বাউল ‘জলের জানলায় জলের খেলা’র কথা বলেছেন। বলেছেন–’ওই জলের কল ঘর্ষনেতে, হর ব্রহ্মা বিষ্ণু হলেও মরে।‘ দেহতাদের মরার কথা কেন? তাঁদের অমরত্বে আমরা তো বিশ্বাসী। কিন্তু বাউল তো আর দেবতা বিশ্বাস করেন না। তাই হর ব্রহ্মা বিষ্ণু তাঁদের কাছে শক্তিধর মানুষ। আসলে তো তাই-ই। শিবত্ব প্রাপ্তি কী? তা তো ওই শক্তিরই বিকাশ শরীরের ধৌতকণায়। তাই বাউল বলছেন হর ব্রহ্মা বিষ্ণুও যদি বিন্দুধারণ করতে না পারেন, বীর্যকে নিম্নগতি দিয়ে ফেলেন তবে তারাও পথভ্রষ্ট হবেন। সিদ্ধি আসবে না তাঁদের। যা মরারই নামান্তর। বলা হয়েছে–’জল চিনিলে ছাড়বে যমের জ্বালা’। ‘যম’ কী? যম হল যোগের আটটি অঙ্গের একটি রূপ। ‘যমশ্চ নিয়মশ্চৈব আসনঞ্চ তথৈব চ / প্রাণায়ামস্তথা গার্গি প্রত্যাহারশ্চ ধারণা/ ধ্যানং সমাধিরেনি যোগাঙ্গানি বরাননে।।‘ অর্থাৎ যম, নিয়ম, আসন, প্রাণায়াম, প্রত্যাহার, ধারণা, ধ্যান ও সমাধি–এই আটটি হল যোগের অঙ্গ যোগসাধন করতে হলে, স্বরূপ জ্ঞান লাভ করতে হলে, নিজেকে, আমিকে, আত্মাকে উপলব্ধ করতে হলে এই অষ্টযোগের অভ্যাস বিশেষ প্রয়োজনীয়। অহিংসা, সত্য, অস্তেয়, ব্রহ্মচর্য, অপরিগ্রহ এগুলোকে যম বলে। যখন মনের মধ্যে কোনো রূপ হিংসার ছায়া আসবে না। পরের দ্রব্য নেবার ইচ্ছা যখন চলে যাবে তখনই অস্তেয় সাধন হবে। শাস্ত্রে তো বীর্যধারণকে ব্রহ্মচর্য হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছে। সে সম্পর্কে তো আগেই বলেছি। অপরিগ্রহ হল অতিরিক্ত ভোগত্যাগ। খ্যাপা মনোহর এই গানে যমের জ্বালা ছেড়ে যাওয়া বলতে যোগের এই প্রথম ক্রিয়াকর্ম বলে সাধকের উদ্দীপিত ধ্রুপদী প্রতিসরণকেই দেখাতে চেয়েছেন। যে প্রতিসরণে অনুগত ছাড়া সিদ্ধি আসে না। এই অনুগত ভাব আসে জ্ঞান, বিবেক, বৈরাগ্য দ্বারা। এই অনুগত ভাব অর্জনে গুরুর সহায়তা অবশ্যই প্রয়োজন। সেই সহায়তাতেই ‘জলের এক বিন্দুতে শতকোটি ব্রহ্মাণ্ড সঞ্চারে’–অর্থাৎ বিন্দুধারণে শরীর হয়ে উঠেছে ব্রহ্মাণ্ড স্বরূপ। জলের এই ব্রহ্মাণ্ড প্রাপ্তিতে মানে সাধকের সিদ্ধ দশাতে ‘জলের পর্বতে জলের অরণ্য, জলের বৃক্ষে জলের লতা ধন্য হয়ে যাচ্ছে। যুগল মিলনের শরীরে চরমত্ব প্রাপ্তি ঘটছে। যার জন্যই ‘জলের ফুলে ভৃঙ্গরূপে, শ্যাম চরান হংস জলের সরোবরে।‘ ‘ভূঙ্গ’ হল ভ্রমর। বিন্দুধারণে সাধক শরীরে, যুগল শরীরে সিদ্ধির ভ্রমর গুনগুন করে যাচ্ছে আর জলের সেই সরোবরে শ্যাম হংস চরাচ্ছেন। হংস চরানো হল সম্ভোগ করছেন সাধক। সরোবর হল গিয়ে যোনি। রজঃপ্রবাহে সাধক বাউল সম্ভোগ অবস্থাতে বীর্যকে ঠেলে উপরে উঠিয়ে দিচ্ছেন। তিনি শ্যামরূপ হয়ে উঠছেন। ‘শ্যাম’ এখানে প্রেমের দ্যোতক। কামকে রূপান্তরিত করে নিচ্ছেন তিনি প্রেমে। এই শ্যামরূপ জলে ‘সত্বঃ রজঃ তমঃ তিন হয়।‘ মানে হল এই ত্রিবিধ গুণ আয়ত্তের ফলে ‘তিন’ অর্থাৎ ইড়া, পিঙ্গলা, সুষুম্না এই তিন নাড়ি শরীরের আজ্ঞাচক্রের উপরে মিলিত হচ্ছে। যে স্থানে তা হয় তাঁকে বলা হয় ত্রিকূট। বাউল বলেন ‘ত্রিবেণী’। এই মিলনে ‘মূঢ় কামিনী কয়, অবিশ্বাসে নয়, গুরুর চরণ যে জল দৃঢ় করে।‘ সেই-ই এর প্রতিরূপ চিনতে পারে। মানে নিজেকে সিদ্ধ স্তরে নিয়ে যেতে পারে। বাউল গুরুর অনুগত হয়ে সেই পথেই যেতে চান। ‘মূঢ় কামিণী’ হল মোহাবিষ্ট জন, অজ্ঞানতার ফুল। কামিনী এখানে স্ত্রী দ্যোতক নয়। ফুলটি হল সেই শরীরের চক্রকলার চিহ্নিত প্রতীক। এই প্রতীকে ধ্যানে, যোগে তাঁকে চেনা যাবে। তিনি হলেন ‘দেহব্রহ্মাণ্ড।‘ অবিশ্বাসে তা হবে না। হবে গুরুর প্রদর্শিত পদে যে। পথ যথার্থ বাউলের পথে। খ্যাপা তাকেই নির্দেশিত করছেন গানে।
এবার যে গানটির কথা বলব তা শুনেছিলাম কেঁদুলির খ্যাপা বাবার আখড়ায়। তরুণ এক অচেনা বাউল গাইছিলেন সে গান। হাতে একতারা। সুদর্শন। গায়কিতেও ফুলের। রঙ লেগেছে যেন। কণ্ঠ থেকে ফুলেরই শোভা ঝরে পড়ছে।
এক বঁকে তিন ফুল ফুটেছে, লাল, নীল পীত জরদ সাদা,
এক ফুলে সুরসিক বসে, আর এক ফুলে রয় রাধা।
আ মরি কি ফুলের লীলা, ফুলের মাঝে নন্দলালা
ভাঁড় ভেঙে ননী খায় দু’বেলা, বাঁশী বাজায় রাধা রাধা।
সে ফুল আছে থির পবনে, রসিকে তার সন্ধান জানে,
বায়ু বরুণ নাই যেখানে, ফুলেই খায় ফলের মাথা।।
দীন খ্যাপা কয় ফুলের লাগি, কতজন হল বিরাগী,
কেউ বা হল দেশত্যাগী, কেউ পেলরে ফুলের সুধা।
এখন ‘এক বঁকে’ মানে হল গিয়ে নারীর যোনি। সেই বাউল অবশ্য আমাকে বেশ শুদ্ধ ভাষাতেই ‘এক বঁকে’র মানে বুঝিয়েছিলেন। বলেছিলেন, এক বঁকে হল গিয়ে স্ত্রী জননাঙ্গ–বলেই আমাকে বলেছিলেন, এত আগ্রহ আপনার, আপাদের গুরুর আশ্রমে আসুন, সঙ্গ করুন সব জেনে-বুঝে যাবেন, এসব জানতে তো সাধুগুরুর সঙ্গ করতে হয়।
বললাম, খ্যাপা বাবার আশ্রম থেকে আপনি দীক্ষিত নন?
বললেন, না। এখানে তো কেবল মন্ত্রদীক্ষা দেওয়া হয়। তা আমার হয়েছে খ্যাপার আশ্রমেই। উনি তো নেই, দেহ রেখেছেন। ওর ছেলের কাছেই মন্ত্রদীক্ষা হয়েছিল আমার। এখানে নয়, রাধাকুঞ্জ আশ্রমে। তা শিক্ষাদীক্ষার পাঠ নেব ভাবছি।
জিজ্ঞাসা করলাম, কোথায় আপনার গুরুর আশ্রম?
বললেন, শিহালাই, এই বীরভূমেই। পাঁচ পিড়ির আশ্রমের নাম শোনেননি? ওখানেই এখন থাকি। শিবশঙ্কর দাস বৈরাগ্যের কাছে নাড়া বেঁধেছি।
