ভাবলাম, শিক্ষাদীক্ষার পাঠ ছাড়াই এরা কীরকম গানের ভেতরকার তত্ত্বকথা, শরীর কথার পাঠ নিয়ে ফেলেছেন। কোনোদিনই কি সম্পন্ন হবে ওর শিক্ষাদীক্ষার পাঠ। শিবশঙ্কর দাস তো এখন প্রধানত গানজীবি। বউ-মেয়ে আছে। মেয়েটাও ক্লাস সেভেনে পড়ে তিনি শিক্ষাদীক্ষা দেন কী?
এ গানের মূল কথা, কায়া সাধন; এই বাউলও গড়ে নিয়েছেন ভাবসাধনে। যার বলেই তিনি আমাকে বোঝাতে চাইছেন। আকৃষ্ট করতে চাইছেন। সেই জন্যই তো গুরুর আশ্রমে যেতে বলছেন। অনুসন্ধিৎসু লোকজনকে যদি ভক্ত-শিষ্যরা গুরুর দরবারে নিয়ে যেতে পারেন তবেই তো গুরু তার প্রতি সদয় হবেন। মিলবে অনুষ্ঠানে তার গান গাইবার ছাড়পত্র, গুরু গাইবার আগেই। এই জন্যই তো এই বাউল পিছন ছাড়ছেন না আমার।
খ্যাপার এই গানের প্রথম শব্দ দুটোর প্রতীকী রহস্য ভেদ করে নিয়েছি আমরা। তা নারীর যোনিতে কীভাবে ফুটছে এই তিনরঙা ফুল? অনেক বাউলকে নারীর যোনিকে ‘গুপ্ত বৃন্দাবন’ও বলতে শুনেছি। বৃন্দাবনে যেমন রাধার রসধারা ঝরে, তেমনি নারীর যোনিতে রজঃপ্রবাহ ঘটে।
-তিন দিনের এই স্রোতধারা গো। তিন দিনে তিন রঙ ধরে। লাল হয় প্রথম দিন, দ্বিতীয়তে নীল, তৃতীয় দিনে সাদা রঙ তার।
অনেকে আবার চার রঙের কথাও বলেন। তিনদিন হল রজঃপ্রবাহের সূচনা দিন থেকে নিবৃত্তির দিন। প্রতিমাসেই এদিন, তিনদিন ঘুরে ফিরে আসে। এজন্য প্রচলিত এক কথাও আছে ‘মাসিক’। এ নিয়ে কমল দাসের একখানা গানও আছে–’মেয়ে গঙ্গা যমুনা সরস্বতী/ মাসে মাসে জোয়ার আসে ত্রিবেণী সংহতি। / যখন নদী হয় উথলা তিনজন মেয়ের লীলাখেলা/ একজন কালা একজন ধলা একজনা লালমতী।‘
দেহসাধক নারীর রজঃপ্রবাহের তিন দিনের ‘মহাযোগ’ এ শরীর যুগলের মিলনকে মনে করে থাকেন রাধাকৃষ্ণের যুগলতত্ত্ব। ত্রিগুণময়ী রাধা সম্বন্ধে শ্রীরামকৃষ্ণ বলেছিলেন, যার বিবৃতি আমরা ‘কথামৃত’তে পাই ৩০শে অক্টোবর ১৮৮৫ তারিখে শ্যামপুকুর বাটির কথোপকথনে–’বৈষ্ণবশাস্ত্রে আছে কামরাধা, প্রেমরাধা, নিত্যরাধা। কামরাধা চন্দ্রাবলী। প্রেমরাধা বৃন্দাবনে লীলা করেছিলেন। নিত্যরাধা নন্দঘোষ দেখেছিলেন গোপাল কোলে। … নিত্যরাধার স্বরূপ–যেখানে নেতি নেতি বিচার বন্ধ হয়ে যায়। নিত্য রাধাকৃষ্ণ, আর লীলা রাধাকৃষ্ণ। যেমন সূর্য আর রশ্মি। নিত্য সূর্যের স্বরূপ, লীলা রশ্মির স্বরূপ।‘
ঠাকুর রামকৃষ্ণদেব যেটা বলতে চেয়েছেন তা হল শ্রীরাধাতত্ত্ব তিনটি স্তরের। চন্দ্রাবলী হলেন আমাদের কামনা-বাসনা, মান-অভিমানের প্রতীকী রূপ। কামধারা তাঁরই প্রতিদ্বন্দ্বী। চন্দ্রাবলীকে কৃষ্ণের সখি না ধরে জ্যোৎস্নারূপও ধরে নিতে পারি। এই রূপ তেজস্ক্রিয়াকে পরিহার করছে। সূর্যের আলোর পরক্ষতা রয়েছে চাঁদের মধ্যে। চাঁদ সূর্যের আলোতে আলোকিত হয়েও কমনীয়তা বজায় রেখেছে। চাঁদ বাঁ চন্দ্রাবলী তাই প্রেমসংগ্রামের রূপ। সূর্যকে এখানে কাম হিসাবে ধরছি। কাম প্রেমে রূপান্তরিত হচ্ছে যেন। প্রেমরাধা কী? প্রেমরাধা হল নিঃস্বার্থ ভালোবাসার প্রতীক। যার কোনো চাওয়া নেই, পাওয়া নেই, কেবল সমর্পণ আছে। চৈতন্য তো সেই ভাবরসেই কৃষ্ণের উপাসনা করেছিলেন।
চৈতন্য মঠের সদানন্দ বাবাজি একবার আমায় বলেছিলেন, শ্রীকৃষ্ণই একমাত্র পুরুষ। আমরা তার ভক্তরা স্ত্রী-স্বরূপা হয়েই তাঁকে ডাকছি,প্রেমরূপে সব সমর্পণ করছি।
জিজ্ঞেস করেছিলাম, শ্রীকৃষ্ণকে একমাত্র পুরুষ বলতে কী বোঝাতে চাইছেন আপনি?
ফিক করে হাসলেন বাবাজি। অল্প দাড়ির গালে হাত বুলোলেন। বললেন, শ্রীকৃষ্ণ আমাদের পরমাত্মা। হৃদয়ের সচ্চিদানন্দ ঘন আনন্দও ধরতে পারে। এই আনন্দ পুরুষরূপ। তার বিকাশ, প্রকাশ, নারীরূপ। তাই তো মহাপ্রভু নারীরূপ ধরে সেই আনন্দকেই পেতে চেয়েছিলেন।
ঠাকুর বলেছিলেন ‘নিত্যরাধা নন্দঘোষ দেখেছিলেন গোপাল কোলে।‘ যেটা মনে হয় ঠাকুর এখানে ‘ব্রহ্মবৈবর্তপুরাণের’কাহিনীতে আলো ফেলতে চেয়েছিলেন। সেখানেই আছে আকাশ মেঘাচ্ছন্ন, আবহাওয়া অনুকূল, এর ভেতরেই নন্দের অনুরোধে যুবতী রাধা শিশু কৃষ্ণকে কোলে করে নিরাপদ স্থানে নিয়ে যান। যেটা মনে হয় নিত্যরাধা বলতে রামকৃষ্ণদেব আসলে নিত্যস্বরূপা পরমা প্রকৃতির কথাই বলতে চেয়েছেন। সাধক নিত্যস্বরূপা পরমা প্রকৃতি বলতে কিন্তু কুণ্ডলিনীযোগকেই বোঝেন। এই যোগেই শরীরের। জানলা-দরজা সব খুলে যায়। শরীরে চৈতন্যের আলো প্রবেশ করে। চৈতন্য হল গিয়ে ‘সচ্চিদানন্দ’। সৎ + চিৎ + আনন্দ। জগৎ সৃষ্টির মূলে তিনটি অবস্থা বর্তমান। সৎ হল অপরিচ্ছন্ন জ্যোতি। সৃষ্টির আদি প্লাজমাও আমরা বলতেই পারি। চিৎ হল হৃদয়ের স্বচ্ছতা। আনন্দ হল পরমশূন্যতা। আবার আরেকভাবেও আমরা ভাবতেই পারি ‘সচ্চিদানন্দ’কে উল্টো দিক থেকে সাজিয়ে নিলে। আনন্দকে অপরিচ্ছন্ন জ্যোতি ধরতেই পারি, সৃষ্টির আদি প্লাজমা হল এটাই। পণ্ডিচেরি বসবাসের কালক্ষেপ সম্পর্কে শ্রীমা একবার বলেছিলেন–’হৃদয়ে যেন আনন্দের পূর্ণঘট বসানো থাকত সর্বদা। একটু এদিক ওদিক হলেই, উছলে পড়বে।‘ এই আনন্দই সৃষ্টিদ্যোতক। দুঃখের একপ্রকার আনন্দ থাকে। তাঁকে চিনতে জানতে-বুঝতে হবে। তবেই না সৃষ্টিক্রিয়ার নকশা বুনতে সুবিধা হবে। চিৎ এবার ধরছি ইদম ব্যতিত অহম বোধ। অর্থাৎ নিজের অহংকারকে বাদ রেখে, সরিয়ে রেখে জাগতিক উৎসের অহংকারকে সাথে রাখতে চাইছি। সৎকে ধরছি পরম শূন্যতা হিসাবে (supervoid))
