শশাঙ্ক দাস বৈরাগ্য প্রাণায়াম চৌষট্টি বার করতে বলেছেন কেন? এই প্রশ্ন স্বভাবতই মনে আসতে পারে। বাউল তাঁর অনেক গানেই ‘চৌষট্টি গলির কথা বলেছেন। চৌষট্টি গলি রক্তবাহী প্রধান চৌষট্টিটি ধমনী। শ্বাসক্রিয়া এগুলোতে ঠিকমত ছড়ানোর জন্যই এই বিধি। আট বার প্রথমে করতে বলার নির্দেশ। যেটা মনে হয় ‘অষ্টশক্তি’কে জাগিয়ে দেবার জন্যই বোধহয় আটবার করতে বলা। ষোলবারের ব্যাখ্যা দিতে পারি এইভাবে–শরীরের ষোলোটি প্রধান ধমনী। চারটি হৃদপিণ্ডের আ বাঁকি বারোটি শরীরের অন্যপ্রান্তের। এখানেও শ্বাস ছড়ানো দরকার উর্ধ্বযোগের জন্য ঠিকমতো। বৈষ্ণব সাধকও প্রাণায়াম করেন। মহেশ পণ্ডিতের শ্রীপাঠের সনাতন বাবাজি ষোলো বার প্রাণায়ামের বিধিকে ষোলো নাম আর বত্রিশ বার করাকে বত্রিশ অক্ষরের সদৃশ মানে তাঁকেই স্মরণ করা বলে আমাকে বলেছিলেন। এই ষোলো নাম–হরে কৃষ্ণ হরে কৃষ্ণ কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরে হরে। হরে রাম হরে রাম রাম রাম হরে হরে। তা বত্রিশ অক্ষরের হয়ে থাকে। প্রথম ধাপটি অর্ধাংশ আট বারের। একে আট বার করার সঙ্গে মেলাতে পারি আর নাম দু’বার সম্পূর্ণ জপলে চৌষট্টি হয়ে যাচ্ছে।
ঘরে পঞ্চভূত আর ষড়রিপুর কথা খ্যাপা বলেছেন। যার যোগফল এগারো জন সদস্যের। যারা ‘হাসায় কাঁদায় নাচায় গাওয়ায়’–অর্থাৎ কিনা এই পাঁচটি উপাদান। শরীরের পাঁচচক্রে জড়িয়ে গিয়ে সাধককে সিদ্ধিতে বা অকৃতকার্য হতে সাহায্য করে। ষড়রিপুর ক্ষেত্রেও এই একই কথা প্রযোজ্য। সাধককে তো কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ, মদ, মাৎসর্যের উপরে উঠতে হয়। পাঁচটি উপাদানের ক্ষিতি থাকে মূলাধারে, অপ স্বাধিষ্ঠানে, তেজ মণিপুরে, অনাহতে মরুৎ এবং বিশুদ্ধচক্রে ব্যোম অবস্থান করে। এই পাঁচ চক্রে পঞ্চভূতের এই ধ্যানে উধ্বগতির যোগ চলতে থাকে। আর এসব ঠিকমতো সাধক না করতে পারলেই কাঁদা হাসার প্রশ্ন। আর ঠিক হলে নাচা-গাওয়ার। অর্থাৎ কিনা সিদ্ধ স্তরে অগ্রগতির আনন্দ। ঘরে কুমতি সুমতির বাস। সুমতি হল সিদ্ধ মতি। যা অগ্রগতি ঘটাবে। আর কুমতি হল পশ্চাৎগমন। যা সাধককে ঠেলে নামাবে নীচে। এই নীচে নামানো হল কুমতি। মানে বীর্যের নিম্নগতি। ‘সুমতি ঊর্ধ্বারে’ অবস্থা। তাঁদের ঠিকমত চালনা না হলেই ঘর ভাঙাগড়ার প্রশ্ন। এই গড়া-ভাঙার ইচ্ছা সাধকেরই হাতে। গুরু তাঁকে পথ দেখান মাত্র। সঠিক পথে ‘পূর্ণানন্দে প্রাণ’ একীভূত হয়। এই আনন্দ সিদ্ধস্তরেরই ছায়ানুবাদ। খ্যাপা তাঁর কথাই বলতে চেয়েছেন পদে। যেখানে উন্মীলিত সৌন্দর্যের সুধাকনা আছে। স্তব্ধ, ছায়াচ্ছন্ন। হয়ে ভাবলেই তাঁর ছবি ফুটে উঠতে পারে মনে। বাউলের গান সেই ছবিরই প্রতিলিপি হাজির করতে চায় সব সময়, সকল সময়।
গানে কথিত পূৰ্ণানন্দকে আমরা ভাবতে পারি এভাবেও–নটি চক্রের শেষ চক্র সহস্রার। এই চক্রের ধ্যানেই সাধক পরমাত্মা বা মূলসত্তার স্বরূপ ধরতে পারেন। মূলাধারের আগত শক্তি সহস্রারে এসে মিলিত হয়ে সাধকের মধ্যে এক তেজোময় দীপ্তি ফুটে ওঠে। এই দুই চক্রের সংযোগে সাধক এই সৌন্দর্য্যের বা নিরাকার মহাশূন্যতার। শোভা উপভোগ করেন। এই শোভা উপভোগকেও আমরা পূর্নানন্দ হিসাবে দেখতে পারি। বায়ুসাধনা বা প্রাণায়াম বাউল সাধক যে বলছেন আট, ষোলো, বত্রিশ, চৌষট্টি বার করতে। এটাও চার গুণিতকে বেড়ে যাচ্ছে অঙ্কের হিসাবে। চৌষট্টির পর একশো আট বার। শশাঙ্ক দাস তা না বললেও, বেশি বার করার অর্থই উধ্বরে অবস্থাতে দ্রুত পারঙ্গমতা। তাই চৌষট্টির পর আর করা যাবে না এ কখনওই ঠিক না। নইমুদ্দীনের গানে আমরা তাঁরই উল্লেখ পাই–’এক দুই তিন হবে চারি তাহাতে দুই গুন করি/ চতুর্থ গুণ করলে পরে নির্বাস হয় ভারি।।/ সাধ্যমতি উর্ধ্বগতি তখন খেলিবে রূপের কাঞ্চন।।/ ও সে নইমের বচন তিন বীজে প্রাণায়াম/ অধঃলিঙ্গে উধ্বশৃঙ্গে কি লিঙ্গে মিলন/ কুম্ভক পুরা হবে সারা। বললাম তোরে বিবরণ।।‘
শিবরাত্রি উপলক্ষ্যে দিঘরাতে প্রতিবারই বসে বাউল গানের আসর। একবার এই আসরেই ষষ্ঠী খ্যাপার গান শুনেছিলাম। নানা গানের মাঝে তিনি সেদিন একখানা খ্যাপার গানও গেয়েছিলেন। খ্যাপা মনোহরের গান তিনি আরও অনেক আসরেই গেয়েছিলেন। আমার বহুবার এই গানখানা তাঁর মুখে শোনার সৌভাগ্য হয়েছিল।
ষষ্ঠী খ্যাপা ভাবোন্মাদ থাকেন সব সময়। যত বারই কথা বলেছি তাঁর সঙ্গে সেরকমই আমার মনে হয়েছে। গেরুয়া পরেন না তিনি। নানা রঙের তালি লাগানো জোব্বা পরে মঞ্চে ওঠেন। তাঁর নাচ সাধারণত বাউল নাচের যে আঙ্গিক সেরকমটি একেবারে নয়। তাঁর নাচের কৌশল ভিন্নতর। মঞ্চে অনেকখানি জায়গা জুড়ে গোল ঘূর্ণাবর্তকে ভেঙেচুরে তিনি নাচেন। যা বাউলরা একেবারে করেন না।
জিজ্ঞাসা করেছিলাম, মন্ত্রদীক্ষার মত কী আপনার?
বলেছিলেন, বৈষ্ণব মতে দীক্ষিত আমি। এখনও গাঁয়ে-গাঁয়ে মাধুকরী করেই বেড়াই। তবে বাউল শিক্ষার জন্য তিনি অনেকেরই কাছে ঘাঁটি গেড়েছিলেন। বেশ কিছু নাম বলেছিলেন সে সময়।
দিঘরাতেই তাঁর বাড়ি। তাই এ আসরে রাত করেই তিনি মঞ্চে ওঠেন। বহিরাগত বাউলদের গাওয়া হয়ে গেলে। বলা ভালো, তাঁর টানেই এরা এখানে আসেন। মাঝরাতে তিনি সেবার ধরেছিলেন খ্যাপার গান। গানের মাঝে মাঝে কিছু প্রতীকের রূপকল্পকে সামনে আনছিলেন। শুনতে বেশ ভালোই লাগছিল। গাইছিলেন তিনি খ্যাপার গান। একতারাকে বাজিয়ে নিয়ে নাচে যেন সারা শরীরই বাজিয়ে নিচ্ছিলেন তিনি।
