শিহালাই সহজিয়া সেবাশ্রম, যাকে পাঁচ পিড়ির আশ্রমও বলা হয়ে থাকে। কারণ হল সেখানে হরিদাস মহান্ত, তুলসীবাবা, রমেন দাস, চম্পক বালা, বৈদ্যনাথ দাস–এই পাঁচ বাউল সাধকের সমাধি আছে। এই পাঁচটি সমাধি পরে ধূপ দীপ জ্বালতে দেখেছি সন্ধ্যাকালে শিবশঙ্কর দাস বৈরাগ্যকে। খ্যাপা মনোহরের বেদনাশা বটমূলে, খ্যাপার সমাধি মন্দিরেও ধূপ-প্রদীপ জ্বালানো হয় সন্ধ্যাবেলাতে।
লক্ষ্মণ দাস বাউলের আখড়াতেও রীতিমত ধূপ-দীপ-খোল-করতালে গোবিন্দের আরাধনা করা হয়ে থাকে। খেপামা, বেলহরি, দেশচাঁদপুর, তিকরবে, দৌমড়াও–এই আখড়াগুলো লোক মুখে শুনেছি প্রাচীনত্বের সাক্ষ্য বহন করে যথেষ্ট। এখানেও স্বায়ংকর্মে ধূপ-দীপের উপাচার আছে। এসব তো বৈষ্ণবীয় আচারের আখড়ার সন্ধ্যা, চোদ্দ মাদলের সন্ধ্যার নানারূপ ছবিকে মনে করিয়ে দেয়। বেশ প্রাচীন আখড়াগুলোরই যদি এই অবস্থা হয় তাহলে হালের গুলোর অবস্থা কী? ঘোষপাড়ার বাউল-বাউলানির বাড়িতে / আখড়ায় দেখেছি ঠাকুরের সিংহাসন পাতা। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই সেখানে রাধাকৃষ্ণ বিরাজমান। কৃষ্ণা দাসীর বাড়িতে লক্ষ্মীর সিংহাসন আছে। তাঁর লক্ষ্মীবারের ব্রতকথা পাঠও স্বচক্ষে দেখা। তবে এরা কেউই তো আর সাধক বাউল নন। গানকে জীবিকা করে কিছু বাউল-আচরণ সঙ্গে করে এরা জীবন নির্বাহ করছেন মাত্র। মহিলা বাউলরাও তো এখন সেবাদাসী, চরণদাসীর ভূমিকা ছেড়ে কেবল গানকেই সাঙ্গ করেছেন। সাধন সঙ্গীকে ছেড়ে অনেকেই দল গড়ে নিয়েছেন নিজের মতো করে। কৃষ্ণা দাসী তাঁর বাউল সাধনের সঙ্গী নবকুমার দাসের সঙ্গ ছেড়ে সেই কবেই দল গড়ে নিয়েছেন নিজের মতো করে। মুড়াগাছার সুমিত্রা দাসী, কল্যাণী সীমান্তর লক্ষ্মীরানি বিশ্বাস, বীরভূম আহমদপুরের ফুলমালা দাসী এরা সবাই এখন গানকে জীবিকা করে নিয়েছেন। ফুলমালা তো ট্রেনে ট্রেনেও মাধুকরী করে বেড়ান। তবে মাটিয়ারীর মীরা মোহন্ত, নবাসনের নির্মলা মা এখনও পুরনো ধ্যান ধারণা পুষে রাখেন। মেয়েদের হাটে মাঠে গান গেয়ে বেড়ানো তাঁদের কাছে গর্হিত অপরাধ। মেয়েদের আখড়ায় বসে সাধনভজনের কালকে আমরা কিন্তু আজকে পরিস্থিতির চাপে অনেকটা পেছনে ফেলে এসেছি। বাউল সংস্কৃতিতে মহিলাদের বিদ্রোহী সত্তা, সাধন সঙ্গিনী হয়ে কেবল না-থাকা–এই জেহাদ অনেকাংশেই ওই ফেমিনিজমের নামান্তর। দীর্ঘদিনের লাঞ্ছনা, অপমান, বঞ্চনা, অসম্মান থেকে তাঁরা বেড়িয়ে আসতে চাইছেন। সেই প্রক্রিয়াকরণও অনেকদিনই হল জোরকদমে শুরু হয়ে গেছে। তাই বাউলের ক্ষেত্রে আচরণ নয়, গানই এখন মুখ্য হয়ে উঠেছে, উঠছে কেবল। ধস নামতে শুরু করে দিয়েছে বাউল সংস্কৃতিতে।
এবার আমরা আচরণে ফিরে যাব কানাই বাউলের গানকে সাঙ্গ করেই। বাউল বলছিলেন অনুরাগের কথা।
বললেন–অনুরাগে সায় মেলে।
জিজ্ঞাসা করলাম–কার সাড়া পেতে চাইছেন?
–কেন গো, নিজের অন্তরের সাড়া। সে সায় দিলেই তো আত্মার জাগৃতি হবে।
তবে বাউলের আত্মার ফর্দ অন্য। উপনিষদের ব্যাখ্যার সঙ্গে তা সচরাচর মিলবে না। সে সবে পরে আসছি। আগে কানাই বাউলের উপলব্ধির আসরে খানিক বসি। একতারা বাজাই।
সদাচারী বাউল বলতে যা বোঝায় কানাই বাউল তাই। মন্ত্র দীক্ষা তিনি নিয়েছিলেন খ্যাপাবাবার কাছে। ওখানেই তাঁর নাড়া বাঁধা। তবে ছেলে-মেয়ে নিয়ে তিনি এখন রীতিমতো সংসারী। মেয়েও গান গায়। জামাই বাউল-আসরে ক্যাসিও বাজায়। ছেলেটাও গাইতে পারে। কানাই বাউলের স্ত্রীকেও আশ্রমে সন্ধ্যাবেলায় সাধনার গান গাইতে দেখেছি। বলা ভালো তাঁর বাউলের সংসার। তাঁকে সদাচারী বলেছি এ কারণেই, কানাই বাউলের সেই শুদ্ধ আচরণ ধর্মকথায় তত্ত্বকথায় আবদ্ধ। বাউল সাধনাকে তিনি বহন করে আসছেন এভাবেই। প্রকৃত সাধকের সন্দর্ভ তাঁর নেই ঠিক কথা কিন্তু হৃদয় ও চৈতন্যের অভিমুখে সর্বদাই তিনি দাঁড়িয়ে অভিসারী ভাবনায়।
বললেন–এ জল তোমার শরীরের জল গো। জলের খেলায় সাধক মাতে। জলের মধ্যেই যে উল্টাস্রোতে নৌকাকে বাইতে হয়।
জানি তিনি যা বলেছেন, বোঝাতে চাইছেন তাঁর আকারগত রূপটি বাউলের কেবল অনুভূতির। গানের প্রতীকী আলোকসম্পাত তিনি জানেন ঠিকই, মরমে উপলব্ধি করতেও পারেন। কিন্তু জীবনের স্বতঃসিদ্ধ ধারায় তা কোনোভাবে আর হয়ে ওঠেনি। তবে শুধু তিনি কেন, এখানকার বাউলরা তো প্রায় সকলেই কেবল গানের শাণিত উচ্চারণের দিকে ঝুঁকে পড়েছেন। বাউল যে সাধন কৌশল সেই সারবত্তা আস্তে আস্তে মুছে যাচ্ছে। রয়ে যাচ্ছে তাঁর অনূদিত গান। এর কারণগত বিচার-বিশ্লেষণে আমরা কিন্তু বসিনি এখানে। এখানে যেটা বলতে চাইছি বাউল গানের ভেতরে যে মুদিতাক্ষ সৌন্দর্য, শরীরের সেই প্রবক্তাসুলভ আচরণ যা এখন বাউল ধরে রেখেছেন তাঁর তদগত ভাবনায়–সেই শরীরিণী কলাকৈবল্য কীভাবে আমাদের সৃষ্টিপ্রক্রিয়ার বা সৃজনশৈলীর মধ্যে ক্রমাগত এক রূপকসর্বস্ব কথকতার জন্ম দিচ্ছে যার মধ্যে আমাদেরই ভাব সংস্কৃতির বিস্তৃত অধ্যায়গুলো সব পড়ে। আমরা এখানে তাকেই কেবল খুলে ধরতে চাইছি। যেটা বলতে চাইছি, বাউল গানের স্বভাব ন্যস্ত অরূপে যে ধরা-ছোঁয়ার অনূদিত শিল্পরূপ তাঁর বিচ্ছুরণ আমরা কেন আমাদের গভীরতর সন্ধিৎসার ভেতর রাখছি না? সেটিকে না রেখে বাউলের সাধনাগত অধ্যায়ের অবক্ষয়জনিত যে ধারাপাত তা নিয়ে ভাবছি। তবে এটাও ঠিক সাধনার প্রক্রিয়াগত যে পুঞ্জ আধার বাউল যদি তা এখন আর জীবনে, যাপনে ধারণ না করেন কেবল গানের আখরগুলোর ভেতর রসাস্বাদনের বস্তুপুঞ্জকে শুধু বিতরণ করেন অনুগত ভক্ত-শিষ্যর মধ্যে তবে সাধন সংস্কৃতির ধারাটি একদিন তত্ত্বধর্মী অগ্নিশিল্পে পরিণত হবে। রূপায়ণ আর হবে না।
