শরীরের তিনচক্রে আমাদের সাধকরা যে আটটি শক্তিমূর্তির কল্পনা করেন, সে কথাও সেদিন তাঁকে বলা গেল না।
ঘন্টা বাজা শুরু হয়েছে সবে। ভগবান বুদ্ধের সামনে সান্ধ্যজ্যোতি দপদপ করে জ্বলছে। বললেন, আমাদের অষ্টমার্গ হল–সৎ চিন্তা, সৎ বাক্য, সৎ প্রচেষ্টা, সৎ সংকল্প, সৎ ব্যবহার, সৎ জীবন, সম্যক দৃষ্টি, সম্যক সমাধি। এ তোমাদেরও নয় কি?
সেদিন আর কথা হল না। বৌদ্ধবিহারের ঘণ্টা বাজতে থাকল জোরে জোরে।
খ্যাপা বৈষ্ণব ভাবাপন্ন সাধক ছিলেন যেমন একাধারে, তেমনই তিনি তন্ত্রজ্ঞ পুরুষ ছিলেন। তাঁর গুরুর নির্দেশে তিনি ধরমপুরের ক্রোশজুড়ি সিদ্ধেশ্বরের মন্দিরে একমাস রাজযোগের ক্রিয়াকরণ করেছিলেন। এটিও একটি সহজি পন্থা। এই যোগ সংসারী লোকের পক্ষে করা খুবই কষ্টসাধ্য ব্যাপার। তাই কোনো বইতেও বিস্তারিত এই যোগের ক্রিয়াকর্মের আলোচনা নেই। খ্যাপা মনোহর এক ভক্তের অনুরোধে অবশ্য রাজযোগে নিজের উপলব্ধির কথা ‘রাজযোগ সাধনা’ বইতে লিপিবদ্ধ করে গেছেন। হিন্দু ও বৌদ্ধতন্ত্র-সাধনার সঙ্গে বাউল সাধনার কিছু মিলকরণ আছে। তান্ত্রিক বলেন কুণ্ডলিনী। বাউলও তাই বলেন। বৌদ্ধাচার্য আবার একে আহলাদিনীও বলে থাকেন। যে নামেই আমরা একে অভিহিত করি না কেন আসলে এ সবই হাওয়ার গতি। এই হাওয়া বাউলের শ্বাস। হাউড়ে গোঁসাই তা অনুধাবন করেই বোধহয় লিখেছিলেন–’মৃণাল হাওয়ার গতি, ত্রিগুণ ধারিণী শক্তি যথায় বসতি/ তারে জাগালে যোগনিদ্রা, সাধ্যধন বাধ্য হয়;/ তবে দ্বার পারাপার দম দামোদরে,/ উর্ধ্বেতে হইবে গতি দ্বিদল ‘পরে,/ তবে হবে দৃষ্ট প্রণব পুষ্ট, ঘুচবে কষ্ট তাই ভেবে।
আমাদের মণিপুর চক্র ও অনাহত চক্রে আটটি শক্তিমূর্তির কল্পনা করেন তন্ত্রসাধক। তন্ত্রের আটটি শক্তির কথা বলেছি। বাউলের অষ্টশক্তিও তাই তবে নামকরণে কিছু প্রভেদ আছে। তন্ত্রের অণিমা ও লঘিমা বাউল মতেও তাই। তবে বাকি ছটাতেও নামে পার্থক্য আছে একটিতে। ব্যাখ্যায় হেরফের আমরা সেরকম কিছু দেখি না। তন্ত্রের গরিমা বাউল মতে ব্যাপ্তি। ব্যাপার কিন্তু একই। গরিমার ইচ্ছামতো ভারী হবার সঙ্গে ব্যাপ্তির মিল আছে। তন্ত্রের আটটি মূর্তি হল–বাসিনী, কামেশ্বরী, মোদিনী, বিমলা, অরুণা, জয়িনী, সর্বশ্বরী, কালী বা কৌলিনী।
সাধক বলেন আটটি বিভিন্ন অক্ষরমণ্ডলের দেবী এরা। অ থেকে ঘ এই ষোলোটি অক্ষরের অধিষ্ঠাত্রী দেবী হলেন বাসিনী। পাঁচটি অক্ষরের অধিষ্ঠাত্রী দেবী কামেশ্বরী। পাঁচটি অক্ষর হল ক থেকে ঙ। আবার চ থেকে ঞ, এই পাঁচটি অক্ষরেরও অধিষ্ঠাত্রী দেবী মোদিনী। বিমলা (ট–ণ), অরুণা (ত–ন), জয়িনী (প–ম)। য থেকে ব, এই চার অক্ষরের অধিষ্ঠাত্রী হলেন সর্বেশ্বরী। শ থেকে ক্ষ, এই পাঁচ অক্ষরেরও অধিষ্ঠাত্রী হলেন কালী বা কৌলিনী।
খ্যাপা তন্ত্রসিদ্ধ হলেও যেহেতু এটা বাউল তত্ত্ব তাই অষ্টাঙ্গ ভেদকে তিনি বাউল মতেই চিহ্নিত করেছেন। তিনি বলেছেন ‘চতুর্দল মূলাধারে’। মূলাধারে এই চতুর্দল পদ্মের বর্ণ চারটে হল–ব, শ, ষ, স।
বাউলের রজঃবীজের উধ্বগতি হল সাধকের কুণ্ডলিনীর গতিকে স্থূল জগৎ থেকে ক্রমশ সূক্ষ্ম জগতের দিকে নিয়ে যাওয়া। বাউল ভাষায় একে ‘প্রবর্ত’ বলা যেতে পারে। এই স্তরেই বাউল ‘বায়ু’র কাজ শেখেন।
তন্ত্রসাধক বলেন কুণ্ডলিনীর ঊর্ধ্বগতিতে শরীরের ভিতরস্থ বিভিন্ন এলাকার চরিত্র অনুযায়ী সেই অঞ্চলের দেবতা ও বৃত্তিগুলো সব নষ্ট হয়ে যেতে থাকে। তাঁরা বলেন মূলাধারে ব্রহ্মা, সাবিত্রী, ডাকিনী, মাতৃকা–এইসব দেবদেবীর বসবাস। এগুলো সবই তাঁদের কাছে প্রতীককল্পের বৃত্তি। মূলাধারে দেবদেবী ও বৃত্তি কুণ্ডলিনীর ঊর্ধ্বগতির সঙ্গে সঙ্গে হারিয়ে যায় উধ্ব অঞ্চলে। একে নদীর সঙ্গে আমরা তুলনা টানতে পারি। নদী যেমন প্রবল জোয়ারে তাঁর মধ্যকার সমস্ত আবর্জনা সরিয়ে ফেলে; সেগুলো বুকের থেকে, নসীর শরীর থেকে হারিয়ে যায়। পাড়ে এসে পড়ে। সাধকের বৃত্তিও একই ভাবে নষ্ট হয়। মাতৃকা হল শরীরের মধ্যস্থ পৃথ্বী অঞ্চল। যার বীজ সাধক বলেন লং। একে আমরা শব্দশক্তি হিসাবে ধরতে পারি। এই লং হল চৈতন্যের সেই অবস্থা সে অবস্থাতে সাধকের চৈতন্য শব্দের আকারে প্রকাশ পায়। আমরা প্রায়শই বাকসিদ্ধ সাধুর কথা বলে থাকি। মূলাধার পদে ধ্যানে, জপে সাধকের সেই বাকসিদ্ধতা আসে।
মূলাধার দেহের সর্বনিম্ন চক্র বা পদ্ম। কিন্তু বাউল সাধক মূলাধারকে স্বাধিষ্ঠান চক্র বা পদ্ম বলেন। বিশ্বনাথ দাস বাউল আমাকে মূলাধার বলতে সেই স্বাধিষ্ঠানই বুঝিয়েছিলেন।
গান শেষে প্রায় ভোর ভোর সময়, যখন প্রভাতী গাইবেন এক বাউল গায়ক তখন তাঁকে একটু নিভৃতে পেয়ে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, মূলাধার কী?
বললেন, আমাদের শরীরের মধ্যকার সেই জননেন্দ্রিয়। ষড়দলের রূপ তাঁর। মুলাধারেই রজঃবীজ থাকে। বাউল রজঃবীজকে উপরে উঠিয়ে দিতে পারেন।
বুঝলাম চক্রের যে পদ্ম-কল্পনার প্রকাশ তাই-ই হল তাঁদের রজঃপ্রকাশ। রজকে তাঁরা ফুল বলেন। ‘যোনিপদ্ম’ তান্ত্রিকরাও বলেন। বাউল ‘রাধাপদ্ম’ বলেন। রাধাপদ্মতেই তো রজঃবীজের প্রকোপ না ঘটানো–এটাই তো তাঁদের মূল সাধনা। সংস্কৃত শাস্ত্রে রজের আভিধানিক মানে হল ফুল।
খ্যাপাও বাউল মতো মেনেই মূলাধারকেই স্বাধিষ্ঠান বলেছেন। তাঁর প্রমাণ রয়েছে গানেই–’চতুর্দল মূলাধারে/ মণিপুর তাঁর উপরে।‘ তাহলে দাঁড়াল মূলাধারের পরই মণিপুর। তা যদি হয়, তাহলে স্পষ্ট স্বাধিষ্ঠানই এখানে মূলাধার। নয় কি? তবে তাঁর দল তিনি চতুর্দলই করেছেন। মনে হয় যেটা তিনি তন্ত্রসিদ্ধ বলেই দলকে আর বদলাতে চাননি।
