বাউল ‘কাম’কে ‘অমাবস্যা’ বলে থাকেন। রজঃপ্রবৃত্তির সময়কেই তাঁরা ‘অমাবস্যা’ হিসাবে ধরে থাকেন। ইন্দ্রিয়গুলোকে নিষ্ক্রিয় করে নিচ্ছেন সাধক। যুগল সাধনায় কামেন্দ্রিয় অবশ হয়ে গিয়ে প্রেমে রূপান্তরিত হয়ে যাচ্ছে। সাধক বাউল হয়ে। উঠেছেন ‘জেন্তে মরা’। আর তা তিনি হচ্ছেন অমাবস্যাতেই। মাহেন্দ্ৰযোগে। বাউল কথিত ‘মহাযোগে’ এই প্রেম সাধনা চলছে। এই সাধনার আলোকরশ্মি রসিকই কেবল নিতে জানেন। ‘রসিক’ হলেন সাধক বাউল। আর এই রসের চাঁদ গৌরে বলেই ডাকা যায়। সম্বোধন করা যায়। এই ডাক আত্মার জাগৃতি। বাউলের বস্তুরূপী ‘আত্মা’কে সাধক বাউল অমাবস্যাতেই ঊর্ধ্বগতি প্রদান করেন। সিদ্ধরূপে বিচরণ করে তিনি গদাধরের চরণ জড়াতে পারেন। ‘গদাধর’ হলেন গুরুর দ্যোতক। গুরুই তাঁকে সিদ্ধাসনে বসিয়ে দেন। তাই সাধক বাউল গদাধররূপী গুরুর পদযুগল জড়িয়ে ধরেন। এই প্রেম সাধনায় সাধক রসিক হতে পারেন। ‘রসিক’ এখানে সিদ্ধতা। সাধারণ স্তর থেকে উপরে ওঠা। আর প্রেম সাধনা ছেড়ে দিলে তিনি জেঠা খুড়ার নামান্তর। ‘জেঠা খুড়া’ হলেন অতি সাধারণজন। সাধনমার্গ থেকে দূরে থাকা লোক। এভাবেই এই গান আমাদেরকে প্রতীকদ্যোতক এক শিল্পভঙ্গির মধ্যে ফেলে দিচ্ছে। যে প্রতীকের আকস্মিক অভিঘাতগুলো আমরা ছুঁয়ে ধরে দেখতে চাইছি। গৌণ ধর্ম-সম্প্রদায়ের ভাষাকে কাব্যের অভিক্ষেপে দেখে নিতে চাইছি বারবার। কারণ তাঁর প্রতীক-প্রতিমা-রূপকে শিল্পরূপের নিরীক্ষণ কর্তাটি সব সময় দাঁড়িয়ে আছে। যাকে আমরা প্রান্তিক কারুকলার মধ্যে কখনও রেখে দিতে পারি না। তেমনই এক গান। কানাই বাউলের মুখে শুনেছিলাম সেই ছিন্নমস্তার আশ্রমে।
এ কোন কারিকর,গড়লে এ ঘর, একটা রূপের নিশান
নয় দরজা ষোলতালা, দ্বাদশে বাতি ঘোষণা।।
সপ্ত তালায়, সপ্ত সিন্ধু, ষড়দলে দীনবন্ধু,
শতদলে প্রাণগোবিন্দ, দ্বিদলে রূপ সাধনা।।
এক ধারায় নয় তিন ধারানন, তিনগুণে তার তিন সাধনা,
ওই নব রসে রসিক বসে, স্বরূপ নিয়ে করে রূপ ঘোষণা।।
আর কেউ বা শুনে, কেউ বা দেখে, কেউ করে ভাই প্রবঞ্চনা।
কেউ দেখে শুনে চুপটি করে, করে নিত্যলীলার রটনা।।
জরা মৃত্যুর নয় সে অধীন, প্রতি নব নব জানা,
কৈশরা কিশোরী রূপে, ক্ষ্যাপা করেরে রূপের সাধনা।।
কানাই বাউল কথকতার ঢঙ্গে এ গানের ব্যাখ্যা করছিলেন সে আসরে। সেই ব্যাখ্যার সঙ্গে নিজস্ব চিন্তাধারাকে মিলিয়ে এ গানকে বুঝবার চেষ্টা করব আমরা। ঘর এখানে দেহভাণ্ড। বাউল বলেছিলেন, দেহবাড়ি, নারীদেহবাড়ি। আমরা বলব প্রবোধের বেড়া। যা ভাঙতে চাইছেন সাধক। ঘরের নয় দরজা হল শরীরে নয়টি প্রত্যঙ্গ। বাউল সাধক একে ‘নবদ্বার’ও বলে থাকেন। এই প্রত্যঙ্গগুলো হল দুই কান, দুই চোখ, দুই নাক, মুখবিবর, পায়ু ও উপস্থ। উপস্থ বললে সঠিক পরিষ্কার হল না। বলি জননেন্দ্রিয়, লিঙ্গ। যোনি। ‘ষোলতালা’ হল মোলটি আধার। যে আধারে লয়যোগ সাধন হয়। একে যোগী যাজ্ঞবল্ক বলেছেন ‘ষোড়শাধারং’। ‘পাদাঙ্গুষ্ঠী চ গুলফৌ চ / পায়ুমূলং তথা পশ্চাৎ দেহমধ্যঞ্চ মেট্ৰকং।।/ নাভিশ্চ হৃদয়ং গার্গি কণ্ঠকূপস্তথৈব চ। / তালুমূলঞ্চ নাসায়া মূলং চাক্ষুশ্চ মণ্ডলে। / ভ্ৰবোৰ্মধ্যং ললাটঞ্চ মূর্ধা চ মুনিপুঙ্গবে।’ অর্থাৎ ডান পায়ের আঙুল (দক্ষিণ পদাঙ্গুষ্ঠ), গোড়ালি (পাদগুল), গোপনীয় বা অপ্রকাশ্য অংশ (গুহ্যদেশ), পুংজননেন্দ্রিয় বা শিশ্ন (লিঙ্গমূল), নাভির গর্ত বা কুণ্ড (নাভিমণ্ডল), মন (হৃদয়), কণ্ঠনালীর নিচস্থ গর্ত (কণ্ঠকূপ), জিভের অগ্রভাগ (জিহ্বাগ্র), দন্তপংক্তি বা দাঁতের পাটি (দন্তাধার), টাকরা (তালুমূল), নাক বা নাকের ফুটো (নাসাগ্রভাগ), দুই ভুরুর মধ্যবর্তী স্থান বা অংশভাগ (ভ্রমধ্য), চোখ বা চোখের অংশভাগ (নেত্ৰাধার), কপাল (ললাট), মাথা বা মস্তক (মূর্ধ্বা), শিরোমধ্যস্থ বা মাথার ভেতরে অধোমুখের সহস্রদল পদ্ম(সহস্রার)। এই ষোলটি স্থানের ক্রিয়াবিশেষ অনুষ্ঠানে লয়যোগ হয়, লয়যোগ হল আমাদের মনকে যে কোনো পদার্থের উপর একত্র করে একতানে বেঁধে ফেলা। ‘দ্বাদশ বাতি’ হল শরীরের। মধ্যে অবস্থিত অনাহতচক্র। এর বারোটি পাপড়ি থাকে। এই দ্বাদশ দল হল–ক, খ, গ, ঘ, ঙ, চ, ছ, জ, ঝ, ঞ, ট, ঠ। এগুলো সবই মাতৃকাবর্ণাত্মক। মায়ের ভাষা। আমাদের। বর্ণমালা। মাতৃকা হল শক্তিস্বরূপিণী। সেই আধারেও রাখতে পারি এই বারোটি পাপড়িকে। এর রঙ সিঁদুর বর্ণের। এর প্রত্যেক দলে একেকটি বৃত্তি রয়েছে আমাদের। এগুলো হল–আশা, চিন্তা, চেষ্টা, মমতা, দম্ভ, বিকলতা, বিবেক, অহংকার, লোলতা, কপটতা, বিতর্ক ও অনুতাপ। এই অনাহত চক্রে বা পদ্মের মধ্যে অরুণবর্ণের সূর্যমণ্ডল ও ধূম্রবর্ণের বায়ুমণ্ডল আছে। এই পদ্মে সাধক ধ্যানে বসলে অণিমাদি লাভ করেন। অনিমিত্ত ঘটনারাশি তাঁর চোখের সামনে ভাসে।
তাহলে আমরা বুঝতে পারছি এ গানে পদকর্তা নারীদেহের ভেতরকার সৌন্দর্যের জাগৃতি দিয়েছেন। তবে যেটা মনে হয় ‘ঘর’কে কানাই বাউল নারী দ্যোতকের রূপ দিলেও ভঙ্গির প্রতিচ্ছায়াতে এ গানের বর্ণিত ‘ঘর’ যুগল দেহের। যুগল সাধনার ব্রহ্মাণ্ড। খ্যাপা বলেছেন ‘সপ্ত তালায়, সপ্ত সিন্ধু’–’সপ্ততালার কথা আমরা এর আগেও খ্যাপার গান প্রসঙ্গে বলেছি। তবু প্রসঙ্গত এখানে আবারও বলি। আমাদের শরীরের বীর্য, রক্ত, মজ্জা, মেদ, মাংস, হাড়, চামড়া–এই সাতটি পদার্থকে ‘সপ্ততালা’ হিসাবে চিহ্নিত করেছেন সাধক। তারপরই বলেছেন ‘ষড়দলে দীনবন্ধু’–’ষড়দল’ হল ষড়রিপু। সেখানে ‘দীনবন্ধু’ রয়েছেন কীভাবে? যদি ভাবি ‘দীনবন্ধু’ সাধকেরই দীনতা খুব কি ভুল ভাবব আমরা? সেই দীনতা ‘ষড়দল’এ আটকে যাচ্ছে। ‘ষড়রিপু’কে পরিণামী মেজাজ দিতে চাইছেন তিনি। যার জন্যই ‘শতদলে প্রাণ গোবিন্দ’কে দেখতে পারছেন তিনি। ‘প্রাণগোবিন্দ’ হল সাধকের অপরিমেয়তা। তাঁরই দিব্যবানী শোনাতে চাইছেন তিনি পরবর্তী দু’লাইনে। ‘শতদল’ হল গিয়ে শরীরের গুরুচক্র। অষ্টম পদ্ম এটি। এই পদ্মের কর্ণিকাতে (বীজকোষে) ত্রিকোণমণ্ডল আছে। ত্রিকোণমণ্ডল তিনটি বর্ণ দ্বারা গঠিত। এই বর্ণগুলো হল–হল, ক্ষ। এই তিনটি শক্তিদ্যোতক। নটি চক্রেরই বিকাশ তো শক্তির অভিক্ষেপের জন্যই। যার জন্য একে শক্তিমণ্ডল বলে। অনেকে যোনিপীঠও বলে। যা প্রকৃতি দ্যোতক। নারীর জননাঙ্গ সৃষ্টির সন্নিবেশকেই প্রতীকী করে রাখে। সাধক বলেন তেজময় এই শক্তির মধ্যে কামকলা মূর্তি থাকে। সেই মূর্তিকেই তিনি দিব্য প্রেমের ইঙ্গিত দেন। গুরুপদ্ম বা চক্র শতদল পদ্মকে কেন বলা হচ্ছে? বলা হচ্ছে এই কারণেই, এই পদ্মেই। সাধক গুরুদেবের ধ্যানজপ করেন। এই ধ্যানে সাধক মনে করেন সর্বসিদ্ধি লাভ হয়। দিব্যজ্ঞান স্ফুটমান হয়। এই দিব্যতা লাভ করার উদ্দেশ্যেই সাধক ‘দ্বিদলে রূপ সাধনা’ করেন। দ্বিদল হল আজ্ঞাপদ্ম। দুটো দলের বর্ণ হ এবং ক্ষ। এই পদ্মের বীজকোষে যে ত্রিকোণমণ্ডল আছে তাতে তিনটি গুণ বর্তমান–সত্ত্ব, রজ, তম। সাধক বলেন ত্রিগুণান্বিত ব্রহ্মা, বিষ্ণু, মহেশ্বর। এই জন্যই খ্যাপা গানকে সেই দ্বিদ্বলের দ্যোতনা দিয়েছেন। তাঁকে একটু আগে আমরা ‘দিব্যবাণী’ হিসাবে চিহ্নিত করে নিয়েছি। এই দিব্যবাণী হল–’এক ধারায় নয় তিন ধারানন, তিনগুণে তার তিন সাধনা/ ওই নব রসে রসিক বসে, স্বরূপ নিয়ে করে রূপ ঘোষণা।‘ ‘নবরস’ নটা চক্রেরই দ্যোতক। বাউল একে ‘নববিধা ভক্তি’ বলেন। নববিধা ভক্তি হল অলংকার শাস্ত্রের নয়টি রস–শৃঙ্গার, হাস্য, বরুণ, রৌদ্র, বীর, ভয়ানক, বীভৎস, অদ্ভুত ও শান্ত। কানাই বাউল আমাকে বলেছিলেন, নবরসে শরীরের নটি দ্বার খোলে গো।
