কুণ্ডলিনী যখন মূলাধার ত্যাগ করে তখন যে প্রাণপ্রবাহ উপরের দিকে উঠে আসে তাঁর ধাক্কাতেই স্বাধিষ্ঠানের পাপড়ি ঘেঁড়ে। ফলে এর মুখও খুলে যায়। যা খুলে গেলে এখানকার শক্তিরূপের দেবদেবী বিষ্ণু, লক্ষ্মী, সরস্বতী, রাকিনী, মাতৃকা এবং বৃত্তি সব কুণ্ডলিনীর সঙ্গে মিশে ভয়াবহ ভাবে ডুবে যায়। পৃথ্বীরূপী লং বীজ তখন জলতত্ত্বকে ধারণ করে বসে। হয় অপ, রং বীজ। মণিপুরের অগ্নিবীজ বায়ুবীজে মেশে। এখানে বিষ্ণুর রূপকল্পনা থাকে। বায়ু বীজ যং বীজে রূপান্তরিত হয়। অনাহত পার হয়ে উঠে আসে আজ্ঞাচক্রে। এই চক্র থেকেই শক্তি আরও উপরে উঠে প্রণব নাদ আরও সব সূক্ষ্মাতি সূক্ষ্ম। পর্যায়ে গিয়ে মেশে। তারপর থাকে কেবল পরম চৈতন্যের শক্তি। যে শক্তি শিবের সঙ্গে একাত্ম হয়ে যায় বলে থাকেন সাধক। শিব এখানে সর্বোচ্চ শক্তিতরঙ্গের প্রতীক। সাধকের জগদীশ্বরের সঙ্গে একাত্মতা। তাঁকে প্রাপ্তি। উপলব্ধি। আমরা বলব সাধক এখানে এসে এই চরম পন্থায় যে নির্বাণ লাভ করে থাকেন সেই জ্ঞান পরমাত্মা। অর্থাৎ কিনা আমিকে, আমার শক্তিকে সর্ববিধভাবেই চেনা। খ্যাপা যার জন্যই বলেছেন–’লক্ষ যোজন যাও না। কেঁদে।‘ এই কান্না সিদ্ধ স্তরে পৌঁছানোর জন্যই প্রচেষ্টার অশ্রুপাত। সে স্তরে নিজের চেতনাকেই উপলব্ধ করা যায়–’চেতনে চৈতন্য যিনি/ কুণ্ডলীতে আছেন তিনি।‘ ‘দ্বাদশ পবন’ কী? এই ‘দ্বাদশ পবন’ হল গিয়ে শরীরের মূল বারোটি শিরার মধ্যে রক্তের যে একমুখী প্রবাহ। এই রক্তপ্রবাহ হৃৎপিণ্ড থেকে নির্গত হয়ে চৌষট্টিটি ধমনী পার হয়ে তিনশত ষাট শিরার মধ্যে প্রবাহিত হয়ে উপশিরা ও স্নায়ুতে ছড়িয়ে যায়। যার জেরেই ‘পূর্ণচন্দ্র’ লাভ করা যায়। বাউলের ‘পূর্ণচন্দ্র’ হল গিয়ে প্রেম প্রেম এখানে সিদ্ধতা। সঙ্গিনীর শরীর ভ্রমণ করে, সেই শরীরকে নিগূঢ় বোধিচর্চা দিয়ে নিজের সর্বাত্মক ধাঁচটি বজায় রাখা। তাঁর জন্যই খ্যাপা গাইছেন–’দ্বাদশ পবন বইছে সদাই/ (ক্ষ্যাপা) পূর্ণচন্দ্র প্রতিপদে।‘ বাংলার দেহসাধনা এভাবেই দ্বৈততত্ত্বকে প্রকাশ করেছে গানে। খ্যাপা বাবার গানগুলোর মধ্যে আমরা তাঁরই প্রকাশ দেখতে পাচ্ছি বার বার।
আমার ঘরের বাঁধন আঁটা,
সাড়ে তিন কোটি গিরে রয়েছে।
কত শক্ত করে বেঁধেছে ঘর
কেউ গিরে তাঁর ঠিক দিয়েছে।
আমার ঘরের বাঁধন আঁটা
সাড়ে তিন কোটি গিরে রয়েছে।
(দেখ) সপ্ততালা এ ঘরখানি
নয় দরজা-তায় রেখেছে
মাপে কিন্তু চৌদ্দ পোয়া
তিন জনার এ ঘর গড়েছে।
আমার ঘরের বাঁধন-আঁটা
সাড়ে তিন কোটি গিরে রয়েছে।।
এ ঘরে কি মজার সন্ধি
জলআগুনে–করেছে বন্দি।
বইছে উনপঞ্চাশ পবন,
জীবেরে ধরে রেখেছে
আমার ঘরের বাঁধন আঁটা
সাড়ে তিন কোটি গিরে রয়েছে।।
ঘরে পঞ্চভূত আর ষড়রিপু
তায় এগার জন বসেছে
তাঁরা হাসায় কাঁদায় নাচায় গাওয়ায়
সুফল কুফল দুই রয়েছে।
আমার ঘরের বাঁধন আঁটা
সাড়ে তিন কোটি গিরে রয়েছে।।
(এ) ঘরে সুমতি কুমতি দুজন।
দিবারাতি বাস করেছে
তাঁরা ইচ্ছা জ্ঞানে ভাঙে গড়ে (ঘর)
ক্ষ্যাপা পূর্ণানন্দে প্রাণ সঁপেছে।
আমার ঘরের বাঁধন আঁটা
সাড়ে তিন কোটি গিরে রয়েছে।
কত শক্ত করে বেঁধেছে ঘর,
কেউ কিরে তাঁর ঠিক দিয়েছে।।
খ্যাপার আশ্রমেই রাখাল দাস বাউলের মুখে শুনেছিলাম এ গান। সন্ধ্যার ক্রিয়াকর্মের পরে গান ধরেছিলেন রাখাল দাস। বেদনাশা বটের প্রদীপ তখন অজয়ের হাওয়ায় এদিক-ওদিক করে কাঁপছে। এরই মধ্যে রাখাল দাস গান ধরেছেন। একতারাতে সুর উঠেছে। আমার শরীরেও হাওয়া এসে লাগছে অজয়ের। গৌরীবাবু এই আশ্রম থেকেই দীক্ষিত। তিনিও ছিলেন সেদিন পাশে। আমি ধরে দাঁড়িয়ে আছি গৌরীবাবুর ছেলে সুজীবকেই। ও আমার বন্ধু। ক্ষীণ দৃষ্টিশক্তির সুজীব। সন্ধ্যেবেলাতে একেবারেই দেখতে পায় না ও। আস্তে আস্তে ওর চোখের সব নাড়িগুলোই শুকিয়ে যাচ্ছে। আমিই ওকে ধরে আশ্রম থেকে বেদনাশা বটের কাছে নিয়ে এসেছি। পাঁচিলের ধার ঘেঁষে আমরা দাঁড়িয়ে। গরমের ক্লান্তি অনেকখানি দূর করে দিচ্ছে অজয়ের হাওয়া। ফাঁকা নির্জন চারপাশ। সংক্রান্তির ভিড় এ সময় এলে কল্পনা করা যাবে না। আমি ভাবছি সুজীব তো এখন কিছুই দেখতে পাচ্ছে না। ও কি রাখাল দাসের কথা অনুযায়ী নিজের ঘরের বাঁধনখানা দেখতে পাচ্ছে? এ বাঁধন আমাদের কাছে তো একেবারেই অনুভবের বাঁধন। সাধক বাউলের কাছে। ক্রিয়াকরণের উদ্দেশ্যে পথ নির্দেশিকার বাঁধন। শরীরকে জানা, বোঝার বাঁধন। গিঁট খুলে স্থূল শরীরকে প্রবর্ত, সাধক, সিদ্ধ স্তরে নিয়ে যাওয়ার বাঁধন।
‘ঘর’ এখানে শরীর। ‘গিরে’ হল গিঁট। ‘সাড়ে তিন কোটি’ গিরে শরীরের মধ্যেকার সাড়ে তিন কোটি নাড়ি। যেগুলো সব শরীরকে বেঁধে রেখেছে। তাঁর জন্যই খ্যাপা বলছেন ‘আমার ঘরের বাঁধন আঁটা/ সাড়ে তিন কোটি গিরে রয়েছে।।’ ‘সার্ধলক্ষত্ৰয়ং নাড্যঃ সন্তি দেহান্তরে না।‘ লক্ষ নাড়ি দেহের অভ্যন্তরে রয়েছে। যা হল বাউলের ঘর। ঘরের সপ্ততালা শরীরের সাত ধাতুর একেকটি মৌল। যাকে তালা বা পর্যায় হিসাবে। দেখাচ্ছেন খ্যাপা। মৌলগুলোর কথা আমরা আগেও বলেছি। ‘নয় দরজা’ নখানা দরজা। সে সম্পর্কেও বলা রয়েছে আগে। ‘চৌদ্দ পোয়া’র পরিমাণ চৌদ্দটি গুরুত্বপূর্ণ সেই নাড়ি। ‘তিন জনার এ ঘর’–চোদ্দ নাড়ির মধ্যে প্রধানা তিন নাড়ি। ঘরের সন্ধি ‘জল আগুনে’র সন্ধি। ‘জল’ এখানে রজ। ‘অগ্নি’কে তেজ না ধরে বীর্যস্বরূপ হিসাবে দেখছি। উনপঞ্চাশ’ বায়ুর বিষয়ে আসছি। আগে বলি, শাস্ত্র সাড়ে তিন লক্ষ নাড়ির নির্দেশ দিচ্ছে। খ্যাপা সাড়ে তিন কোটি বলছেন কেন? বলছেন, এ কারণেই ঘরের সামগ্রিক ব্যাপ্তি দিতে চাইছেন তিনি। কোটি হল অঙ্কের হিসাবে শেষ নির্ধারক। তাই খ্যাপা কোটিতে এসে ঠেকেছেন। ‘চোদ্দ পোয়া’কে গোটা শরীরের পরিমাপও বলতে পারি।
