‘চব্বিশ’কে আরেক রূপে কল্পনা করে নিতে পারি আমরা। জৈন ধর্মাবলম্বীরা চব্বিশ জন তীর্থঙ্করের কথা বলেছেন। তাঁরা মনে করেন এই চব্বিশজনের বসবাস মানবদেহেই। কীভাবে? ছটি চক্র, ষট্যন্ত্র বা চক্রকে যারা অতিক্রম করতে পারবেন তারাই চব্বিশ জন তীর্থঙ্করের দেখা পাবেন। এই মূলাধার, স্বাধিষ্ঠান, মণিপুর, অনাহত, বিশুদ্ধ ও আজ্ঞাচক্রকে অতিক্রম করে যাওয়াই হচ্ছে চব্বিশ। অতিক্রমে রয়েছে এক, সংসার সমুদ্র পার হবার বাসনা। দুই, সংসারের অপরিপূর্ণতা। তিন, পেরিয়ে যাওয়া। চার পূর্ণতা। এই চারকে সাঙ্গ করে ছয়কে দিয়ে গুণ দিলেই বেরোবে চব্বিশ। ৬x ৪=২৪।
একশ আটেরও চব্বিশ বাদ দিতে বলেছেন খ্যাপা। ‘একশো আট’ হল চক্র সমষ্টি। মূলাধারে চতুর্দল, স্বাধিষ্ঠানে ষড়দল, মণিপুরে দশদল, অনাহতে দ্বাদশ দল, বিশুদ্ধে ষোড়শদল, আজ্ঞায় দ্বিদল। যোগ করলে দাঁড়ায় একশো। (১৪+১৬+১০+১২+২৬+২) =১০০ আর অষ্টপাশের আট যদি নিই তাহলে সর্বমোট একশো আটই হয়। ১০০+৮=১০৮। চব্বিশ বাদ ধরি এইভাবে ১০+৪+৮=২৪। জ্ঞানেন্দ্রিয় ও কর্মেন্দ্রিয়ের দশ,চারভূতের চার, অষ্টপাশের আট। হল গিয়ে সর্বমোট চব্বিশ।
আবার গুরুচক্রে শতদল বিশিষ্ট পদ্ম থাকে। এইটি অষ্টম চক্র, তাহলে শতদল। আর অষ্টম চক্রের আট যোগেও একশো আটই হয়। ১০০+৮=১০৮। এই পদ্মে ধ্যানে বসলে সাধক গুরুর কৃপায় সর্বসিদ্ধি ও দিব্যজ্ঞান লাভ করেন। এখানে ধ্যানে খ্যাপার গানের কথানুযায়ী সাধক সিদ্ধ মহাপুরুষ’ হন।
সাধক বলে থাকেন এটি একটি হংসপীঠ। গুরুপীঠও বলতে শুনেছি আমি অনেককে। গুরুপীঠ কেন? গুরুচক্রের মধ্যে যে শতদলবিশিষ্ট পদ্মের কল্পনা তার কর্ণিকায় ত্রিকোণমণ্ডল থাকে। তিনটি বর্গের তা–হল,ক্ষ। এই মণ্ডলকে যোনিপীঠ ও। শক্তিমণ্ডল বলে। ওই শক্তিমণ্ডলের মধ্যেই তেজোময় কামকলামূর্তির দেখা মেলে। তেজোময় জ্যোতিকে হংস স্বরূপিনী করে নিচ্ছেন সাধক। এই হংস শ্বেতবর্ণের। ধবধবে সাদা রঙের। শরীর জ্ঞানময়ের। পাখা দুটি আগম, নিগমের। পা দুটি শিবশক্তিময়, চক্ষুদ্বয় প্রণবস্বরূপ, নেত্র ও কণ্ঠ কামকলাময়। এই হংসই গুরুদেবের পাদপীঠ স্বরূপ। এই হংসের উপর গুরুবীজ ঐং আছে। বলা হয় গুরুদেব স্বয়ং এখানে অবস্থান করেন। তার বাঁ দিকে গুরুপত্নীও রয়েছেন।
হংস’র এই যে রূপকল্পনা তা মনে হয় শ্বাসবায়ুরই কল্পনা। আমাদের শ্বাস ও প্রশ্বাসে যে শব্দ হয় তার রূপ ‘হং’ ও ‘স’। এই ‘হং’ ও ‘স’ যদি সরলরেখায় হয় তাহলেই কুম্ভক হয়।
গানে খ্যাপা, ‘চৌদ্দ ব্রহ্মাণ্ডের কথা’ও বলছেন। চুরাশি সংখ্যার কথাও আছে। চুরাশি যোনি শরীরে চুরাশিটি আঙুল। ৮৪ লক্ষ বিভিন্ন যোনিতে জন্মের পর মানুষ জন্ম হয় বলে বিশ্বাস করা হয়ে থাকে। একশো আট থেকে চব্বিশ বাদের এই হল প্রতীকময়তা। ‘চৌদ্দ ব্রহ্মাণ্ড’কে শরীরের প্রধান চোদ্দটি নদীরূপী নাড়িও ভাবা যেতে পারে। তার মধ্যে প্রধানা তিন নাড়ি ইড়া/গঙ্গা, পিঙ্গলা/যমুনা, সুষুম্না/সরস্বতী। সাধক বলেন ত্রিবেণী। এই তিন নদীরূপী নাড়িকে জাগিয়ে দিয়ে সাধক বাহ্য স্নান সারেন। আর এই স্নানে অর্থাৎ তিন নাড়িকে ঠিকমতো যোগক্রিয়ায় জাগাতে পারলে মহাশক্তির বিকাশ ঘটে। যা চার বেদ চোদ্দ শাস্ত্রের জ্ঞান হয়। ‘চোদ্দ ব্রহ্মাণ্ড’কে এই প্রতীকেও রাখতে পারি আমরা। কিন্তু সঠিক হিসাবে রাখতে গেলে চৌদ্দ ব্রহ্মাণ্ডকে ধরতে হবে শরীর। মদন শা ফকিরের গানেও তার প্রকাশ পাই–’জান গা কোথায় হাওয়ার স্থিতি। / ও তার চৌদ্দ পোয়া চৌদ্দ ভুবনে কে কোথায় করে বসতি।।’ চোদ্দ ভূবন–ও দেহভাণ্ড। ব্রহ্মাণ্ড স্বরূপ তা। ‘চোদ্দ পোয়া’ও কিন্তু শরীরের গড়ন। মানে হল সাড়ে তিন হাত। আমরা সবাই মৃত্যুর পর সাড়ে তিন হাত জমির কথাই বলি। লোকায়ত গানেও তার প্রকাশ আছে। এটাও একটা প্রতীককল্প। বলি এই কারণেই, যার যার নিজের হাতের মাপে তার শরীর সাড়ে তিন হাতই। তাই ওটুকু জায়গা না হলে পোড়াতে, গোর দিতে, সমাধিস্থ করতে শরীরকেই আটানো যাবে না।
খ্যাপা বলেছেন–’যায় বাহান্ন তায় তিপান্ন/ ওই দেখ আছে পঞ্চতত্ত্ব গাঁথা।‘ কী এই সংখ্যা? বাহান্ন বা তিপান্ন হল–রস বহন করা বিভিন্ন নাড়ি। এই রস নারী শরীরের রজ। বাউল ‘তিপান্ন গলি’ বলতে গানে বোঝান সঙ্গিনীর/ নারীর শরীরের রূপকল্পকেই। ফিকিরচাঁদ সরকার ওরফে চাদমুদ্দিনের গানেও তার প্রকাশ পাই–’ঢাকা শহর ঢাকা যতক্ষণ/ ঢাকা খুলে দেখলে পরে থাকবে না তোর সাবেক মন।।/ ঢাকার কথা শোন তোরে বলি ঢাকার ভিতর আছে ঢাকা তিপান্ন গলি।‘ ‘পঞ্চ’ তো পঞ্চভূত। ‘পাঁচে পাঁচে পঁচিশ’ পঞ্চভূতকে পাঁচ দিয়ে গুণ। যেজন্য এই গুণ, শরীরের পাঁচচক্রে তাঁদের স্থান। সহস্রদল দেখার কথা বলেছেনে খ্যাপা শেষে। সহস্রদল সহস্রার চক্রের দ্যোতক। যা শরীরের নবম পদ্ম। সহস্রদল পদ্মের চারদিকে পঞ্চাশ দল বিরাজিত এবং এটি কুড়িটি স্তরে সাজানো। প্রত্যেক স্তরে পঞ্চাশ দলে পঞ্চাশটি মাতৃকাবর্ণ আছে। এই শক্তিমণ্ডলেই সাধক বলেন তেজপুঞ্জ আছে। যা বিন্দুস্বরূপ। এই বিন্দুই পরমশিব। এই বিন্দু প্রত্যক্ষ করাকে বলা হয় ব্রহ্মসাক্ষাৎকার। অর্থাৎ তিনি সমগ্রশক্তিকে জেনে নিজেই শিবস্বরূপ ব্ৰহ্ম হয়ে ওঠেন। সহস্রদলে ধ্যানে এসবের দর্শন হয়। জগদীশ্বরত্ব প্রাপ্তি এই পদ্মের ধ্যানেই।
