার দিতে দিতে
চাল উঠবে সেঁটে বিকার কেটে ঠিক যেন মিছরি দানা।
ঘরের বিদ্যাবুদ্ধি বেশ গিন্নি হবে শেঁকার দেউনী
শুদ্ধরতি শুদ্ধমতি কুলা চালুনী
এবার কাম কামনা ছেড়ে ঝেড়ে ঝুড়ে তুসকুঁড়ো চেলে লও না।
শ্রীগুরু সেই মহাজনের ধান তাতে হবিরে সাবধান
ষোল আনা বজায় রেখে করবি ব্যবধান।
লাভে লাভে কাল কাটাবি আসলে হারাইও না।।
গোঁসাই বলে অনন্ত ধান ভানতে পারবি না
তোর ঘটবে যন্ত্রণা
পাপ ঢেঁকি তোর মাথা নাড়ে গড়ে পড়ে না
দেখিস যেন বেহুঁশ হয়ে যাতে ঢেঁকি পড়ে না।
