‘বায়ু’ যোগক্রিয়ায় অনিবার্য এক ব্যাপার। বাউল বলেন ‘দমের কাজ’। দম কথার অর্থ নিশ্বাস-প্রশ্বাসকে রোধ করা। গুরুর কথামতো তাঁরা প্রথমে শ্বাসক্রিয়া বা প্রাণায়াম রপ্ত করেন। পাতঞ্জল যোগশাস্ত্রে আছে–’তস্মিন সতি শ্বাসপ্রশ্বাসইয়োর্গতিবিচ্ছেদঃ প্রাণায়াম।‘ অর্থাৎ শ্বাস-প্রশ্বাসের স্বাভাবিক গতি ভঙ্গ করে শাস্ত্রোক্ত নিয়মে অভ্যাস বা বিধৃত করার নাম হল প্রাণায়াম। প্রাণ বায়ু আর অপান বায়ু। দ্বয়ের সংযোগ। শ্বাসের এই যুগল ক্রিয়া শরীর সাধনার যুগল দেহের আনুরূপ্য আরও ঈষৎ রূপকেই যেন বিস্তার করে। ‘প্রাণাপানসমাযোগঃ প্রাণায়াম ইতীরিতঃ/ প্রাণায়াম ইতি প্রোক্তো রেচকপূরককুম্ভকৈঃ।।‘ প্রাণায়াম বলতে আমরা সাধারণত রেচক, পূরক, কুম্ভকের কথাই বুঝি। বাউলও এই তিন প্রাণায়ামের কথাই বলেন। চণ্ডী গোঁসাইয়ের গানেই আছে–’ইড়া পিঙ্গলা সুষুম্নাতে/ রেচক পূরক কুম্ভক তাতে/ দেখিস যেন এক নাড়িতে/ ভাবিসনে তিন সেরে যাই।‘
গুরুর নির্দেশে শিক্ষানবীশ বাউল প্রথমে বাঁ নাকের সাহায্যে বাইরের বাতাসকে টেনে এনে শরীরের অভ্যন্তরে রেখে ধীরে ধীরে ডান নাক দিয়ে ছেড়ে দেয়। এই যে বাইরের বাতাসে শরীরের অভ্যন্তর পূর্ণ হচ্ছে সেজন্য এর নাম পূরক। শরীরের ভেতরে এই যে বাতাস ধরে রাখা তা অনেকটা কলসিতে জল ভরে রাখার মতই। তাই এর নাম কুম্ভক। আর বাতাসকে যখন ডান নাক দিয়ে নিয়ে বাঁ নাক দিয়ে বের করে দেওয়া হচ্ছে তখন তাঁর নাম রেচক। এই ক্রিয়া বাউলকে শিখতে হয়, এতে সমস্ত নাড়ি পরিশুদ্ধ হয়ে সুষুম্না দিয়ে সোজা উপরে উঠতে আরম্ভ করে। উর্ধ্বপথ এভাবেই তৈরি করে নিতে থাকেন শিক্ষানবীশ বাউল। এই উধ্বযোগেই বিন্দুধারণ শক্তি অর্জন করা যায়।
শশাঙ্ক দাস বৈরাগ্য বাউলকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, কতবার এই প্রাণায়াম করতে হয়?
তিনি দাঁতহীন গালের দুদিকে হাসিতে সেই গর্ত বুজিয়ে কিছু পর আমাকে বললেন, এই করণকৌশলের নানা নিয়ম আছে। গুরুর কাছে এসবই শিখতে হয়।
বললাম, আমাকে করণকৌশল জানতে হবে না। যদি বাধা থাকে বলতে। শুধু বলুন দিনে কতবার এই প্রাণায়াম করতে হয়?
তিনি আমাকে ভাসা ভাসা ভাবে তিন আসনের কথা বলে বললেন, এই সব প্রাণায়াম প্রথম-প্রথম আট, তারপর বাড়িয়ে ষোলোষোলোর পর দ্বিগুণ, এরপর আবারও দ্বিগুণ।
বুঝলাম আট, ষোলো, বত্রিশ তারপর একেবারে চৌষট্টিবার করতে হবে। বাউলের ভাষায় যে যতক্ষণ ‘দম’ রাখতে পারবে সে তত তাড়াতাড়ি সিদ্ধ স্তরে উঠে যাবে।
বৃহদারণ্যক উপনিষদে চরিত্র বিশ্লেষণের সুন্দর এক গল্প আছে। বাউলের এই দম ক্রিয়াটির সেখানে উল্লেখ আছে ‘দ’ এর প্রতীককল্পে। গল্পটি এরকম–প্রজাপতি ব্রহ্মার কাছে একবার দেবতা, মানুষ, অসুরেরা এসে বললেন, আপনি কিছু আমাদের নির্দেশ দেন। যা আমাদের কাজে লাগবে।
ব্রহ্মা দেবতা, মানুষ, অসুর–সবাইকেই বললেন কেবল ‘দ। বলে বললেন, কিছু বুঝলে তোমরা?
সকলেই ঘাড় নাড়লেন।
ব্রহ্মা প্রথমে দেবতাদের বললেন, কী বুঝেছ তোমরা সাংকেতিক এই ‘দ’ এর দ্বারা।
দেবতারা বললেন, আপনি ‘দ’ এর মাধ্যমে আমাদেরকে দমের কথা বোঝাতে চাইছেন।
তিনি বললেন, হ্যাঁ। তোমরা সব ঠিকই বুঝেছ।
দম হল এখানে বাউলের ‘বায়ু’র দ্যোতক নয়। দম হল সংযম। দেবতাদের যা একেবারেই ছিল না।
মানুষরা ‘দ’ এর মানে বুঝলেন দান। কারণ তাঁরা স্বভাবতই একটু লোভী প্রকৃতির। অসুরেরা ‘দ’ এর মানে বুঝলেন দয়া। যা তাঁদের একেবারেই ছিল না। যেটা এখানে বলতে চাইছি তা হল, প্রতীককল্পকেই দেহসাধনা বার বার চিহ্নিত করে। এই চিহ্ন মনের গ্রথিত পাণ্ডুলিপিকেই যেন ছেপে বের করা। মন তাঁর চিন্তাকে, ভাবনাকে, উপলব্ধিকে, বিশ্বাসকে যোগক্রিয়ায় ছেপে বের করে দিচ্ছে। এই ক্রিয়াকে সব সময়ই নিয়ন্ত্রণ করে রাখছে বায়ু খ্যাপা উনপঞ্চাশ বায়ুর কথা বলেছেন। এই বায়ুগুলো আমাদের শরীরের ভেতরই বিরাজমান। উনপঞ্চাশ বায়ুর মধ্যে প্রাণ, অপান, সমান, ব্যান ও উদান, এই পাঁচ বায়ুই প্রধান। এই পাঁচটির মধ্যে আবার প্রাণ ও অপান এই দুই বায়ু প্রধান প্রাণ বায়ুতে শ্বাসক্রিয়া হয় ইড়া নাড়িতে। এই নাড়ি জ্ব-মধ্যে আজ্ঞাচক্রের বাঁ দিকে আসে মূলাধার থেকে। এসে সে মেরুদণ্ডকে জড়িয়ে ধরে। অপান বায়ুতে শ্বাসক্রিয়া হয় পিঙ্গলা নাড়িতে। পিঙ্গলা মূলাধারচক্রের বাঁ দিকে কিন্তু উধ্বমুখ বজায় রেখে আজ্ঞাচক্রকে ডান দিকে রাখে। শ্বাস যখন নেওয়া হয় অপান বায়ু প্রাণ বায়ুকে টেনে নীচের দিকে নামায়। শ্বাস যখন ছাড়া হয় তখন প্রাণবায়ু অপান বায়ুকে উপরের দিকে টেনে তোলে। এতেই সাধকের উধ্বযোগ রপ্ত হয় ভালো করে। উনপঞ্চাশ বায়ুর ভেতর এই প্রধান বায়ুদ্বয়ই সাধনক্রিয়ায় সাহায্য করে থাকে বেশিমাত্রায়।
‘সপ্ততালা’কে সাত ধাতুর সমষ্টি হিসাবে দেখেন বাউল। শরীরের সাতটি উপাদান মিশিয়ে এই সাতটি স্তর। কিন্তু আমার মনে হয় ‘সপ্ততালা’কে আজ্ঞাচক্রের উপরিভাগ হিসাবে দেখা ভালো। ছটি চক্র পেরিয়ে শক্তি উপরে উঠে যাচ্ছে সপ্ততালাতে। যেটা লালন চক্র। এখানে চৌষট্টিদল বিশিষ্ট পদ্ম আছে। বৃত্তি আছে বারোটা। শ্রদ্ধা, সন্তোষ, স্নেহ, দম, মান, অপরাধ, শোক, খেদ, অরতি, সন্ত্রম, উৰ্ম্মি ও ঔদ্ধতা। এরপরই শক্তি গুরুচক্র ছুঁয়ে সহস্রারে প্রবেশ করে। যেখানে গেলেই সাধকের নির্বাণপ্রাপ্তি, চিন্তামনি দর্শন, এই সব হয়। তাই আজ্ঞাচক্রের উপরে শক্তি ওঠা মানেই সপ্ততালায় প্রবেশ করা। নটা চক্রকে যদি শরীরের নটা ধাপ হিসাবে দেখি। আর সেটাই তো দেখা উচিত অন্তত বাউল সাধনে। শরীর তো সেখানে ঘরবাড়ির নামান্তর। হাসন রাজার একখানা গান আছে–’লোকে বলে বলে রে ঘরবাড়ি ভালো না আমার/ কী ঘর বান্ধিমু আমি শূন্যেরই মাঝার।‘ হাসনের এই বেদনাময় উপলব্ধি ধরেই বলি, খোদা এ ঘর বানিয়েছেন ঠিকই কিন্তু এ ঘরের তদারকি গুরু দেখানো পদ্ধতিতে ঠিকমতো না হলে তা সেই ‘ঘরবাড়ী ভালো না আমার’ই হবে। সাধকের কাছে এই অকৃতকার্যতা অনুতাপের। তাই তো বাউলের নানা গানে, আলোচিত খ্যাপার গানেও ‘ঘরবাড়ি ভালা’ রাখার নির্দেশিকা তৈরি করে দিয়েছেন সিদ্ধ বাউল। শিষ্যদের মঙ্গলের জন্যই তাঁদের এ সমস্ত করা।
