এই নটি দ্বার–শরীরের নটি ছিদ্র। দুই চোখ, দুটি কান, দুই নাক, মুখ, যোনি লিঙ্গ। তা যদি খোলে ‘ঘর’ কে কানাই বাউল কথিত ‘নারীদেহ’ হিসাবে কীভাবে মেনে নেব? যার জন্যই তাঁকে যুগল দেহের প্রেম সাধনার (কাম সাধনার? !) দীর্ঘসূত্রতা দিয়েছিলাম। তা কিন্তু গানের শেষ লাইনে একেবারেই স্পষ্ট–কৈরা কিশোরী রূপে, খ্যাপা করেরে রূপের সাধনা।
খ্যাপা বাবার গানে রূপের এই রণন ফিরে ফিরে দেখব আমরা। সাধন পর্যায়ে বাউলের গানকে তিন ভাগে অনায়াসে ভাগ করতে পারি আমরা। ‘ক্ষ্যাপা গীতামৃত’ যতই চারটি ভাগের আত্মপক্ষ তৈরি করে নিক না কেন। এই তিনটি ভাগ পদকর্তাদের আত্মতত্ত্ব বা সাধকের দেহতত্ত্ব, সঙ্গিনীর দেহতত্ত্ব বা পরতত্ত্ব আর পরম তত্ত্ব। খ্যাপার গানের চৈতন্যতত্ত্ব, রাধাকৃষ্ণতত্ত্ব, রসতত্ত্ব তাঁকে বৈষ্ণব ভাবিত সাধক হিসাবেই চিহ্নিত করে। তাঁর গুরুদেব শ্রী শ্রী সদানন্দ দাসী (শ্রীশ্রী বুড়াবাবা) তাঁকে ‘খ্যাপা বাবা’র আখ্যাটি দিয়েছিলেন। মানভূম জেলার সোনাথলীতে জন্মগ্রহণ করেছিলেন তিনি। তাঁর প্রতিষ্ঠিত সংঘই এখন ‘মনোহর সেবাশ্রম সংঘ’ নামে খ্যাত। খুব বেশীদিন যে তিনি দেহ রেখেছেন। তা নয়। ১৯৯৬ সালে তিনি দেহত্যাগ করেন। প্রথম জীবনে তিনি সংসারী ছিলেন। পরবর্তীতে সংসারের মায়া ত্যাগ করে সন্ন্যাসী হয়ে যান। শ্রী শ্রী রাধারানি দেবী (শ্রীশ্রীমা) ছিলেন তাঁরই মন্ত্রশিষ্যা। খ্যাপা বাবার মন্ত্রশিষ্য অনেকেই। মনোহর সেবাশ্রম সংঘের সভাপতি শ্রীরাধানাথ দাস ঠাকুর আমাকে যে নামগুলো দিয়েছিলেন তাঁদের মধ্যে অনেকেই নাম করা বাউল। সনাতন দাস, পূর্ণচন্দ্র দাস, বিশ্বনাথ দাস, বিশ্বনাথ দাস(সনাতন দাসের ছেলে), রাখালচন্দ্র দাস–এসব নামগুলো তিনিই আমাকে। জানিয়েছিলেন। খ্যাপার গান এই সব প্রতিষ্ঠিত বাউল গায়করা প্রায়শই গেয়ে থাকেন। কেঁদুলির মেলাতেই সরকারি বাউল মঞ্চে একবার পূর্ণচন্দ্রের কণ্ঠে শুনেছিলাম যে গান তা শ্রুত বাউল গান হিসাবে বিশেষ পরিচিত। পূর্ণচন্দ্র খ্যাপার কথা বলেই সেদিন গান শুরু করেছিলেন।
কাঁচা হাড়িতে রাখিতে নারিলি প্রেমজল (গো)
কাঁচাহাঁড়ি জলে দিলে তখনি যাইবে গলে
শেষে লাগবে গণ্ডগোল (গো)
রাখিতে নারিলি প্রেমজল।।
যদি হবি পাকা হাঁড়ি
চলে যাবি গুরুর বাড়ি,
প্রেমানলে দগ্ধ হবি।
রূপে করবে টলমল গো।
রাখিতে নারিলি প্রেমজল (গো)।।
সদানন্দ ভেবে আউল
এই কথা যে বুঝেছে সেইত বাউল,
ধান কুটিলে হবে চাউল
(ক্ষ্যাপা) তুষ কুটিলে কিবা ফল।
রাখিতে নারিলি প্রেমজল (গো)।।
এই গানে কথিত ‘কাঁচা হাঁড়ি’ হল আমাদেরই স্থূল দেহ। এই স্থূল দেহকে প্রবর্ত স্তরে নিয়ে যেতে হলেই গুরুর কাছে যেতে হয়। গুরু শিক্ষা দেন স্থূল স্তর থেকেই। স্থূলকে মোটা হিসাবে না দেখে অতীক্ষ্ণ বুদ্ধি বা অসূক্ষ্ম ইন্দ্রিয়গ্রাহ্যতার নামান্তর ধরলেই বোধহয়। ভালো। গুরু এই অতীক্ষ্ণ বুদ্ধি বা অসূক্ষ্ম ইন্দ্রিয়গ্রাহ্যতাকেই প্রবর্তস্তরে নিয়ে যেতে সাহায্য করেন। তাঁর জন্যই গানে গুরুর বাড়ি যেতে বলা হচ্ছে। ‘প্রেমজল’ নারীর বা সাধন সঙ্গিনীর রজঃস্রাব। সহজিয়া বলছেন ‘কাঁচাহাঁড়ি জলে দিলে তখনি যাইবে গলে/ শেষে লাগবে গণ্ডগোল (গো)।‘ এই ‘জল’ পুরুষ দ্যোতক বা পুরুষের কিংবা সাধকের বীর্যপাত। স্থূল দেহেই যদি বাউল সঙ্গিনীর সঙ্গে মিলিত হয়ে পরেন তাহলে তিনি বীর্যকে চূড়ান্ত মিলনের সময় উর্ধগতিতে উঠিয়ে নিতে পারবেন না। বীর্য ‘প্রেমজল’ এ মিশে যাবে। পথভ্রষ্ট হবেন সাধক। যাকে ‘গণ্ডগোল’ হিসাবে চিহ্নিত করেছেন সাধক খ্যাপা। তাঁর জন্যই গুরুর কাছে যাওয়া।
মজলিশপুরের প্রবীণ প্রাজ্ঞ বাউল শশাঙ্কশেখর দাস বৈরাগ্য আমাকে বলেছিলেন, জীবনে চার বার জন্ম হয়।
–কী রকম ভাবে? জিজ্ঞাসা করেছিলাম।
বলেছিলেন, প্রথম জন্ম মাতৃক্রোড়ে। পিতার বীর্য মাতার রজ নিয়ে। দ্বিতীয় জন্ম দেন দীক্ষাগুরু। মন্ত্রদীক্ষা হয় আমাদের। তৃতীয় জন্ম ক্রিয়াকরণের। গুরুর হাতে নিজেকে সমর্পণ করতে হয়। চতুর্থ জন্ম হয় ভেকে।
ভেক হল সিদ্ধি। প্রচলিত ভাষায় ভেক নেওয়া হল ছদ্মবেশ। যেমন বলা হয়–ছিল চোর, বদমাশ এখন সাধুর ভেক নিয়েছে। হতভম্ব হয়ে যাওয়াকেও ভেক বলা হয়। কিন্তু শশাঙ্ক দাস বৈরাগ্যের বলা ভেক হল বাউল সিদ্ধি সাধনার সর্বোচ্চ দশা।
‘পাকা হাঁড়ি’ হল বাউল কথিক ভেক। যার জন্য গুরুর কাছে যাওয়া। শিক্ষাপ্রণালী রপ্ত করা। সাধক হয়ে ওঠা। প্রেমানলে দগ্ধ হওয়া। প্রেমানল’ হল পুরুষ ও প্রকৃতির অচ্ছেদ্যতা। বাউল ভাষায় বললে, রজঃবীজ বা বীর্যকে উধ্বদিকে উল্টিয়ে দেওয়া। ‘উল্টোস্রোতে নৌকা বাওয়া’। এই বাহ্য অবস্থার রূপই ‘জেন্তে মরা’। অর্থাৎ কিনা সাধক ও সাধন সঙ্গিনী আত্মবিস্মৃত, চেতনাহীন হয়ে পড়বেন। দেহগত আকর্ষণ থাকবে না। তাঁদের। লালনের গানেই আছে তাঁর প্রকাশ–’জেন্তে-মরা প্রেম-সাধনা কি পারবি তোরা। যে প্রেমে কিশোর-কিশোরী হয়েছে হারা।।/ শোসায় শোষে না ছাড়ে বাণ, / ঘোর তুফানে বায় তরী উজান,/ ও তাঁর কাম-নদীতে চর পড়েছে/ প্রেম-নদীতে জল পোরা। এই অবস্থাই খ্যাপার গানে–’প্রেমানলে দগ্ধ হবি/রূপে করবে টলমল গো।‘ এই রূপ অরূপের প্রগাঢ় প্রস্বর যিনি বুঝেছেন তিনিই বাউল–’সদানন্দ ভেবে আউল / এই কথা যে বুঝেছে সেই তো বাউল।’ আউল হল গুহ্য সাধনার সম্প্রদায়। সহজিয়া কর্তাভজাও বলা যেতে পারে তাঁদের। অনেকে এঁদের বৈষ্ণব ভাবিত সম্প্রদায়ও বলে থাকেন। ‘সদানন্দ’ পদকর্তা নন। হৃদয়ের আনন্দধারা। রূপ বিকাশের মূর্ততা। ‘প্রেমানলে’ দগ্ধ। হওয়ার রূপ। এই রূপ প্রস্ফুটিত হবে ‘পাকা হাঁড়ি’ হলেই। না হলে তা কোনওভাবে সম্ভব। নয় একেবারে। তাঁর জন্যই বলেছেন খ্যাপা ধান কুটলে, খোসা ছাড়ালে চাল পাওয়া যাবে। ‘ধান’ এখানে ‘পাকা হাঁড়ি’র দ্যোতক। ‘চাল’ ‘প্রেমানলের’। ‘তুষ’ হল ‘কাঁচা হাঁড়ি’। যা ছাড়ালে শূলতার বিপর্যয়ই থাকবে জীবনে। তা ভেঙে প্রবর্ত, সাধক, সিদ্ধ স্তরে কখনও আর ওঠা হবে না–’ধান কুটিলে হবে চাউল / (ক্ষ্যাপা) তুষ কুটিলে কিবা ফল। ফল’ এখানে অসিদ্ধতার প্রকাশ। বাউল সাধক সেই উচ্চমার্গে স্বচিহ্নিত শিল্পবস্তুর কথাই বলেছেন। এই বস্তুকে পিতৃবস্তু শুধু বলছি না। বলছি সাধকের গুরুর শিষ্যর প্রতি বেদবাণী। খ্যাপা গানে রূপকে, প্রতীকে তাঁরই ইঙ্গিত দিয়েছেন। এই ইঙ্গিতের অনাশ্রয়ী দুর্গ ভাঙতে পারলে অসাধারণ অভূতপূর্ব প্রতীকী ভাষার বা পারিভাষিক শব্দসূত্রের পরিণত এক বিস্তীর্ন। অধ্যায় দিতে পারেন। যার সংরক্ষণ, রসাস্বাদন প্রতিবন্ধকতা ভেঙে এগোলে তবেই সম্ভব।
