কানাই বাউল জলের মণিকোঠায়, মণির ভেতর ছটায় যে ‘উল্টা স্রোতে নৌকা বাওয়া’র কথা বলেছেন সেটিকেই আগে আমরা প্রতিরূপে সাজাই। উল্টা স্রোত হল বিপরীতমুখীতা তা বেশ বোঝাই যাচ্ছে। কিন্তু কীসের এই বিপরীতমুখীতা? এই বিপরীতমুখীতা হল যুগল সাধনার গুরু-শেখানো পদ্ধতি। যে পদ্ধতিতে সাধকের বীর্যের স্থায়িত্ব রক্ষা করার পদ্ধতিটি গুরু নির্দেশিত পথে করানো হয়।
বাউলের আত্মা। উপনিষদে আত্মা কী? কীভাবে দেখানো হয়েছে তাকে? ‘স ম আত্মেতি বিদ্যাৎ’–তিনিই আমার স্বরূপ। ‘ওঁ আত্মা বাঁ ইদমেক একাগ্র আসীৎ। আত্মা হল আমি নিজেকে এই আমি? আমি হল পঞ্চেন্দ্রিয়ের শরীর–বাক, নাসিকা, চক্ষু, শ্রোত্র ও মন। এই পাঁচটি ইন্দ্রিয়ই দেহ দ্বারা অধিগত থাকে। এজন্য এদের আধ্যাত্মিক বলা যেতে পারে। এই পঞ্চেন্দ্রিয় আবার পঞ্চপ্রকৃতি বা পঞ্চভূতের সঙ্গেও যুক্ত। বাক = অগ্নি, নাসিকা = বায়ু, চক্ষু = আদিত্য, শ্রোত্র = দিক, মন = চন্দ্রমা। আত্মাকে আমরা জ্ঞানের ব্যাপ্তি হিসাবেও দেখতে পারি। ভারী সংজ্ঞায় আমরা যাচ্ছি না। আমরা বলছি আত্মা সৰ্ব্বজ্ঞ। আমার এই যে আদান প্রকৃতির সঙ্গে যুক্ত তার ক্রিয়া দু’প্রকারের। স্বরূপ পরিণাম আর বিরূপ পরিণাম। স্বরূপ পরিণাম কী? আপনার বাঁ নিজের সত্ত্বকে সত্ত্বরূপে, রজকে রজরূপে, তমকে তমরূপে অবস্থান করানো। এগুলো সবই হল ব্যক্তিসত্ত্বার আবরণ। যা নিজের স্বরূপকে বিস্মৃত করিয়ে রাখে। সত্ত্ব হল নিজের প্রকৃতি, স্বভাব, মন–এই তিনটি গুণকে ঠিকভাবে চিনে নেওয়া। রজ হল দর্শনজনিত গুণ আর তম তামসিক গুণ বা অজ্ঞানতাকে দূর করা। আবরণ তিনটি। যা নিজস্ব স্বরূপকে বিস্মৃত করে দেয়। মোহ-দরজা বন্ধ করে দেয়। সাধক এই তিন আবরণ খসিয়ে ফেলে। প্রথম আবরণ তিন গুণ (সত্ত্ব, রজ, তম) যার কথা এতক্ষণ বললাম। দ্বিতীয় আবরণ ছয়টি স্বাদ (মিষ্টি, টক, লবণাক্ত, তিক্ত, ঝাল, কষা)। তৃতীয় আবরণ পঞ্চভূত (ক্ষিতি, অপ, তেজ, মরুৎ ও ব্যোম)। তিন গুণ আমাদের মনকে প্রভাবিত করে। পঞ্চভূত আমাদের দৈহিক গঠনকে ঠিক রাখে। ছয় স্বাদ আমাদের দেহের রাসায়নিক অবস্থাকে ঠিক করে দেয়। এভাবেই আমাদের মন ও দেহ এক সুতোয় বাঁধা পড়ে। তার সঙ্গে দশটি ইন্দ্রিয় (পঞ্চ জ্ঞানেন্দ্রিয় ও পঞ্চ কর্মেন্দ্রিয়) যুক্ত হয়ে কুণ্ডলিনী শক্তির উপর চব্বিশটি আবরণ সৃষ্টি করে। কুণ্ডলিনী হল চৈতন্যস্বরূপ। শক্তিরূপবলে শাস্ত্র তাকে চৈতন্যস্বরূপা করে নারীর অভিজ্ঞান দিয়েছে। এই কুণ্ডলিনী বাঁ চৈতন্যস্বরূপ / স্বরূপা যাই বলি না কেন তা যদি নিজের স্বচ্ছ দৃষ্টি হারিয়ে ফেলে তবেই গণ্ডগোল লাগে। হিতাহিত জ্ঞান শূন্য হয়ে যায়। আর দৃষ্টি যদি সে অর্জন করে ফেলে তবে ব্যক্তিসত্ত্বা বাঁ আমিরই সব রকমভাবে জাগরণ ঘটে। আমরা স্বরূপ পরিণাম বুঝলাম। অরূপ পরিণামও একে বলতে পারি। আর বিরূপ পরিণাম কী? পুরুষ ও প্রকৃতির সংযোগ আর সেই সময়ে প্রকৃতির বিরূপ আচরণ। পুরুষ হল আমাদের নিজের অজ্ঞানতা। প্রকৃতি হল নিত্যতা। আমরা ধরছি পুরুষ ও প্রকৃতি আসলেই এক সংযোগ। যে যোগে প্রাণের সৃষ্টি হয়। বাউলের আত্মাও এই দেহগত প্রাণকে ঘিরে। কিন্তু তার অবস্থান বস্তুগত। কী এই বস্তু যা বাউলের আত্মাতে সামিল। দুদ্দু শাহর একটি গান আছে, তাতে বলা হয়েছে: বস্তুকেই আত্মা বলা হয়। আত্মা কোন অলৌকিক কিছু নয়। কিন্তু ব্যাপারটা এতে স্পষ্ট হল না। আরেকটি গানে দুদ্দু বলেছেন: ‘যে বস্তু জীবনের কারণ/ তাই বাউল করে সাধন।‘ এই বস্তু শরীরের রজ-বীর্য। সাধক বাউল নিজেদের শরীরের অন্তঃস্থিত পদার্থকে সংরক্ষণ করেন। কানাই বাউলরা কেবল গানের তত্ত্বকথাকেই ব্যক্ত করেন ধর্ম কথায়। পালন করেন তা কেবল সাধক বাউলরা। তার সংখ্যা দিন দিন কমে আসছে। আরও একটি গানে দুদ্দু মেয়ের চরণ ধরেই সাধনার কথা জানিয়েছেন: ‘সাধন করো রে মন ধরে মেয়ের চরণ। বলেছেন–’পিতা শুধু বীর্যদাতা/ পালন ধারণ কর্তী মাতা/ সে বিনে মিছে কথা সাধন ভজন/ আগে মেয়ে রাজী হবে/ ভজনের রাহা পাবে/ কেশ ধরে পাড়ে নেবে দুদ্দুর বচন।‘
মনোহর খ্যাপার গানটিতে ‘জলের দরজায় জলের চাবি খুলা’ বলতে ইঙ্গিত করা হয়েছে সঙ্গিনীর রজঃপ্রবাহের তিন দিনকেই। আর এই তিন দিনই সাধক বাউলকে ‘উল্টা স্রোতে নৌকা বাইতে হয়। বাউলরা বিশ্বাস করেন, মানেন শরীরের ভেতরই পরমেশ্বরের সিংহাসন পাতা। তাঁকে লাভ করাই সাধক জীবনের মোক্ষ। কীভাবে তা সম্ভব? গুরুর শেখানো দম ও শ্বাসের কাজে–হঠযোগে, কুম্ভকে, পূরকে, রেচকে বীর্যের নিম্নগতিকে তাঁরা রুদ্ধ করে দেন। ওপরে উঠিয়ে দিতে তাঁরা পারেন। বীর্য নারীর যোনিতে রমণের পর চিহ্নস্বরূপ লেগে থাকবে না। রীতিমত সেখানে যোনি পরীক্ষার নিয়ম। দুটো শব্দ বাউল ব্যবহার করেন। বিন্দুধারণ’ আর ‘বিন্দুপতন। তার মানে হল বীর্যের গতিবেগকে ওপরে উঠিয়ে নাওয়া হল বিন্দুধারণ। পতন হল বাউল বলেন–’যোনিতে পতন।‘ মানে রমণে বীর্যপাত হয়ে যাওয়া। এই মিলন হয় সঙ্গিনীর রজঃপ্রবাহের তিন তিনটে দিন। বাউল বলেন এই এর উৎকৃষ্ট সময়। এই তিন দিন তাঁরা কামকে এই প্রক্রিয়ায় শুদ্ধ স্তরে, তাঁদের মতে প্রেমে রূপান্তরিত করেন। মেয়েদের রজঃপ্রবাহের তিন তিনটে দিন বাউলের ভাষায় ‘মহাযোগের সময়’। ঠিকঠাক উত্তীর্ণতায় বাউল সিদ্ধ স্তরে। পৌঁছান। তাঁরা বলেন নারী শরীরের মধ্যে ষড়দল, চতুর্দল, শতদল পদ্ম আছে। সে সব জেনে বুঝে তারপর হবে ‘জেন্তে মরা’ ‘জেন্তে মরা’ হল কাম থেকে প্রেমে নিষ্কামী হওয়া।
