শুনরে (তোরা) ক্ষ্যাপার কথা–
ক্ষ্যাপার চৌদ্দ ক্ষেপীর আট।
বল, এই নিয়ে কার মাথা ব্যাথা।।
শুনরে তোরা খ্যাপার কথা।
চব্বিশের ছয় ছেড়ে দিয়ে…
এবার, যুক্তি কর যেথা সেথা।
বাহান্নর চার বাদ দিয়ে দেখ
(তোরা) পাবি নিজের মনের কথা।
শুনরে তোরা, ক্ষ্যাপার কথা।
ক্ষ্যাপার চৌদ্দ ক্ষেপীর আট
বল, এই নিয়ে কার মাথা ব্যথা।
একশ আটের চব্বিশ বাদে
গণনাতে হয় চুরাশি
সাধক সিদ্ধ মহাপুরুষ
কথায় বলে একাই আসি
শুনরে তোরা, ক্ষ্যাপার কথা।।
ক্ষ্যাপার চৌদ্দ ক্ষেপীর আট
বল, এই নিয়ে কার মাথা ব্যথা।।
বিশ্বজুড়ে দেখনা ঘুরে
(আছে) চৌদ্দ ব্রহ্মাণ্ডের কথা।
অষ্টাদশে শ্রীমদ্ভাগবত
(ক্ষ্যাপা) গুরুশিষ্যের স্বার্থকতা–
শুনরে (তোরা) ক্ষ্যাপার কথা।
ক্ষ্যাপার চৌদ্দ, ক্ষেপীর আট বল,
এই নিয়ে কার মাথা ব্যথা।
শুনরে (তারা) ক্ষ্যাপার কথা।।
যায় বাহান্ন তায় তিপান্ন
ওই দেখ আছে পঞ্চ, তত্ত্ব গাঁথা।
(ক্ষ্যাপা) সহস্র দল দেখবি হেথা–
শুনরে তোরা ক্ষ্যাপার কথা
ক্ষ্যাপার চৌদ্দ ক্ষেপীর আট
বল, এই নিয়ে কার মাথা ব্যথা।।
তিনি বলেছিলেন, খ্যাপার চৌদ্দ হল গিয়ে আমাদের শরীরের দশ-দশটা ইন্দ্রিয় আর চারভূত। খেপীর আট অষ্টপাশ।
অষ্টপাশ বললেন তিনি–ঘৃণা, লজ্জা, ভয়, শঙ্কা, জিগীষা, জাতি, কুল, মান।
প্রচলিত এক প্রবাদের কথা আমরা সকলেই জানি–’লজ্জা ঘৃণা ভয়, তিন থাকতে নয়।‘ বাউলও তাই বিশ্বাস করেন। তান্ত্রিক সাধকদেরও এমতে পূর্ণ আস্থা আছে।
খ্যাপা ব্রহ্মানন্দ আমায় বলেছিলেন, আগে পাশমুক্তি। পাশমুক্তি না হলে সাধন হবে না।
অমাবস্যার রাতে নিঝুম গৌরনগর শ্মশানে যজ্ঞে বসবেন তিনি। কুণ্ড তৈরি করতে তখন ব্যস্ত। জিজ্ঞাসা করলাম, বাবা বুঝিয়ে বলুন। এর আগেও বেশ কয়েকবার তিনি আমার নানা জিজ্ঞাসা, কৌতুহলের উত্তর দিয়েছেন।
বললেন, পাশ হল বন্ধন। এই বন্ধনই তোমার স্বরূপকে বাউরে আসতে দিচ্ছে। লজ্জা, ঘৃণা, ক্ষুধা, নিদ্রা, ভয়, ক্রোধ, কাম প্রভৃতি নানারকম পাশ আছে। তাঁর উর্ধ্বে যেতে হবে। ছিঁড়ে দিতে হবে বন্ধন।
বললাম, কীভাবে ছিঁড়বে এই বন্ধন?
শ্লোক আওড়ালেন বাবা: ‘পাশবদ্ধো ভবেৎ জীবঃ, পাশমুক্তঃ সদা শিবঃ।‘
হোমকুণ্ডে যন্ত্র আঁকছিলেন তখন বাবা। রেড়ির তেলে জ্বালানো প্রদীপের শিখা তখন কেঁপে কেঁপে যাচ্ছে, বেঁকেচুরে আবার জ্বলছে সোজা হয়ে। হাওয়া থামলে স্থির হয়ে যাচ্ছে শিখা। তবে সেটা দু’এক মিনিটের জন্য। অদূরে গঙ্গার হাওয়ার আজ সেইভাবে নেই বিরাম কোনও শিখা কাঁপছে। সেই কাঁপা শিখার আলোতে দেখলাম বাবা একটি সোজা ত্রিভূজ এঁকে তার উপর উল্টানো ত্রিভূজ আঁকছেন। তাদের গায়ে সোজা-উল্টো অসংখ্য ত্রিভূজ।
আঁকতে আঁকতেই বললেন, মনে কর ভয়ের পাশ থেকে মুক্ত হতে হবে, তার জন্য অমানিশায় শবের উপর বসে একমনে ধ্যান করতে হবে। কাম জয় করতে ভৈরবী মা’র সঙ্গে সম্পূর্ণ উত্তেজিত অবস্থায় মৈথুনের ভেতরই জপে মগ্ন হতে হবে। আমার গুরুর গুরুদেব শ্মশানে মরা এলে তার মাথা ফাটানোর সময় চিতার সামনে এসে দাঁড়াতেন। খুলি ফাটলেই সেই রস তিনি নিয়ে রাখতেন পাত্রে। পরে ভাতের সঙ্গে মেখেমুখে খেতেন। ঘেন্না পেলে চলবে?
বাউলের অষ্টপাশের সঙ্গে তন্ত্রের অষ্টপাশে কিছু হেরফের আছে। কারণ বাউলকরণ, সাধন তন্ত্রসাধনের মতো অত ভয়াবহ ক্রিয়া কখনওই নয়। বিভৎস রস সেখানে বেশ কম।
খেপীর আট অষ্টপাশ সাধক ও সাধনসঙ্গিনীকেও পেরোতে হয়। ব্রহ্মানন্দ যে মরার মাথার খুলির রস খাবার কথা বলছিলেন অঘোরী সাধুরা তা খান। তন্ত্রক্রিয়া শ্মশানে করতে হয় কেন? একবার ব্রহ্মানন্দকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম আমি। তিনি কিছু উত্তর দেননি। শুধু নিজের দেহকে বার বার দেখাচ্ছিলেন।
বললাম, দেহকে শ্মশানরূপ দিতে চাইছেন কি?
কিছু বললেন না তিনি।
তার ভৈরবী ছিলেন মানদা মা।
মা গলায় একটা স্নেহময়ী সুর নিয়ে বললেন, ঠিক ধরেছিস তুই।
বললেন, শ্মশান আসলে আমাদের ক্ষুধা, তৃষ্ণা, ঘৃণা, ভয়, লজ্জা, মান, রাগ, দ্বেষ–এই সব থেকে মনকে বের করে আনা। মনকে ধুয়ে মুছে নির্জন ধূ ধূ করে দেওয়া। শ্মশানপুরীর রূপ দেওয়া। মনের কামনাকে পুড়িয়ে দাওয়াই হল শ্মশান। তন্ত্রক্রিয়া পাশমুক্তির সাধনা। তাই শ্মশানেই করতে হয় বেশিরভাগ ক্রিয়াকর্ম।
‘অষ্টপাশে’ বাউল ’জাত কুল’কে ধরেন। তান্ত্রিক তা ধরেন না। তাঁরা আবার কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ, মদ, মাৎসর্য, ক্ষুধা, তৃষ্ণা–এভাবেও ‘অষ্টপাশ’ বলেন। তবে ব্যাপার কিন্তু ঘুরে ফিরে মনের কামনাকেই সংবেদন ও বোধের মাঝখান থেকে টেনে বের করে আনা বোঝায়। কী তন্ত্রে, কী বাউলে।
‘জাত কুল’ বাউল ‘অষ্টপাশে’ আনেন বোধহয় এই কারণেই, তথাকথিত যাতে তাঁরা বিশ্বাস রাখেন না বলেই। পাঞ্জু শাহের গানেই আমরা পাই–’জেতের বড়াই কী/ ইহকাল-পরকালে জেতে করে কী–/ আমার মন বলে অগ্নি জ্বেলে দিই জেতের মুখি।‘
পাঞ্জু ‘জেতের মুখি’ অগ্নি জ্বাললেও মূলত তফসিল পরিবার থেকেই তাঁরা আসেন বেশি। বর্ণহিন্দু, বৈষ্ণব ও মুসলমান পরিবার থেকেও বাউল উঠে আসেন। বৈষ্ণব পরিবার থেকে অনেকে আসেন বলেই বোধহয় বৈষ্ণবীয় আচরণ তাঁরা বাউল-আচরণের মধ্যে ঢুকিয়ে দেন। মুসলমান পরিবার থেকে উঠে আসা বাউলরা তাঁদের গানে আরবি, উর্দু, মুসলমানি শব্দকে ব্যবহার করেন অকাতরে। তবে ফকিরি গানে এর আধিক্য বেশি দেখা যায়।
