–কেন নয় বাবা! সে তো রাখে, সে মারে। নির্ধারক সে।
আমি বললাম, এই যে আপনি বললেন নাড়িগুলো সব কৃষ্ণ। তাহলে…
–তাহলে কি? নাড়িগুলো সব না জাগলে কৃষ্ণ জাগবে কী করে শুনি? যার নাড়ি যত বেশি জাগবে ধ্যানে,যোগে, ভক্তিতে তার তত বেশি সিদ্ধ দশা আসতে শুরু করে দেবে। সাধককে তো নির্ধারণ করবেন শরীরের সাড়ে তিন লক্ষ কৃষ্ণ। তিনিই রাখবেন। সিদ্ধস্তরে পৌঁছে দেবেন আবার তিনিই মারবেন। স্থূল দেহেই বসিয়ে রাখবেন।
বাবাজি সেদিনকার মতো উঠে যাবার পর আমি বসেই রইলাম নাটমন্দিরে। কৃষ্ণ ভজনার ঘন্টা সব তখন জোরে জোরে বাজতে লাগল। আমার সারা শরীরে গিয়েও যেন আলোড়ন তুলল ঘন্টাধ্বনি। একসময় থেমেও গেল। বৃদ্ধা বৈষ্ণবী গাইতে থাকলেন কানু-বন্দনার গীত।
*****
নটবর দাস বাউল যুগলের গানে যে কথা শুনিয়েছিলেন তা হল কৃষ্ণ সহজে না পাড়ার কথা। সদানন্দ বাবাজি যতই বলুন নাড়ি হয়ে কৃষ্ণ শরীরস্থ হয়েছেন বা প্রেমানন্দ গোঁসাই, নবদ্বীপের বাবাজিরা সব যাই বলুন না কেন–নববিধা ভক্তিরসকে রসস্থ করে কৃষ্ণ পাবার কথা যতই বলুন না কেন–বাউল কিন্তু বলছেন: ‘কৃষ্ণপ্রেম কি সহজে মেলে। অকৈতব প্রেম/ জন্ধুনদ–হেম/ উদয় হয় ভাগ্য-ফলে।।’
ভাগ্যফল বলতে কী বলতে চাইছেন বাউল?
এই ভাগ্যফল হল গিয়ে সাধন ভাগ্যফল।
বাউল তাঁর জীবন দিয়ে আসলে কৃষ্ণ পাবার সাধনা করেন। কৃষ্ণ তাঁর কাছে প্রকৃতি। কৃষ্ণ সঙ্গিনীর সাহায্যে প্রাপ্ত সুধাকণা। রস। কৃষ্ণ পাবার আকুতি তাই বাউলের সারা জীবনেরই আকুতি। দুদ্দু শাহের পদের ভেতরও আমরা সে কথাই পাই। এই পদও যুগল-মেলাতেই নটবরের গলাতেই শুনেছিলাম। মেলা কমিটির মঞ্চে নটবর দাস বাউল এ গান গেয়েছিলেন সেদিন। গাইতে গাইতে বললেন, খ্যাপা, খ্যাপারা সব মেলায় কৃষ্ণবস্তু নিয়ে বসে আছেন যে, তারে জানতে–চিনতে-বুঝতে হবে তো কী খ্যাপা?
নটবর আমার দিকে চোখ ফেরালেন। খমকে বোল তুলে নিলেন। গাইতে থাকলেন কৃষ্ণ খোঁজার, কৃষ্ণ জানার, কৃষ্ণ বোঝার, কৃষ্ণ সাধনের গান।
কোন কৃষ্ণ হয় জগৎপতি
মথুরার কৃষ্ণ নয় সে সে-কৃষ্ণ হয় প্রকৃতি।
জীব দেহে শুক্ররূপে এ ব্রহ্মাণ্ড আছে ব্যেপে
কৃষ্ণ তারে কয় পুরুষ সেই হয় সেই রাধার গতি।
কৃষ্ণবস্তু নিগম ঘরে জীবদেহে বিরাজ করে
রসিকের করণ যে কৃষ্ণ ধারণ করণ গম্ভীর অতি।
আত্মতত্ত্ব জানে যে জন
কৃষ্ণ-সেতু চেনে সে জন
লালন সাঁইর বাণী রসিক ধনী বলে দুদ্দুর প্রতি।
হাটগোবিন্দপুরে একবার গেছি সাধন দাস বৈরাগ্যের খোঁজে। আশ্রমে ছিলেন না তিনি। কোথায় এন এক প্রোগ্রামে গিয়েছেন। শুনসান ফাঁকা আশ্রমে ঠিক গন্ধরাজ গাছতলায় বসে ছিলেন একখানা খাতা নিয়ে দয়াল সরকার। সাধনের আশ্রমে বহুদিন আছেন।
আমাকে বস্তে বললেন দয়াল। শীতলপাটিটা পরম যত্নে খুলে দিয়ে বললেন, বসেন।
জিজ্ঞাসা করলাম, কী লিখছিলেন?
বললেন, কিছু না। গানের খাতাখান দেখছিলাম আর কী। কত গান যে মুখে মুখে লিখি আবার মুখেই হারিয়ে যায়!
খাতায় লেখেন না কেন?
সব সময় কি আর খাতা থাকে। মনের খাতায় লিখি। আবার মনের পাতাখানা ছিঁড়েছুঁড়ে কখন যে মনেই মিলিয়ে যায়।
দয়াল সরকারকে দেখে মনে হল যথার্থ কবিমানুষ। ভাব আর শব্দ যেন সবসময় তাঁকে ঘিরে রেখেছে। শব্দ দিয়ে গান নয় শুধু, আশ্চর্য সব কথকতা তৈরি করে দিতে পারেন দয়াল।
খাতাখানা একঝলক দেখতে চাইলাম। দেখালেন দয়াল। হাতের লেখা স্পষ্ট। গোটাগোটা।
বললেন কথাপ্রসঙ্গে–তাঁর কথা তিনিই লেখেন তিনিই আবার মুছে দেন। জিজ্ঞাসা করলাম, কার কথা বলছেন আপনি?
–কেন গো। শরীরের কথা। শরীর দিয়ে শরীর লেখার কথা। বাউল তো তাই করে গো। শরীরই তাঁর গয়া-কাশী-বৃন্দাবন।
বললাম, শরীর মথুরা নয়?
বললেন, বুঝেছি। আপনে ঘুরিয়ে কৃষ্ণকথা জানতে চাইছেন।
–কৃষ্ণ কী আপনার চোখে?
–কী আবার! দেহ গো, দেহ। শরীরের এই ঘরখানাতে কৃষ্ণর বসবাস।
বললাম, নাড়িগুলোর কথা বলছেন আপনি?
–তা নয় গো, তা নয়। নাড়ি কৃষ্ণ নয়। রিপু কৃষ্ণ।
–ষড়রিপু? জিজ্ঞাসা করলাম আমি।
বললেন, ছয় রিপু, দশ ইন্দ্রিয়, চার চন্দ্র, সাত দিনের রজঃধারা দিয়ে কৃষ্ণ গঠিত। সাধক রিপু দমন করে। ইন্দ্রিয়গুলোকে বশ করে। চারচন্দ্রকে বশীভূত করে। তবে না সঙ্গিনীর রজে, মহাযোগে তাঁর কৃষ্ণবস্তু রক্ষিত হয়।
–কৃষ্ণ তাহলে কেবল কৃষ্ণবস্তুই?
হাসলেন দয়াল।
বললেন, তা কেন। দেহ কৃষ্ণ। সাধনের দেহ। পিতার হাড়, মজ্জা, মগজ, মণি আর মাতার রক্ত, মাংস, চামড়া, চুল নিয়ে দেহ গঠিত। দেহেই তো ইন্দ্রিয়,রিপু থাকে নাকি? রজ-বীর্যও থাকে। দেহ দিয়ে দেহ রক্ষা করাই কৃষ্ণ পাওয়া।
আর কিছু বললেন না তিনি। হয়তো বলতে চাইলেন না আর। তাই গান ধরলেন। এখন বেশ বুঝিতে পারি বাউলের গুহ্যতা ভাঙতে আপত্তি থাকলে তখনই তিনি গান ধরেন। আবার অনেক সময় এটাও হয়, গুহ্যতা ভাঙবার মতো শিক্ষাবস্তু তাঁর নেই। তাই তখন মুখস্থ গানের আড়াল নেন বাউল আর হাসেন। এই হাসির অর্থ হল যার-তার কাছে সাধনকথা বলা যাবে না। কিন্তু তিনি যে সাধন কথা দূর অন্ত গানকথাও ঠিকঠাক বোঝাতে অপারগ–তাঁর জারিজুরি সব গেছে খুলে তা তিনি বুঝতে পারলেন না। শুধু হাসলেন আর হাসলেন। গায়ক বাউলরা এটাই বেশি করে থাকেন।
