পূজার্চনার সময় আমরা যে সমস্ত উপাচার ব্যবহার করে থাকি তা কিন্তু সবই পঞ্চভাবের সমাহার। বাউল একে ‘পঞ্চভূত’, ‘পঞ্চবাণ’ নানাভাবে ব্যবহার করে থাকেন। খ্যাপার গানেই আছে–’পরিপক্ক মুখমালা, ভাব বিভূতি ভোলা / আজ ভূবন মোহিনী পী ধায় গো। / ভাবেরি ঘরেতে রাই আঁখি পালটিয়া চায় / মারল মদন পঞ্চবান গো।‘ বা, ‘পাঁচটা ভুতের হাতে পড়ে মন/ লাগলো মস্ত গণ্ডগোল–/ জন ছয় রিপু আর ইচ্ছা জ্ঞানে / পাকায় যত হট্টগোল। / পঞ্চ ভূতের হাতে পড়ে মন / লাগালো মস্ত গণ্ডগোল।।‘
পঞ্চভূত আমরা জানি ক্ষিতি, অপ, তেজ, মরুৎ, ব্যোম। এই পাঁচ ভূতকে ‘ব্যোমপঞ্চকং’ হিসাবে চিহ্নিত করছে তন্ত্র। ‘আকাশন্তু মহাকাশং পরাকাশং পরাৎপরম। / তত্ত্বাকাশং সূৰ্য্যাকাশং আকাশং পঞ্চলক্ষণ।।‘ আকাশ, মহাকাশ, পরাকাশ, তত্ত্বাকাশ, সূৰ্য্যাকাশ–এই হল গিয়ে পঞ্চব্যোম। পৃথ্বী(ক্ষিতি), জল(অপ), অগ্নি(তেজ), বায়ু(মরুৎ), আকাশ(ব্যোম)–এই পঞ্চতত্ত্ব হল গিয়ে পঞ্চাকাশ। এই পঞ্চাকাশের বাসস্থান আমাদের শরীরের মধ্যে।
কোথায় কীভাবে রয়েছে এই পঞ্চাকাশ? শরীরের নীচের দিক থেকে উপরের দিকে আমাদের যে পাঁচটি চক্র আছে সেগুলো সবই পঞ্চভূতের উপাদান দ্বারা তৈরি। যেমন–মূলাধার চক্রে ক্ষিতির (পৃথ্বী) অবস্থান। স্বাধিষ্ঠান চক্রে রয়েছে অপ (জল)। মণিপুরে তেজ (অগ্নি)। অনাহত চক্রে মরুৎ (বায়ু)। বিশুদ্ধ চক্রে ব্যোমের (আকাশের) উপস্থিতি।
পূজায় দেবদেবীর উদ্দেশ্যে আমরা যে ফুল নিবেদন করি তা ব্যোম/ আকাশের প্রতীক। ধূপ মরুৎ / বায়ুর প্রতীক। প্রদীপ বা দীপ তেজ/ অগ্নির প্রতীক নিবেদিত নৈবেদ্য অপ/জলের প্রতীক। চন্দন, অগুরু ইত্যাদি সুগন্ধি যা লাগে পূজাকার্যে তা সবই ক্ষিতি/ পৃথিবীর প্রতীক।
তন্ত্রে যে পঞ্চ ‘ম’ কারের সাধনা তাও এই পাঁচটি তত্ত্বেরই প্রতীক। যেমন–মদ হল অগ্নি, মাংস বায়ু, মৎস্য জল, মুদ্রা পৃথ্বী, মৈথুন আকাশ। তবে ভিন্ন ভিন্ন সাধক প্রতীকাৰ্থের ভিন্ন ভিন্ন অর্থ করেছেন। করলেও এটুকু বলা যায় সবই ওই পাঁচটিকেই ইঙ্গিত করছে।
ক্যাথলিক খ্রিষ্টানরা বলেন তাঁরা যীশুর রক্তমাংস ভক্ষণ করেন। এর মানে কী? যে উৎসবে এটা করা হয় তার নাম ইউকারিষ্ট। এই উৎসবে রুটি মদ ইত্যাদি তাঁরা খান। রুটি হল মাংস, মদ রক্ত। এই রক্তমাংস। একবার নেতাজি বাজারের ছোট্ট চার্চে ফাদার পীটার গেমসের সঙ্গে কথা চলছিল। ব্যাপারটা বুঝিয়ে বলেছিলেন তিনি।
বললেন, যীশু কী?
বললাম, কী?
–তাঁর অবতারত্ব তো আসলে প্রতীকময়তাতেই ঢাকা।
–কী সেই প্রতীক? জিজ্ঞাসা করেছিলাম আমি।
ফাদার বললেন, যীশু মহাপ্রকৃতি। যার মধ্যে আমরা বেঁচে আছি।
আমি আশ্চর্য হয়ে গেলাম ফাদারের এই প্রতীকময়তার ব্যাখ্যা শুনে।
খ্যাপার গানে পঞ্চভূত আমরা বুঝে নিয়েছি। শরীরের পাঁচটি উপাদান আমরা পেয়ে গেছি যা দিয়ে ধ্যানে, যোগে, ভক্তিতে, বিশ্বাসে উপাসনা করতে হয়। বাউলের সেই উপাসনা শরীর মন্দিরেই চলে। সহজিয়া সাধক শরীরকে মন্দির বলে থাকেন। দেহকে তীর্থক্ষেত্র হিসাবে চিহ্নিত করেন তাঁরা। দেহ আসলেই এক প্রতীককল্পের মন্দির, মসজিদ, গীর্জা, গুরুদুয়ার–যা ভাবব তাই।
কীভাবে? ভাবনাকে ভাবে, কল্পনায় প্রসারিত করে নিতে হবে আমাদেরকে। ধ্যানস্থ অবস্থায় বসে যদি শরীরকে কল্পনা করি, ভাবি তবে আমাদের মস্তিষ্ক সেই মন্দির মসজিদ গীর্জা গুরুদুয়ার ইত্যাদির প্রতীক। ধ্যান যোগীরা সাধারণত পদ্মাসনে বসেই করে থাকেন। এই অবস্থাতে বসলে প্রসারিত হাতদুটি মন্দির-মসজিদের খিলান। ভাজস্থ পা দুখানি ভিত্তিভূমি। নাভি হল তাঁর প্রবেশদ্বার। প্রশস্ত বুক সেই অধিষ্ঠানের স্থান। যেখানে প্রতীকে, অনুভবে তিনি বিরাজমান।
এই একই কথা আমাকে সরাটির মৌলবী সাহেব বলেছিলেন। আমার বন্ধু বাবলু শেখের সঙ্গে আমি সেই গ্রামের মসজিদ দেখতে গিয়েছিলাম।
বললাম, দেখতে এলাম আপনাদের মসজিদ।
বললেন, আমাদের এখানে কিছুই দেখার নেই বাবা। সমস্তই তো তাই। তোমাদের ঈশ্বরকেও কি দেখা যায়? যায় না। প্রতীকময়তায় ভেবে নিতে হয়। তুমি যদি ভাবতে পারো তাহলে তোমার শরীরও মসজিদ।
–কীভাবে?
তিনি তখন আমার শরীরী গঠনকে মসজিদ বানিয়ে দিলেন। বললেন, তোমার শরীররূপী মসজিদেও পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পাঠ হচ্ছে। রোজা চলছে।
আমি অবাক হয়ে গেলাম। বলেন কী মৌলবী সাহেব! কীভাবে সেখানে রোজা চলছে, নামাজ পাঠ হচ্ছে? বুঝলাম তিনিও কোনো প্রতীকময়তায় এর ব্যাখ্যা সারবেন।
মৌলবী সাহেব বললেন, রোজা হল গিয়ে রোজকার কাজ। রুটিন। তা ঠিকঠাক পালনই তো ধর্ম। নামাজ হচ্ছে তোমাদের নামসংকীর্তন। আমি বেশ চমকিয়েই গেলাম গ্রামীণ এক মসজিদ প্রধানের এই কথায়, বিশ্বাসে, ভাবনায়, প্রতীকময়তায়।
খ্যাপার গানের ‘পঞ্চভাবে উপাসনা’ নিয়ে আমরা বিস্তর সব প্রতীককল্পের আলোচনা চালালাম। এবার ‘ছয় গোঁসাই’ এ আসি। বাউল ‘ছয়’ শব্দের মানে করেন ষড়রিপু বা ষটযন্ত্র। আসলেই তাই। এটা তো হল ইন্দ্রিয়ের নিয়ন্ত্রণ। কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ, মদ, মাৎসর্য–এই ছয়টি ইন্দ্রিয়ের ছলনা বা শত্রু হতে দূরে থাকতে হয় সাধককে। অনেক সাধক এগুলোকে তন্ত্রের পঞ্চ ‘ম’ কারের মৎস্য প্রতীকের মধ্যে রাখেন। তাঁরা বলেন অহংকার, দম্ভ, মদ, পৈশূন্য, হিংসা, মাৎসর্য–এই ছয়টি মৎস্যকে বৈরাগ্যজালে আবদ্ধ করে রাখলে সাধক সত্ত্বগুণের অধিকারী মানুষ হয়ে ওঠেন। গানে এই ছয়টি ইন্দ্রিয় প্রতীককেই শান্ত রাখতে বলা হচ্ছে। খ্যাপা বলেছেন–’ছয় গোঁসাই সদা শান্ত, করে পঞ্চভাবে উপাসনা/ কেউ বা হাসে, কেউ বা কাঁদে, কেউ হয়েছে জেন্তে মরা/ রূপ লাবণ্যে ভুবন আলো অমাবস্যার জ্যোতি জুড়া/ পেল তাই রসিক জনা প্রেম সাধনা, ছেড়ে দিলে জেঠা খুড়া।।‘
