বাবাজি আমায় বলেছিলেন, ভগবান, শ্রীকৃষ্ণ, লীলা করবার জন্যই দুটো হয়েছেন গো। তাই তো রাধাকৃষ্ণ লীলা। কৃষ্ণের অঙ্গ থেকেই রাধা বেরিয়েছেন।
–মানে আপনি বলতে চাইছেন আমাদের শরীরেরই দুটো রূপ।
–হ্যাঁ গো বাবা, ঠিক তাই।
আমার তখন মনে পড়ছে অর্ধনারীশ্বরের কথা।
বললেন, যা কিছু, যত কিছু তুমি দেখছ সবই পুরুষ প্রকৃতি যোগ।
বাউলও এ কথা বলে থাকেন। সনাতন খ্যাপাকে ঘোষপাড়ায় মেলায় ভক্ত শিষ্যদের বলতে শুনেছিলাম। ওকে ঘাটাসনি তোরা। ও যে স্বয়ং প্রকৃতি।
তন্ত্রসাধক খ্যাপা ব্রহ্মানন্দর সঙ্গে অনেকক্ষণ কথা চলার পর বলেছিলেন, প্রকৃতিরে কিছু জিজ্ঞাসা করবা না। প্রকৃতিরে আগে তুষ্ট কর। তিনি রুষ্ট হলি….
তখন দেখছি মানদা ভৈরবী স্থির হয়ে বসে জপে মগ্ন। ধ্যান ভাঙলে পর কথা প্রসঙ্গে বললেন,পুরুষের যোগে প্রকৃতি সব কাজ করছেন। দু’জনকে ছাড়া দু’জন অচল পয়সা। ফুটো কড়ি। শিবের উপর কালী কী?
–কী?
–পুরুষকে সংহার করছেন প্রকৃতি। প্রকৃতি জাগছেন। আওয়াজ তুলছেন।
আর রাধাকৃষ্ণ? জিজ্ঞাসা করলাম আমি।
ভৈরবী মা খ্যাপার দিকে একবার ফিরে বললেন, এ যে প্রেমে মজেছে গো। রাধাকৃষ্ণ হল গিয়ে সৃষ্টি-স্থিতি-প্রলয়। সংহার নেই। প্রেমের ঝাঁকুনি আছে কেবল। যা তোমার লেগেছে গো–বলেই হাসলেন ভৈরবী। তার হাসির বিকট শব্দে একাকার হয়ে গেল যেন সব–পুরুষ ও প্রকৃতি।
খ্যাপার গানে রয়েছে ‘এক বঁকে তিন ফুল ফুটেছে, লাল, নীল, পীত জরদ সাদা / এক ফুলে সুরসিক বসে, আর এক ফুলে রয় রাধা।‘ ফুল যে রজঃস্রাব তা এতক্ষণে আমরা বুঝে গেছি। ‘এক ফুলে সুরসিক বসে আছেন–সাধক মিলনে ব্যাপৃত আছেন। আর এক ফুলে রাধা’ আছেন–পরমা প্রকৃতি, সঙ্গিনী, রাধাস্বরূপিনী সেই নারী দেহ, যে দেহের রূপ-উপমায় সাধক বলছেন–’আর মরি কি ফুলের লীলা’। এই লীলারূপে অংশ নিচ্ছেন তো স্বয়ং সাধক। যার জন্যই ‘ফুলের মাঝে নন্দলালা’। যিনি ‘ভাঁড় ভেঙে ননী’ খাচ্ছেন আর বাঁশি বাজিয়ে বলছেন–’রাধা রাধা’ বাঁশি হল গিয়ে নারী দেহ। ‘ভাঁড়’ ভাঙা হল যোনির ভেতর প্রবেশ। সাধনলিঙ্গ যোনির মধ্যে অবস্থান করছে। সাধক। ‘ভাঁড় ভেঙে ননী’ খাচ্ছেন। ননী’ হল কামকে প্রেমরূপে আস্বাদন করে নেওয়া। রাধা এখানে রামকৃষ্ণদেবের সেই ‘কামরাধা’ থেকে ‘প্রেমরাধা’তে পরিণত হচ্ছেন। খ্যাপা বলছেন–’সে ফুল আছে থির পবনে, রসিকে তার সন্ধান জানে, / বায়ু বরুণ নাই যেখানে, ফুলেই খায় ফলের মাথা।।‘
ফল কী? ফল হল দেহপ্রকৃতির নিয়ম। যে নিয়মে সন্তান হয় কিন্তু এখানে ফল হল গিয়ে সাধকের অন্বিষ্ট সেই রজঃপ্রবাহ। যাকে বশে এনে সাধক সেই সিদ্ধ স্তরে যেতে চাইছেন। যে স্তরে যাওয়ার আকুতি গানেতেই ধরা আছে–’দীন ক্ষ্যাপা কয় ফুলের লাগি, কতজন হল বিরাগী, কেউ বা হ’ল দেশত্যাগী, কেউ পেল রে ফুলের সুধা।।‘
‘দেশত্যাগী’ হওয়ার অর্থ হল সাধন-ভজন ছেড়ে দেওয়া। কারণ গুরু নির্দেশিত শ্বাস আর দমের কাজে যে বীর্যকে উধ্বগতি কিছুতেই দিতে পারেনি। এক বঁকে বা নারীর যোনিতে রজঃবীজে তা মিশে গেছে। সেজন্যই অকৃতকার্য হয়ে ‘দেশত্যাগী’ হওয়া। আর যিনি রজঃস্রোতের ভেতর ‘উল্টা স্রোতে’ নৌকা বাইতে পেরেছেন, ‘জেন্তে মরা’ হয়ে যেতে পেরেছেন তিনি বা সেই সাধক দেহপ্রকৃতির সুধাকণা লাভ করতে পেরেছেন। আর তা লাভের জন্যই তো বিরাগী হওয়া। অর্থাৎ কিনা বৈরাগ্য নেওয়া। এ বৈরাগ্য হল গিয়ে সাধন বৈরাগ্য।
এই পদের সামনে আমরা যদি একটু সম্মোহিত হয়ে বসি, তবে দেখব তার ভাষা কীভাবে অমূর্ত এক বিহ্বলতা দিচ্ছে। সেই ভাষা-শব্দের শিল্পময় সিঁড়িটিতে দাঁড়ালেই দেখতে পারব অপ্রতিম এক আনন্দ গ্রাস করছে আমাদের, যে আনন্দ শব্দ সংগীতের দার্শনিক প্রস্থানবিন্দুকে সরিয়ে ফেলে প্রতীকী যৌক্তিকতার প্রকরণকে তৈরি করছে খালি। যার ভাষা-আনন্দ কবিতার সার্বভৌম কলাকেই মূর্ত রাখছে বারবার। তাঁরই সংবেদী অংশীদার হতে চাইছে। সেই দৃষ্টিকোণ থেকেই আভরণ ভেদ করতে চাইছি আমরা।
মন্ত্রগুরুর আখড়াতে তরুণ অচেনা বাউল আরেকটি গানও গেয়েছিলেন সেদিন। ততক্ষণে তিনি অবশ্য চেনা হয়ে উঠেছেন। সুরুলের নিবাসী তিনি। নাম রাজেন দাস। তার পরিবারের তিনকূলে কেউ গান গাননি। তিনি কীর্তন গাইতেন। এখন বাউলে মজে সেখানেই নাড়া বেঁধেছেন। তবে খ্যাপার আশ্রমে তার বাবাও দীক্ষিত। সেই সুবাদেই তিনি হয়তো দীক্ষা নিয়েছিলেন। রাজেন দাস গাইলেন–
অকৈতব গাছের লতা পাতায় পাতায় গৌর জুড়া,
গৌর গোবিন্দ রসে, যুগল হয়ে রইছে খাড়া।।
ছয় গোঁসাই সদা শান্ত, করে পঞ্চভাবে উপাসনা,
কেউ বা হাসে, কেউ বা কাঁদে, কেউ হয়েছে জেন্তে মরা,
রূপ লাবণ্যে ভুবন আলো অমাবস্যার জ্যোতি জুড়া,
পেল তাই রসিক জনা প্রেম সাধনা, ছেড়ে দিলে জেঠা খুড়া।।
দীন খ্যাপা তুই ঘুচাবে ভুল ছেড়ে দে ওই গোলক ধাঁধা,
ডাক্ নিত্য রসে চাঁদ গৌরে, গদাধরের চরণ জড়া।।
‘অকৈতব গাছের লতা’ হল গিয়ে সেই দেহপ্রকৃতি। তাতে পুরুষ এসে যুক্ত হয়েছেন বাউল মতের যুগলভাবে। যে ভাবে পুরুষ ‘গৌর গোবিন্দ’। অকৈতব গাছের। লতাপাতা সমস্তই যুগল হয়ে ‘খাড়া’ হয়ে রয়েছে। পুরুষ ও প্রকৃতি মিলিত হয়ে পড়েছেন। বাউল মতে সাধক ও সাধন সঙ্গিনী। এই মহামিলনে, ‘মহাযোগে’ ‘ছয় গোঁসাই’ শান্ত হয়ে রয়েছেন। চলছে ‘পঞ্চভাবে উপাসনা’। সে যে যথার্থ বৈষ্ণবীয় আচার! বৈষ্ণব মতের ‘পঞ্চভাবে’ পূজা সারছেন ‘ছয় গোঁসাই’। আদতে কিন্তু তা মোটেই না। এখানে যা রয়েছে তা হল বাউলেরই যথার্থ দেহাচার।
