বিশ্বাস করেন বীর্য প্রকৃতি বা সৃষ্টির জড় উপাদান। তাই তা ভক্ষণ করাও উচিত। শিক্ষার্থে তাঁরা গুরুর নির্দেশে শরীরের জিনিস শরীরের মধ্যে ফিরিয়ে আনেন। সকালবেলাকার বিষ্ঠা থেকে খানিক তুলে মুখে দেন। বাকিটা ফেটিয়ে মাখনের মতো করে ফেলেন। তাতে বদ গন্ধ কমে। তা গায়ে-মুখে-চোখে-নাকে সর্বাঙ্গে মেখে নিয়ে কিছুক্ষণ রেখে স্নান করে পরিষ্কার হন। পেচ্ছাব/প্রস্রাব মাটির হাঁড়ি বা নারকেল মালাতে ধরে খেয়ে শরীরের মধ্যেই ফিরিয়ে নেন ফের। ‘অষ্টপাশ’ না ঘুচলে এ কখনও সম্ভব নয়। তবে এখনকার বাউল এই আচরণ কতটা পালন করেন যথেষ্ট সন্দেহ আছে। বাউল সাধনে গানই পুরনো সিদ্ধ স্তরের মানুষজনদের লেখা। এখনকার বাউল যে গান লেখেন তাতে চটকদারি কথাবার্তা যত থাকে সাধনতত্ত্বের কথা সেভাবে থাকে না। এরকম গান আমরা আকছার শুনতেও পাই। বাউল বলেন, শ্রোতারা এখন এসবই পছন্দ করেন। তাই আমরা লিখি, সুর করি, গাই। যার জন্য বাউল আসরে এখন ‘সাইকেলের মধ্যে চাকা দু’দিক ফাঁকা’, ‘বন্ধু আমার রসিয়া’, ‘এঁড়ে গরু বেড়া ভেঙে খেজুর গাছে চড়েছে’–এসব গানও শোনা যায়। তবে শখের বাউলরাই শ্রোতাদের মনোরঞ্জনের জন্য এসব পরিবেশন করেন বেশি। যারা দশ-কুড়ি বছরের বেশি বাউল গান করছেন, গানকেই পেশা হিসাবে নিয়েছেন, হয়তো কিছু আচরণও পালন করছেন জীবনে, তাঁরা কিন্তু চট করে আসরে আজেবাজে গান গানই না একেবারে। গাইলেও আসর বুঝে গান।
খেপীর ‘অষ্টপাশের’ কথা বাউল বলেছেন। যা থেকে মুক্ত হয়ে না এলে সাধন সঙ্গিনী হয়ে ওঠা সম্ভব নয়। বাকি রইল খ্যাপার চোদ্দ। ‘দশ-দশটা ইন্দ্রিয় আর চারভূতের’ কথা ষষ্ঠী খ্যাপা বলেছিলেন। তবে গানের তালে তাঁকে আর ব্যাখ্যা করে উঠতে পারেননি বোধহয়। না হয় গাইতে-গাইতে আবেশে, ভাবোন্মাদনায় ভুলেই গেছেন সেসব।
‘দশ-দশটা ইন্দ্রিয়’ কী? এই দশেন্দ্রিয়ের পাঁচটি হল জ্ঞানেন্দ্রিয়, বাকি পাঁচটি কর্মেন্দ্রিয়। অর্থাৎ দশেন্দ্রিয়ের দুই ভাগ। পাঁচটি করে। জ্ঞানেন্দ্রিয়গুলো হল–চোখ, কান, নাক, জিভ, ত্বক/চামড়া। কর্মেন্দ্রিয়–বাক, পাণি, পাদ, পায়ু, উপস্থ।
খ্যাপা বলছেন–’ক্ষ্যাপার চৌদ্দ ক্ষেপীর আট বল, এই নিয়ে কার মাথা ব্যথা।।‘ অর্থাৎ সাধক ও সাধন সঙ্গিনীর যুগল সাধনক্রিয়াতে কারও মাথা ব্যথা হবার কথা নয়। এ যে দু’জনের একত্র সাধনা। তাই এই সাধনক্রিয়া অপরের জানবার দরকার নেই। খ্যাপা জানুক তার এই ‘দশ দশটা ইন্দ্রিয়কে’। খেপীও চিনে নিক ‘অষ্টপাশ’কে তবেই সাধনা অগ্রগতির পথে যাবে।
তবে খ্যাপার ‘চৌদ্দ’কে আমরা মূলাধার পদ্ম কি ভাবতে পারি না? আর খেপীর আটকে যদি ‘অষ্টপাশ’ না ধরে ধরি সঙ্গিনীর আটটি প্রত্যঙ্গ–মুখ, দুই স্তন, দুই হাত, বুক, নাভি, যোনি। বাউল একে ‘অষ্টমচক্র’ও কিন্তু বলেন। আমার মনে হয় এই ভাবনাও আদতে খুব একটা ভুল হবে না।
কারণ, মূলাধারে চতুর্দশ পাপড়ির পদ্ম কল্পনা করে থাকেন সাধক। এই পদ্মে ধ্যানে,প্রাণায়ামে, শ্বাসক্রিয়ায় তিনি একেক চক্রের গাঁট খুলতে খুলতে বা পদ্মের পাপড়ি ছিড়তে ছিড়তে ক্রমশই উপরের দিকে ওঠেন আর তা উঠতে থাকলেই তো সেই বাউল কথিত জ্ঞানেন্দ্রিয়, কর্মেন্দ্রিয় ও চারভূতকে পরাস্ত করে দিতে পারেন। আর এই চারভূত তো শরীরের চারটি চক্ৰতেই বিরাজ করে। মূলাধারেই পৃথ্বীমণ্ডল। স্বাধিষ্ঠানে বরুণমণ্ডল, মণিপুরে অগ্নিমণ্ডল, অনাহতে বায়ুমণ্ডল, বিশুদ্ধে আকাশমণ্ডল। ক্ষিতি, অপ, তেজ, মরুৎ, ব্যোম। যাঁদের রুদ্ধদ্বার খুলতে পারেন সাধক ধ্যানে, যোগে, ক্রিয়ায়।
‘অষ্টপাশ’কে আটটি প্রত্যঙ্গ ভাবার কারণ তন্ত্রমতে ভৈরব মৈথুনে বা ভৈরবী চক্রে ভৈরবীর এইসব প্রত্যঙ্গগুলোর পূজা সেরে নেন প্রথমে কামপাশ মুক্ত করেন সাধক বা তান্ত্রিক এভাবে। বাউলও যুগল আসনে সঙ্গিনীর তীর্থক্ষেত্র স্বরূপ মুক্ত শরীরে ভ্রমণ করেন। মোহ কাটান, কাম নিয়ন্ত্রণ করেন প্রত্যঙ্গগুলোতে প্রবেশ করে গুরু নির্দেশিত ‘শরীরই তীর্থক্ষেত্র এই ভাবনায়। তাহলে সঙ্গিনীর ‘অষ্টপাশ’কে আটটি প্রত্যঙ্গ ভাবতে দোষ কোথায়? বাউল ‘অষ্টপাশ’ খেপীকে আট দিয়ে খ্যাপার দশেন্দ্রিয়র সঙ্গে মিল দিতে চেয়েছেন। ১০+8= ‘চোদ্দ’ প্রতীককে ‘আট’ এ এনেছেন সেই ভেবেই। না হলে বাউল সঙ্গিনীকেও কিছু তো শ্বাসের কাজ শিখতেই হয় সাধককে সাহায্যার্থে। তা শিখতে শিখতেই তো মোহপাশ/ অষ্টপাশ কাটে। পাশমুক্তি হয়। তাই অষ্টপাশ ও দশেন্দ্রিয় আর চারভূতের ‘আট’ ‘চোদ্দ’কে এভাবেও প্রতীকীরূপ দিতে পারি। বাউল তা না মানলেও শরীরবিজ্ঞানকে কী করে অস্বীকার করব আমরা?
খ্যাপা ‘চব্বিশের ছয়’ ছেড়ে দিতে বলেছেন। ছয় বুঝতে অসুবিধা হবার কথা নয়। ষড়রিপু। কিন্তু চব্বিশ কী? চব্বিশ হল সেই ‘চোদ্দ’র মতই যোগফল। ষড়রিপুর ছয়, জ্ঞানেন্দ্রিয় আর কর্মেন্দ্রিয় মিলিয়ে দশ, অষ্টপাশের আট। মোট চব্বিশ। এর থেকেই ছয় বাদ দিতে বলা হচ্ছে। তাহলেই নিজের মনের কথা পাওয়া যাবে। কীভাবে তা সম্ভব হবে? ষড়রিপুর ‘ছয়’ বাদ হলে জাগতিক জিনিসগুলো তো সব বাদ পড়ে যাচ্ছে। যা সাধনায় অনিবার্য। মনকে সেই স্তরে নিতে ষড়রিপু বর্জন প্রয়োজনীয়। তাই বাউল সাধক বলছেন সক্রিয় রিপুগুলোকে নিষ্ক্রিয় করে নিতে।
