ঘাড় কাত করলাম। হাতে ধরা পাঁপড় ভাজাতেও দেখি শ্রীকৃষ্ণ মাছি। রজত বলল, রাধাটা বুঝলে আমার পাঁপড়ে বসে। সেই থেকে ও এসব নিয়ে পড়েছে। মাঝ দুপুরের পর নবদ্বীপের বাবাজিদের সঙ্গে বসেছিলাম। তাঁরাই বলছেন কৃষ্ণ সর্বত্রগামী। শরীরে, মনে, চারধারে কৃষ্ণ বিরাজমান। রাধা নিয়ে যুগল হয়ে আছে। রজত সেসবই এখন ইয়ার্কির ছলে জানান দিচ্ছে আমাকে।
আমরা নটবর দাসের আখড়াতে এসে পড়লাম। তখন সেইভাবে গান শুরু হয়নি। মেলা কমিটির মঞ্চেও গাইতে ওঠেনি বাউল। এ-কথা সে-কথার পর কথা গিয়ে পড়ল। যুগলতত্ত্বের উপর।
বাউল বললেন, বেশ শক্ত কথা। তার চে বরং যুগলের গানই গাই। কী কন খ্যাপা?
রজত, সুজিত ওরা সব বলল, হোক হোক।
নটবর একতারা তুলে নিলেন। গাইতে লাগলেন যুগলের গান।
সব আমরা তন্ময় হয়ে গেলাম বাউলের গানে।
নটবর দাস বাউল গাইতে থাকলেন। হৃষীকেশ গোঁসাইয়ের পদে, রাধাকৃষ্ণের যুগলে একেবারে ডুবে গেলেন নটবর।
কৃষ্ণপ্রেম কি সহজে মেলে।
অকৈতব প্রেম
জম্বুনদ-হেম,
উদয় হয় ভাগ্য-ফলে।।
সাধারণী কিছু নয়,
সমজ্ঞসা কিছু হয়,
সমর্থা প্রকৃত প্রেমের
হয় রে উদয়।
প্রেমে হয় না বিয়োগ,
সদাই থাকে যোগ,
মরে যায় বিয়োগ হ’লে।।
মা বাশুলীর পূর্ণ কৃপায়
যেমন দ্বিজ চণ্ডীদাস,
অপূর্ণ সম্পূর্ণ প্রেমে
মিটলো প্রেমের আশ;
প্রেমের রামী হয় গুরু,
কল্পতরু,
প্রেম-ভাণ্ডার দেয় খুলে।।
কৃষ্ণ প্রেম সুধাসিন্ধু
বিন্দুর কণা যদি পায়,
বিন্দুর প্রভাবে
চৌদ্দভুবন ডুবে যায়।
এ তো কইবার কথা নয়,
কে করিবে প্রত্যয়,
প্রেমের ভজন না জানিলে।।
এমন প্রেমেতে বিমুখ
ফেলে ভাবি আপ্তসুখ,
সুখে এবার বৈরী হ’লাম,
সুখের উপর দুখ।
ধরণীর কৃপায়
হৃষীকেশে কয়,
এই ছিল কি কপালে।
থামলেন বাউল। থেমে কৃষ্ণের ব্যাখ্যায় মাতোয়ারা হলেন। এরই মধ্যে দেখি যুগলের ভিড় উপচে পড়ছে। রাধাকৃষ্ণ একাকার হয়ে যাচ্ছে সব যুগলকিশোরের মেলায়।
*****
দুপুরবেলায় বাবাজি বললেন, তা বাবা রাধাকৃষ্ণের যুগলমূর্তি ত্রিভঙ্গ কেন? কেন আমরা বলি ত্রিভঙ্গমুরারি?
কেন? জিজ্ঞাসা করলাম আমি।
বাবাজি বললেন, আমাদের শরীরের তিনখানা গুণ নিয়ে তিনি যে ত্রিভঙ্গ হয়ে রয়েছেন। কী এই তিনখানা গুণ?
বললাম, কী?
বললেন, সত্ত্ব, রজ, তম গো।
বললাম, যদি একটু বুঝিয়ে বলেন।
–সত্ত্ব হল শরীরের নিত্যতা। স্থূল দেহ আমাদের। সবাইকার স্থূল শরীরে নিত্য জাগ্রত যে তিনি।
জিজ্ঞাসা করলাম, কীভাবে জেগে আছেন তিনি?
–উপলব্ধিতে।
অস্তিত্বে কি তিনি কখনও তবে জেগে নেই?
হাসলেন, বাবাজি।
বললেন, আছে বাবা আছে।
–কীভাবে আছেন?
–রজ হয়ে।
ভাবলাম, বাবাজি প্রকৃতির গুণের কথা বলছেন। রজঃগুণ।
বললেন, রজ হল গিয়ে বাবা রাজসিক। আমাদের শরীরকে রাজসিক মায়ায় তিনি ধরে রাখেন। মায়া হল বন্ধন।
বললাম, অষ্টপাশের বন্ধন?
–অবশ্যই। কৃষ্ণকে শরীরের নিত্যতা মানলে আটপাশ তো থাকবে বাবা।
হাসলেন তিনি। বললেন, লীলা কী বাবা?
বললাম, খেলা।
চৈতন্যচরিতামৃত আওড়ালেন বাবা।
–কৃষ্ণের যতেক লীলা, সর্বোত্তম নরলীলা, নরবপু কৃষ্ণের স্বরূপ। তার জন্যই তো বললাম বাবা, কৃষ্ণের অস্তিত্ব শরীরের নিত্যতা। সেই নিত্যতা বুঝতে, জানতে, ধরতে নববিধা ভক্তিরস ছাড়া গতি নেই গো। এই নববিধা ভক্তি দিয়েই তো সাধক কৃষ্ণভজনা। করেন।
আরেক বাবাজি বললেন, কৃষ্ণকথা শুনে, গেয়ে, মনে রেখে, বন্দনা করে, সেবা করে, নিবেদন করে, পূজা করে, সখ্য তৈরি করে কৃষ্ণকে শরীরময় করে তোলা যায় বাবা।
–তম হল ভাব। মনের অন্ধকারকে দূর করে তামসিক ভাব আনা। এই ভাব এলে কৃষ্ণ হৃদয়ে, মনে, শরীরের সকল স্থানে আলো ফেলবে গো। তবেই তো কৃষ্ণের মাধুর্য বোঝা যাবে।
প্রেমানন্দ গোঁসাই বাবাজিও এ সময় এলেন। যোগ দিলেন।
বললেন, শ্রীশ্রীচৈতন্যচরিতামৃততেই আছে–আপন মাধুর্য হয়ে আপনার মন। আপনে আপনা চাহে করিতে আলিঙ্গন।
তবে কৃষ্ণের সদর্থক শরীরী উপমার কথা আমাকে সর্বপ্রথম কিন্তু শুনিয়েছিলেন জগদীশ পণ্ডিতের শ্রীপাঠের সদানন্দ বাবাজি।
সান্ধ্য কীর্তনের পর একদিন তার সঙ্গে কথা চলছিল।
বললেন, কৃষ্ণ হল গিয়ে আমি নিজে। কৃষ্ণ হল গিয়ে তোমার শরীর, আমার শরীর, সবার শরীর। কৃষ্ণ হল নাড়ি।
বললাম, শরীরের নাড়ির কথা বলছেন আপনি?
–হ্যাঁ বাবা হ্যাঁ। ঠিক ধরেছ গো।
–আমাদের শরীরে তো সাড়ে তিন লক্ষ নাড়ি রয়েছে।
বাবাজি বললেন, ঠিক বলেছ তুমি। এই সাড়ে তিন লক্ষ নাড়িই হল গিয়ে কৃষ্ণ। আর তার ভেতর প্রধান আটটা নাড়ি হল রাধারই অষ্টসখি বাকি সব নাড়ি গোপিনী।
–তাহলে রাধার উপস্থিতি কি আমাদের শরীরে নেই?
বললেন, হ্যাঁ। ঠিক কথা বলেছ। রাধা ছাড়া কৃষ্ণ হবে কী করে? শরীরের প্রধান তিন নাড়িকে তো গঙ্গা, যমুনা, সরস্বতীর রূপ দেওয়া হয় যোগসাধনাতে। গঙ্গা ইড়া, যমুনা পিঙ্গলা, সুষুম্না সরস্বতী। কৃষ্ণমহিমায়। রাধা হল গিয়ে প্রধান। তিন নাড়ির মধ্যে সুষুম্নার কাজ বেশি। তা সুষুম্নকেও তুমি রাধা ধরতে পারো। পিঙ্গলা তো যমুনা। রাধা নিজেও তো এই নদীর সঙ্গে সংযুক্ত কৃষ্ণলীলায়। যমুনার লীলাকে আমরা তো পিঙ্গলাতেও রূপ দিতে পারি। পারি না বাবা? কৃষ্ণ তো আসলে রূপকল্পনার দৈত্য?
–দৈত্য কেন? আমি জিজ্ঞাসা করলাম।
