গানে তাই বলা হচ্ছে সহস্রদল দেখবি হেথা। শরীর এভাবেই দ্যোতিত হচ্ছে। প্রতীকমান হচ্ছে, দ্বৈতাদ্বৈতের ভেতরে দাঁড়িয়ে শরীর সৃষ্টির হোমাগ্নিকেই জাগ্রত করছে। যেন। সাধক সেখানেই দেখে ফেলছেন আধ্যাত্মিক বিগ্রহ। খ্যাপা গানে তাঁরই হদিশ দিয়েছেন।
খ্যাপার সমসাময়িক পদকর্তারা হলেন নিতাই খ্যাপা, নবদ্বীপ গোঁসাই, ত্রিভঙ্গ গোঁসাই, রাধাশ্যাম দাস, গোপাল খ্যাপা, ঘনশ্যাম দাস। পরবর্তী পদকর্তারা হরিপদ গোঁসাই, হেমন্ত দাস, সনাতন দাস, লক্ষ্মণ দাস, মদন নাগ, সুধীর বাবা, সুধাময় দাস, ঠাকুর দাস। যেটা বলতে চাইছি বেশ কিছু সংকলনে এঁদের গান(সমসাময়িক, পরবর্তী) সংকলিত হয়েছে কিন্তু খ্যাপার গান বাউল কণ্ঠে শোনা ছাড়া কোথাওই কোনও গবেষকদেরই সংকলিত বাউল গানের গ্রন্থে গ্রথিত হয়নি। অথচ আশ্চর্যের, নামকরা। বাউলরাও সব গেয়ে থাকেন তার গান। এখানে তার সাতটি গানকে পূর্ণাঙ্গ পরিসর দিয়ে আমি গবেষকদেরই দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাইলাম আরকি। যাতে পরবর্তীতে তার গানও সংকলন ভুক্ত হবার সময় কোনও ভাবে বাদ না পড়ে। তাহলে বাউল গানের মান্য পরিসর সেইভাবে গড়ে উঠবে না। তবে আশার বিষয় যেটা, খ্যাপা প্রতিষ্ঠিত সংঘ থেকেই তার রচিত ৫২৬ টি বাউল গানের সংকলন বেড়িয়েছে ২০০৫ সালে। যতদূর জানি সে বইও এখন পাওয়া যায় না কোনোভাবে। তার শিষ্যদের মধ্যেই যা কিছু ছড়িয়েছে। আমার শোনা গানগুলো এখন সবই সংকলিত। আমি রেকর্ডারে বাউলদের কণ্ঠে শোনা গানগুলো সব রেকর্ড করে রাখলেও এখানে উল্লেখের সময় সংকলন গ্রন্থেরই সাহায্য নিয়েছি। তার ছেলের মুখে একবার শুনেছিলাম বেদনাশা বট আশ্রমে মহোৎসব চলার সময় পূর্ণদাস এসেছিলেন খ্যাপার আশীর্বাদ নিতে। তখনও নাকি পূর্ণদাসের নাম হয়নি। নবনী দাসের হাত ধরে কলকাতাতে আসেননি তিনি। পূৰ্ণকে দেখা মাত্রই খ্যাপা ঠাকুর তার গলার মালা খুলে পূর্ণদাসের দিকে ছুঁড়ে দিয়ে বলেছিলেন, তোর জগৎ জোড়া নাম হবে।
পরে অবশ্য একবার পূর্ণদাসের স্ত্রী মঞ্জু দাসের মুখে শুনেছিলাম, ঠাকুরের সেই আশীর্বাদ কাজে লেগেছে।
মঞ্জু দাসী দু’হাত জোড় করে কপালে ঠেকিয়ে একথা বলেছিলেন সেদিন। আমি মঞ্জু দাসের জবানীতে ঠাকুরের সেই মালা ছোঁড়ার দৃশ্য আর পূর্ণদাসের পরিতৃপ্ত হাসি মুখখানাই যেন দেখতে পাচ্ছিলাম। বেদনাশা বটের পাতা তখন সমানে উথাল পাতাল করছে অজয় নদের বুক থেকে উঠে আসা পাগলা হাওয়ায়।
০১.৫ জীব দেহে শুক্ররূপে এ ব্রহ্মাণ্ড আছে ব্যেপে
দুপুরে অন্নভোগের পর সবে বন্ধ হয়েছে মন্দির। যুগলকিশোরের এখন বিশ্রামের সময়। সারাদিনে দর্শনার্থীর ভিড়ে তাঁরা চোখের পাতা এক করতে পারেননি। এত-এত মানুষের প্রার্থনা আর্তি সব শুনেছেন। এখন দু’দণ্ড জিরোচ্ছেন। ভক্তদের এরকমই সব বিশ্বাস। গোঁসাই বাবাজি বললেন, এত কতা কেনে? তোমাদেরও তো পেটে ভাত পড়েছে। এখন জিরোও দিকি। কতা থামান দাও তেনারা সবে শুয়েছেন।
জিজ্ঞাসা করলাম, কাদের কথা বলছেন বাবাজি?
গোঁসাই বাবাজি অবাক হলেন। সামান্য ভুরু কুঁচকোলেন। পাকা ভুরুর জঙ্গলে কৃষ্ণের হাওয়া খেলল যেন।
বললেন, বলেন কী কতা! আপনি খেলেন, খিলানে হেলান খেয়ে পা ছড়িয়ে বসলেন আর রাধামাধব জিরোলেই দোষ।
বুঝলাম, বাবাজি এতক্ষণ যুগলকিশোরের যাতে ঘুম, বিশ্রামে কোনো অসুবিধা না হয় সেজন্যই ভক্ত-শিষ্যদের নীচু স্বরে কথা বলতে বলছেন। এতখানিই রক্তমাংসের মনে করছেন বাবাজি আরাধ্য রাধামাধবকে।
বেলুড় মঠেও দেখেছি সন্ন্যাসীরা বিবেকানন্দের ঘরে সারা দুপুর ফ্যান চালিয়ে রাখেন। রাতে খাটে মশারি টাঙিয়ে গ্লাসে পর্যন্ত জল ঢেকে রাখেন। রোজ সকালে চাদর, বালিশের ওয়াড় পাল্টে দেন। রামকৃষ্ণ, সারদা মা ও অন্যান্য জাগতিক মায়া কাটিয়ে চলে-যাওয়া সন্ন্যাসীদের ঘরেও একইভাবে ফ্যান-লাইট জ্বালিয়ে, চাদর-বিছানা বদলে খাবার, জল ঢেকে রাখা হয়। এতখানি রক্তমাংসের মনে করেন তাঁরা স্থূল দেহ ছেড়ে যাওয়া এইসব সাধক-সাধিকাদের।
শঙ্কর মহারাজের মুখে একবার শুনেছিলাম বেলুড় মঠের রামকৃষ্ণ মন্দিরের পার্শ্বস্থ মাঠের কাঁকর নাকি রোজ বিকেল-বিকেল একটা-একটা করে বেছে ফেলে দেওয়া হয়। কারণ এই মাঠেই রোজ ব্রহ্মমুহুর্তে ঠাকুর স্বশরীরে পায়চারি করেন। অনেক মহারাজই ঠাকুরকে ভোরবেলাকার আচ্ছন্ন সেই আভায় হাঁটতে দেখেছেন। ঠাকুর খালি পায়ে হাঁটেন। তাই ঠাকুরের পায়ে কাঁকরের আঘাতে যাতে কোনও ব্যথা না লাগে সন্ন্যাসীরা সেজন্য রোজ রোজ কাঁকর বাছেন মাঠের।
প্রেমানন্দ গোঁসাই বাবাজিও যুগলকিশোরকে রক্তমাংসের মনে করেই ঠাকুরের বিশ্রামের সময় শোরগোলটা একটু কম করতে বলছেন।
আজ জৈষ্ঠ্য-সংক্রান্তি। যুগলের মেলার এই ভিড়ে, কলরবে যুগলকিশোর বা কতখানি বিশ্রাম পাবেন, নিশ্চিন্তে জিরোতে পারবেন খানিক-কে জানে!
দুপুরের রোদ নিস্তেজ হয়ে আসছে সবে। মেলা সাজ পরে নিচ্ছে। বাউল আখড়ায় একতারা-ডুবকি, ঘুঙুর-খমক সব এমন জোড়ায় রাখা হয়েছে যে, দেখে মনে হবে রাধাকৃষ্ণ যুগল হয়ে বসে। বাউলের রাখার ঢঙ কি তারই ইঙ্গিত করছে?
বিকেলে ফাঁকা মাঠে হাওয়া খেলছে। জিলিপি-গজার ডাঁইয়েও রাধাকৃষ্ণ মাছি পাশাপাশি জোড়ায়-জোড়ায় বসে সব। আখড়ার দিকে হাঁটছি। দোসতিনার দিলীপ দাস বাউল কুশল সংবাদ নিলেন। বললেন, রাতের গানে নেমন্তন্ন। আসবেন কিন্তু খ্যাপা।
