আমাদের প্রশ্ন, নারী শরীরের মধ্যে যে ষড়দল, চতুর্দল, শতদল পদ্মের কথা বাউল বলেন তা শুধু নারী শরীর কেন পুরুষ তথা মানব শরীরেও বর্তমান। তবে বাউল সাধক শুধু নারী শরীরে থাকবার কথা বলছেন কেন? শরীরের নটা চক্রে এই সব পদ্মরূপের কল্পনা করা হয়েছে। কারণ হল পদ্ম কাদায়, পাঁকে জন্মায় কিন্তু নিজে সে পঙ্কিল হয় না। কাদার উপরে সুন্দর ফুল হিসাবে ফুটে থাকে। রামকৃষ্ণদেব আমাদের সংসারে পাঁকাল মাছের মতো থাকবার কথা বলেছেন। পাঁকাল মাছও পাঁকে জন্মায় অথচ গায়ে পাঁক থাকে না। এই কাদা বা পাঁক হল প্রতীকী অর্থে মায়া। এই মায়াকে ভেদ করে পদ্মফুল ফুটছে। পদু সূর্যের আলো পেলেই তার পাপড়ি খোলে। তেমনই আমাদের শরীরের পদ্মগুলো তাঁদের দল খোলে কুণ্ডলিনী শক্তি জেগে উঠলে। সূর্যের আলো থাকা সত্ত্বেও যদি পদ্মের উপর জল ছিটিয়ে দেওয়া হয় তবে দেখা যাবে পাপড়িগুলো সব মুড়ে যাচ্ছে। সাধক বলছেন মানুষকে হতে হবে এই জলের উপরে ফোটা পদ্মের মতো পদ্মের পাপড়ি যেমন গায়ে জল পড়লে গুটিয়ে যায় তেমনই ইন্দ্রিয়ের আচরণগুলোও বদ্ধ হয়ে যেতে পারে বিরূপ আচরণে। যার জন্যই যোগক্রিয়ায়, সংযমে তাকে জাগিয়ে রাখতে বলছেন সাধক। যোগীতন্ত্রগুলো আমাদের সেই পথেই নির্দেশিত করেছে বারবার। যোগীগুরু, তন্ত্রসাধকরা এই সব পদ্মে ধ্যানমগ্ন হয়ে পড়েন। মানে শরীর ক্রিয়ায় শরীরকে জাগান। উপাসনা করেন। তন্ত্র সাধনাতেও সঙ্গিনী অনিবার্য। ভৈরবের ভৈরবী অবশ্যই দরকার। তবে তাঁরা রমণের পূর্বে যোনি পূজা, বুক, ললাট, কণ্ঠ, লিঙ্গ ইত্যাদি প্রত্যঙ্গর পূজা সারেন। বাউল তা করেন না। তবে তাঁদের মতও তান্ত্রিক ক্রিয়াকর্মেরও মত সেই কাম থেকে প্রেমে নিষ্কামী হওয়া। আমাদের প্রশ্ন, যে কোনো মিলনই, নারী-পুরুষের একত্র সম্ভোগই তো আনন্দের, উপভোগের শুধু লোকায়ত সাধনার মিলনে করণকৌশল যেটা তা হল যোনিতে বীর্যপাত ঠেকানো। বস্তুরক্ষা। বাউল নারীর শরীরে এই পদ্ম, ওই পদ্ম বলে সাধন সঙ্গিনীকে মনে হয় উচ্চাসনই দিতে চান। কিন্তু এটা তো ঠিক লালন ফকির, চণ্ডীদাস গোঁসাই, হাউড়ে গোঁসাই, পদ্মলোচন, দুদ্দু শাহ প্রভৃতি পদকর্তারা তাঁদের সব ক্রিয়াকরণের গানে নারীকে যে সম্মান প্রদান করেছেন সে সম্মান বাস্তবে নারীর বা সাধন। সঙ্গিনীর এখন নেই। তার কারণ অবশ্যই পুরুষের, সঙ্গীর, সাধকের ব্যভিচার। না হলে আমাদের লোকায়ত সাধন আধার কিন্তু নারীকে যোগ্য আসনই দিয়েছিল। কী তন্ত্র, কী বৈষ্ণব, কী বাউল সাধনে। বাউল, সঙ্গিনীটিকে ‘রাধারানি’, ‘মনের মানুষী’ ইত্যাদি বিশেষণের মালা পরান ঠিকই যেমন তন্ত্রে ভৈরব সঙ্গিনীকে, ভৈরবীকে ‘মা’ বলে সম্বোধন করেন। আসলে এই বিশেষণ, সম্বোধন, মান্যতা, যথাযোগ্য প্রাপ্য স্বীকৃতি সব ছিল এখনকার কারও রচনা নয়। বেশির ভাগটাই সাধক পদকর্তাদের।
খ্যাপা বলেছেন–’সপ্ততালায় নব জলের খেলা, জলের মানুষ হৃদে ভৃগুপদ ধরে।‘ সপ্তপ্তালা কী? আমরা বলব এ হল শরীরের প্রবেশ দ্বারের বা ভেতরের অংশবিশেষ। আমাদের শরীর শুক্র, শোণিত, মজ্জা, মেদ, মাংস, অস্থি ও ত্বক–এই সাতটি উপাদান দিয়ে তৈরি। যাকে সপ্তধাতুও বলা হয়ে থাকে। বাউল বলেছেন–’সপ্ততালা। অর্থাৎ সমগ্র শরীরে এই জলের খেলা চলছে। সাতটি উপাদানের শুক্রকে বাউল সাধক উর্ধ্বগতিতে নিয়ে যাচ্ছেন কেবল। শুধু বাউল সাধক কেন, তন্ত্র সাধকরাও এই বিধিকর্ম মানেন। পালন করেন। তান্ত্রিকরা বলেন তন্ত্র মন্ত্রমূলক নয়, ক্রিয়ামূলক। মন্ত্রের গুরুত্ব যা কেবল তন্ত্রে তা ক্রিয়াকরণের জন্যই। আমরা বলব বাউলও ক্রিয়ামূলক। মন্ত্রের গুরুত্ব যা কেবল তন্ত্রে তা ক্রিয়াকরণের জন্যই। তার মন্ত্র গানগুলোই। যেগুলো সব ক্রিয়াকর্মের আধারেই বিরচিত। এটা তো ঠিক ‘বাউল গান নয় কোনো’। ‘বাউল’ প্রকৃতপক্ষে দেহবাদী এক সাধনা। গান। তার উপাচার মাত্র। এর বেশি কিছুই নয়। বর্তমানে পরিবেশ পরিস্থিতিতে গানই মুখ্য হয়ে গেছে এই যা। বাউল বলছেন সমগ্র শরীরেই জলের খেলা চলছে। সাতটি উপাদানের শুক্রকে সাধক উধ্বগতিতে নিয়ে যাচ্ছেন কেবল। যাকে ‘সপ্ততালা’ হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছে। আর এই শুক্র ঊর্ধ্বগতিতে উঠে গেলে, বিন্দুধারণ হলে, যোনিতে পতন না। ঘটলেই সাধকের সিদ্ধ স্তর। জলের মানুষ অর্থাৎ বস্তু বা বীর্যরক্ষাকারী মানুষ ‘ভৃগুপদ’লাভ করেন বা করবেন। সাধক সিদ্ধ স্তরে বিচরণ করবেন। ‘হৃদে ভৃগুপদ ধরে’র অর্থ হল হৃদয়ে পর্বতের উচ্চস্থান ধরে রাখা। মানে সাধনায় নির্বিকল্প লাভ করা।
শাস্ত্রে বলছে–’ন তপস্তপ ইত্যাহুর্ব্রহ্মচর্য্যঃ তপোত্তমম্। / উৰ্দ্ধরেতা ভবেদ্ যস্তু স দেবো ন তু মানুসঃ।।‘ ব্রহ্মচর্য অর্থাৎ বীর্যধারণই সর্বাপেক্ষা উৎকৃষ্ট তপস্যা। যে ব্যক্তি এই তপস্যায় সিদ্ধিলাভ করে উৰ্দ্ধরেতা হয়েছেন, তিনিই মানুষ নামের প্রকৃত দেবতা। বাউল যাকে ‘বিন্দুধারণ’ বলেছেন। যোগও তাই বলছে–’যোগিনস্তস্য সিদ্ধিঃ স্যাৎ সততং বিন্দুধারণাৎ। সব সময় বিন্দুধারণ করলে যোগীগনের সিদ্ধিলাভ হয়। বীর্য সঞ্চিত হলে মস্তিষ্কে প্রবল শক্তি সঞ্চিত হয়–এই মহতী শক্তির বলে একাগ্রতা সাধন সম্ভবপর হয়। সন্ন্যাসীর মূলমন্ত্র আসক্তিমোচন। তাই নারী আসক্তি তার থাকবে না একেবারে। সেখানের। দেহসাধনা একক ক্রিয়াকরণের। লোকায়ত দেহসাধনার মতো কখনও যুগলের নয়। লোকায়ত সাধকরা সম্ভোগ সুখ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন না কিন্তু কখনও। শুধু ‘বিন্দুধারণ’ পদ্ধতিটিকে রপ্ত করেছেন। নারী আসক্তি তাঁদের রয়েছেই। যুগল সাধনার সৃষ্টিকল্পে আমাদের তাই মনে হয় বেশ বুঝেশুনে পরিকল্পিতরূপে এই ক্রিয়াকরণকে ভাবা হয়েছে। তবে এর পেছনে কারণ আছে। চর্যাপদের সময়কেই যদি আমরা মান্য দেহসাধনার নিদর্শন রূপে সামনে এনে দেখি, তবে দেখব সিদ্ধাচার্যরা সবাই কিন্তু গৃহী। বাউলরাও গৃহী। তাঁদের গৃহ হয়তো আখড়া অভিধার। তান্ত্রিকদের বরং সেই অর্থে গৃহ নেই। তবে এদেরও তো এখন ডেরা আছে। বাউল দেহসাধনা আখড়ায় সম্পন্ন হয়। তান্ত্রিক শরীরসাধনা। অমাবস্যাতে হয়। শ্মশানে ভৈরবীচক্র বসে। সন্ন্যাসীরা যুগলতত্ত্বের ধারেপাশে যান না। ত্যাগই তাঁদের প্রধান কর্ম। তাঁদের মতে ত্যাগের সাধনা না করলে ব্ৰহ্মচিন্তা নিস্ফল। কামিনী কাঞ্চন তাই সেখানে একেবারে নিষেধ। বিন্দুধারণ’ সেখানে কেবল বীর্যকে শুক্রকে উধ্বগমনে নিয়ে গিয়ে অতল আনন্দ লাভ করা।
