জয়দেবের মেলাতে খ্যাপা বাবার আখড়ায় বেশ রাতের দিকেই গাইতে ওঠেন। বিশ্বনাথ দাস। এ-আখড়া ও-আখড়া ঘুরে তিনি এখানে আসেন। এসে বেদনাশা বটমূলে আগে প্রণাম সারেন। তারপর আসরে এসে বসেন। বার দুই এ দৃশ্য আমি দেখেছি। বিশ্বনাথ নামকরা বাউল সনাতন দাসের পুত্র। নিজেও যথেষ্ট নামকরা বাউল সমাজে। বার দুই বিদেশে গেছেন গানের সুবাদে। বিশ্বনাথ নিজেও পদ রচনা করেন। তাঁর পিতা সনাতন দাসকে দেখবার সৌভাগ্য আমার হয়নি। বিশ্বনাথের মুখেই শুনেছিলাম ওঁর কথা। তিনি অনেক পদ রচনা করেছেন। সে পদের বেশ কিছু শুনবার সৌভাগ্য আছে আমার। তবে তিনি যে বাউলতত্ত্ব বিষয়ে দু’দুইখানি বই রচনা করেছিলেন এ তথ্য আমি জানতাম না। বিশ্বনাথই আমাকে বলেছিলেন। সনাতন দাসের মন্ত্রদীক্ষা নাকি খ্যাপার কাছেই। সংঘের সভাপতি এ কথা একবার বলেছিলেন। বিশ্বনাথ দাসকে এ কথা আমার জিজ্ঞাসা করা হয়নি এবং তাঁর মন্ত্রদীক্ষা খ্যাপার আশ্রমে কিনা এও জানা হয়নি। বিশ্বনাথ দাসই আমাকে জানিয়েছিলেন তাঁর বাবার আকাদেমি পুরষ্কার প্রাপ্তির কথা। লালন পুরষ্কারও তিনি পেয়েছিলেন।
বিশ্বনাথের কণ্ঠে খ্যাপা বাবার যে গানটি একবার শুনেছিলাম সেটিও ছিল যথেষ্ট শ্রুত গান। অনেক বাউলরাই এই গানখানি গেয়ে থাকেন। পূর্ণদাসের গানখানাও তাই। বাংলা ব্যান্ড ‘ভূমি’ পর্যন্ত খ্যাপার ‘কাঁচা হাঁড়িতে…’ গানখানা রেকর্ড করেছিল। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে এরা এই গানখানা গেয়ে থাকে। তা সে রাতে বিশ্বনাথের কণ্ঠে খ্যাপার গানখানা যেন মহোজ্জ্বল আলোকসম্পাত রচনা করেছিল। খুবই একাগ্র মনে গাইছিলেন তিনি। অঙ্গীভূত হয়ে গিয়েছিলেন যেন গানখানির প্রকৌশলে। দেহের আশ্চর্য সব অলব্ধ চারপাশ যেন তিনি কণ্ঠের অভিঘাতেই সামনে আনছিলেন। গাইছিলেন–
ইড়া পিঙ্গলার মাঝে,
সুষুম্না এক নাড়ী আছে,
সহজ সরল তাঁরই কাছে
সপ্তাঙ্গ অষ্টাঙ্গ ভেদে।
ইড়া পিঙ্গলার মাঝে।
চতুর্দল মূলাধারে
মণিপুর তার উপরে,
অনাহত বিশুদ্ধ পারে;
লক্ষ যোজন যাও না কেঁদে।
ইড়া পিঙ্গলার মাঝে।।
চেতনে চৈতন্য যিনি,
কুণ্ডলীতে আছেন তিনি,
দ্বাদশ পবন বইছে সদাই;
(ক্ষ্যাপা) পূর্ণচন্দ্র প্রতিপদে।
ইড়া পিঙ্গলার মাঝে।।
দেহাত্মবাদী কায়া সাধনার মূল কথা হল শ্বাস আর দমের কাজ। যে শ্বাসপ্রশ্বাসে আমরা সাধারণ মানুষেরা জীবনধারণ করি, সেই শ্বাসপ্রশ্বাসকেই কাজে লাগিয়ে তাঁরা যৌন জীবনযাপনে বিশেষ প্রক্রিয়া গ্রহণ করে থাকেন, যে প্রক্রিয়ায় বীর্য-রজ একাকার হবে না কোনো সময়। সন্তান আসবে না। শ্বাসক্রিয়াই জন্মনিরোধক হিসাবে কাজ করবে। শ্বাসকে তাঁরা গুরু হিসাবে মানেন। বায়ু বা পবন বলতে তাঁরা শ্বাসক্রিয়াকে ধরেন। শ্বাস তাঁদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ উদ্দীপন-বিভাব। যার দ্বারা শরীরকেই নির্জনতম সাধনার স্থান তাঁরা করে নিতে পারেন। শরীর তাঁদের কাছে সাধনার পূর্ণাঙ্গ দলিল। ভবা পাগলার গানের মধ্যেই রয়েছে দেহের তামসিক উপকরণ–’দেহ অট্টালিকা অতি মনোরম/ তাহাতে বসতি করে একটুখানি দম। / সতর্ক থাকিও তুমি খুব হুঁশিয়ার/ রক্ষই ভক্ষক কিন্তু খবরদার খবরদার।
খ্যাপার এই গান যেন শরীরে আপাতবিক্ষিপ্ত অধ্যায়গুলোকে পরপর সাজিয়েই ধরা। তিনি বলছেন–’ইড়া পিঙ্গলার মাঝে/ সুষুম্না এক নাড়ী আছে।‘ সুষুম্না আমাদের দেহে অবস্থান করছে মূলাধার চক্র থেকে উৎপন্ন হয়ে নাভিমণ্ডলকে মাঝ বরাবর বিদীর্ণ করে একেবারে মস্তিষ্কের ব্রহ্মরন্ধ্রকে ছুঁয়ে। সুষুম্নার বাঁ দিকে রয়েছে ইড়া। পিঙ্গলা অবস্থান করছে ডানদিকে। সুতরাং ‘ইড়া পিঙ্গলার মাঝে সুষুম্না’র অবস্থান। খ্যাপা বলছেন–’সহজ সরল তাঁরই কাছে/ সপ্তাঙ্গ অষ্টাঙ্গ ভেদে।‘ ‘সপ্তাঙ্গ’ ‘অষ্টাঙ্গের’ প্রতীককলা কী? ‘সপ্তাঙ্গ’ শরীরের সাত ধাতু। অষ্টাঙ্গ হল অষ্টশক্তি। কী এই অষ্টশক্তি? এই অষ্টশক্তি হল অণিমা, মহিমা, লঘিমা, গরিমা, প্ৰাপতি, প্রকাশ্য, ইশিত্ব, বশিত্ব।
সাধক ধ্যানে অণুর মতো ক্ষুদ্র হবার ক্ষমতা অর্জন করেন তা হল অণিমা। ধ্যানযোগে তিনি বৃহৎ হবার ক্ষমতাও রাখেন যা মহিমা। ইচ্ছাকৃত হালকা হবার ক্ষমতা হল লঘিমা। ভারী হবার ক্ষমতা গরিমা। যা কিছু বা যা ইচ্ছা লাভ করার ক্ষমতা হল প্ৰাপতি। অনেক সাধক একে কামবসয়িতাও বলে থাকেন। ইচ্ছামতো যে কোনো জিনিস পাবার ক্ষমতা ইশিত্ব। আর ইচ্ছামত বশ করার ক্ষমতা হল গিয়ে বশিত্ব।
গৌতম বুদ্ধ আবার আকাক্ষা বিলোপের জন্য আটটি পথের সন্ধান দিয়েছিলেন। শালুয়া বৌদ্ধ বিহারের ভিক্ষু আমাকে বলেছিলেন, গৌতম বুদ্ধের এই আটটি পথের অভিধাকে তাঁরা বলে থাকেন অষ্টমার্গ।
জিজ্ঞাসা করেছিলাম, কী এই অষ্টমার্গ?
তিনি বললেন, ভগবান বুদ্ধ বুঝতে পেরেছিলেন সংসারে দুঃখ আছে। দুঃখের কারণও আছে। আর এই দুঃখের কারণ থেকে মুক্তি পাবার জন্য তিনি আটটি পথের কথা বলেছিলেন তাই-ই অষ্টমার্গ।
বললাম, তন্ত্রক্রিয়াতেও আটটি মার্গ আছে।
বললেন, দেহসাধনার আটটি মার্গ এটা নয়।
আমি আর তাই বাউল সাধনার ‘অষ্টভাবে’রও কথা তাঁকে বললাম না।
সবে সন্ধ্যা হয়েছে। উপাসনা শুরুর আগে তিনি বললেন, আজ আর নয়। তোমাকে অষ্টমার্গটি বলে ছেড়ে দিচ্ছি। আমার সময় হয়েছে।
