হঠযোগের কথা প্রায়শ বলে থাকেন বাউল। শিষ্যকে এই যোগ আর রেচক, পূরক, কুম্ভক করার উপদেশ আমি অনেক বাউল আশ্রমেই শুনেছি। এই ক্রিয়াকর্মের বেশ কিছু গানও আছে। যেমন–চণ্ডী গোঁসাইয়ের গান: ‘যদি রেচক পূরক কুম্ভক করবি ভাই তবে নাড়ির কপাট খুলা মায়া / শিখে নেগে আগে তাই।‘ নাড়ির এই কপাট খোলার মায়াই হল গিয়ে যোগ। চারপ্রকার যোগের কথা আমরা জানি। মন্ত্রযোগ, হঠযোগ, রাজযোগ, লয়যোগ। মন্ত্রযোগ সর্বপ্রকার সাধনের মধ্যে সবচেয়ে নিকৃষ্ট বলে কথিত। ‘মন্ত্র জপান্মনোলয়ো মন্ত্রযোগঃ।‘ অর্থাৎ মন্ত্র জপ করতে করতে যে মনোলয় হয়ে থাকে, তাই মন্ত্রযোগ। তবে একে নিকৃষ্ট অভিধায় ভূষিত করলেও কিন্তু এও বলা হয়ে থাকে: ‘জপাৎ সিদ্ধিঃ, জপাৎ সিদ্ধিঃ, জপাৎ সিদ্ধিঃ ন সংশয়ঃ।‘ জপই সাধনায় সিদ্ধি এনে দিতে পারে। কালী, কৃষ্ণ, শিব যাই বলি না কেন আমরা এতে বাঁ এই ইষ্ট সাধনায় সিদ্ধি পেতে গেলে জপের ভূমিকা অনিবার্য। বাউলের ইষ্ট মানুষ। তাঁরই ভজনা বাঁ সাধনা সারাক্ষণ বাউলের সাধনা। সেই সাধনার জপ হল গিয়ে গান। বন্দনা। খ্যাপা বাবা নিজেই এ ধরণের বন্দনা গান অনেক লিখে গেছেন। যেমন-’অনুরাগে ভজরে মন,/ পাবি রাধার যুগলচরণ,/ রাধাকৃষ্ণ একাসনে/ ধ্যানে মগ্ন মদনমোহন।‘ বা, ‘আগে নিষ্ঠারতি করগে মনে, পরে করবিরে উপাসনা/মনের ভুল তোর থাকবে না রে দূরে দিবি রে রূপাসনা।‘ অথবা, ‘আমার নয়ন কোণে লুকিয়ে কালা / বাজাল কি মজার বাঁশি। / সুরে প্রাণটি আকুল করে, / ওলো কুল মজাল এই কি বাঁশি।।’ খ্যাপার এই সব গানকেই তন্ত্রযোগ বলে চিহ্নিত করা হয়েছে। আমরা যাকে মন্ত্রযোগ বলে জানি। বাউল ক্রিয়াকর্ম। তন্ত্রও তো তাই। শরীর আধারিত সব অধ্যায় এই সব লোকায়ত সাধনা। হঠযোগ হল গিয়ে একত্রে সংযোগ। বাউল সাধনে যা অপরিহার্য। গুরু–শিষ্যর। সাধক-সাধক সঙ্গিনীর। গুরু-শিষ্যর সংযোগের একটি বহুল প্রচারিত গানের কথা আমরা সকলেই জানি–’চাঁদের গায়ে চাঁদ লেগেছে, আমরা ভেবে। করবো কি? ঝিয়ের পেটে মায়ের জন্ম, তাঁরে তোমরা বলবে কি?’
এই চাঁদের গায়ে চাঁদ লাগা হল গুরু আর শিষ্যর মিলন। এই গানে ব্যবহৃত প্রথম চাঁদ হল গুরুচাঁদ। যিনি শিষ্যকে টানছেন, আশ্রয় দিচ্ছেন। গুরু এখানে যেন কল্পিত একটি বড়োসড়ো চুম্বকখণ্ড। এই চাঁদের গায়েই শিষ্যচাঁদ লেগে যাচ্ছে। অর্থাৎ শিষ্য হলেন। লৌহকণিকা। গুরু তাঁকে নানা প্রাকরণিক কৌশলে চুম্বকের মতোই আকর্ষণ করছেন। দু’জনের দেহই ঈশ্বরের অংশ হয়ে উঠছে যেন। পূর্ণচন্দ্র গুরু। তাঁর আকর্ষণে চন্দ্রাংশ বা শিষ্য মিলিত হচ্ছেন বা হবেন, এতে কারও কিছু করবার নেই। ক্রিয়াশীল এই নিয়ম। এখানে কোনো রকম ভাবনার অবকাশ থাকবার কথা নয়। শিষ্য এখানে নিজেকে মাতৃঅংশ বলে মনে করেছেন। তাই ‘ঝিয়ের পেটে মায়ের জন্ম। ঝি হল সন্তানতুল্য অভিধা। নিজেকে তিনি মাতৃভাবে প্রতিপন্ন করে গুরুকে সন্তানের আসনে বসাচ্ছেন।
‘হকার কীৰ্ত্তিতঃ সূৰ্য্যষ্ঠকারশ্চন্দ্র উচ্যতে। সূৰ্য্যচন্দ্রমসোর্যোগাদ্ধঠযোগো নিগদ্যতে।।‘ অর্থাৎ, হ শব্দে সূর্য ঠ শব্দে চন্দ্র, হঠ শব্দে চন্দ্র-সূর্যের একত্র সংযোগ। অপান বায়ুর নাম হল চন্দ্র আর প্রাণ বায়ুর নাম হল সূর্য। প্রাণ আর অপান বায়ুর একত্র সংযোগকেই শাস্ত্রে হঠযোগ বলেছে। যোগশাস্ত্রে এই দুই শরীরের বায়ু ত্যাগ-গ্রহণের মাধ্যমেই ক্রিয়াকর্মের কথা বলা হয়েছে।
সব সময়ে গুহ্য ভাষাতেই কথা বলে থাকেন বাউল। কারণ গুরুর নির্দেশ: ‘আপন সাধন কথা না কহিও যথা তথা/ আপনার আমিরে তুমি হইও সাবধান। বাউলের গানও তাই প্রহেলিকাতে ভরা। হঠযোগের চন্দ্র বাউলের সংকেতময়তার বাঁ নাক আর সূর্য ডান নাক। অর্থাৎ সেই ঘুরে ফিরে শ্বাসপ্রক্রিয়ারই কথা কিন্তু হল। জ্ঞানযোগ শরীর জাগৃতির গাণিতিক অধ্যায়ের পর উপলব্ধ বিশ্বাস। মানুষতত্ত্বের প্রতি পুরোপুরি আস্থা। খ্যাপা বাবার গানগুলো তো তাই-ই প্রমাণ করে। ভক্তিযোগ হল মহামিলনের পর। স্থিতাবস্থা। বাবার গানগুলোতে তারই প্রমাণ মেলে–’শ্বাসের মালা-জপরে ভোলা,/ যাবে। রে তোর ত্রিতাপ জ্বালা, / সদা শান্তি পাবি–প্রাণ জুড়াবি/ নয়নে নাচবে যে তোর নন্দলালা।‘ বা, ‘সে দেশে নাই যুবা বৃদ্ধ বালা, / রেবতীর পতি গুরু, নিজে স্বামী নিজে জরু, / পূর্ব দেশে ভূমি মরু, বিনা আগুনে জ্বলিছে আলা। / সে দেশের আলো, সেথা নাই শ্যাম চিকন কালা,/ ওই হাটের তরণি সুর বাঁধা অনাহত গলা।‘
কানাই বাউলের যে গানের কথা বলে আমরা শুরু করেছি তা খ্যাপা বাবার হঠযোগ পর্যায়ের গান বলেই চিহ্নিত রয়েছে। ভক্ত-শিষ্যরা বাবা গানগুলির এক সংকলনও প্রকাশ করে ফেলেছেন। নাম রেখেছেন ‘ক্ষ্যাপাগীতামৃতে আত্মতত্ত্বের সন্ধান’ (বাউল সংকলন)। তাতে কানাই বাউলের মুখে শোনা গানটি দেখি ওই পর্যায়ভুক্ত রয়েছে। আমরা এখন গানটির অন্তর্নিহিত অর্থের ভেতর প্রবেশ করি।
গানটির প্রথমেই যে কথাটি বলা হয়েছে তা হল অনুরাগ ছাড়া তাঁকে চিনতে না। পাড়ার কথা। এই অনুরাগ হল ভক্তি, প্রেম। প্রীতি, আসক্তি তো তাঁর আভিধানিক মানে। বাউল সাধক এর বাইরে বেরোতে চান। কানাই বাউল অজয়ের পাড়ে বসে যখন আমাকে এ গান শুনিয়ে ছিলেন তখন ভরা বর্ষার মাস আসতে শুরু করেছে সবে। তিনি বললেন, অজয়ের অনুরাগ হয়েছে গো। কৃষ্ণের হাওয়া লেগেছে গায়। তাই উতলা হয়ে উঠেছে। যারা শীত গ্রীষ্মের অজয় দেখেছেন কেব্ল তাঁরা ভরা বর্ষার সময় এর রূপ কল্পনায় আনতে পারবেন না। তার রূপ অনেকটা ওই বাউলের গানের মতোই–’জলের গড়ন মণিকোঠা, মণির ভিতর জলের ছটা / জলের দরজায় জলের চাবি খুলা। অজয় যেন তাঁর জলের চাবি খুলিয়ে এ সময় কানায় কানায় ভর্তি করে ফেলেছে জল। আর তা ওই অনুরাগের মতই। উপচে পড়ছে চারিধারে ডোবাচ্ছে। ভাসাচ্ছে। বাউল সাধক এই অনুরাগেই ডুবে মরছেন। যাকে চেনার কথা, জানার কথা, বোঝার কথাও বলা হয়েছে গানে, সে তো সেই সঙ্গীতে আস্থায়ী অন্তরা-সঞ্চারী-আভোগের মতোই এক পরিণতির প্রক্রিয়া। এই পরিণতি গুরুর নির্দেশে, দেখানো কায়কল্পে নিজের ভেতরকার শরীরী প্রতিসরণ। যাকে চিনবার কথাই ব্যক্ত করা হয়েছে গানে। বাউল মূর্তিপুজায় বিশ্বাস করেন না এ তথ্যের কথা আমরা। বলেছিলাম। কিন্তু এ তথ্য সব সময় সর্ববিদভাবে সত্য নয়, অন্তত আজকের বাউল অভিধায়। মন্ত্রদীক্ষার সময় মালসাভোগ নিবেদনে অনেক বাউলের মুখেই শুনেছি আত্মগুরু এবং পঞ্চপ্রভুকে তা নিবেদন করা হয়। আত্মগুরু এখানে নিজের গুরুদেব বাঁ তাঁকে আমরা মনগুরু হিসাবেও দেখতে পারি। আর পঞ্চপ্রভু হলেন–গৌরাঙ্গ, নিত্যানন্দ, অদ্বৈত, শ্রীবাস, গদাধর। এরা কেউই কিন্তু প্রতিকৃতি নন কেবল কল্পমূর্তির, এটাও যেমন ঠিক আবার একই রকমভাবে ঠিক বাউল আশ্রমে বা কিছু আখড়ায় সন্ধ্যা-আহ্নিকের কর্মে গোবিন্দ মূর্তির ফটো আমি সামনে রাখাও দেখেছি। এ যথেষ্টই বৈষ্ণবীয় আচার। ‘বাউল আর বৈষ্ণব এক নহে তো ভাই’ বলা হলেও অন্তত এক্ষেত্রে এখন অনেকাংশেই একাকার হয়ে গেছে। বাউলের মাধুকরী তো বৈষ্ণব আচারেরই অঙ্গ। তন্ত্রে পঞ্চ ‘ম’ কারে সাধনার নির্দেশ আছে। যে সাধনা সম্পূর্ণরূপে নাড়িকল্পের বৈষ্ণবীয় এক আচার যেটা দেহাচার নয় বলা ভালো হবে সংযমাচার সেগুলোকে বৈষ্ণবীয় আচরণে অনেকটা তন্ত্রের পঞ্চ ‘ম’ কারের মতোই ভিন্ন প্রতীকী অর্থে সাধনা করা হয়। আর এভাবেই তন্ত্র আর বৈষ্ণবীয় আচরণে মাংসসাধক, মুদ্রাসাধক, মৎস্যসাধক, মৈথুনসাধক, মদ্যসাধক আলাদা হয়ে পড়েন। বাউল পঞ্চ ‘ম’ কার নয় পঞ্চভূতে সিদ্ধির কথা বলেন। তাঁদের পঞ্চভূতের সঙ্গে আবার অঘোরী মতের পঞ্চ ‘ম’ কারে কিছুটা মিল রয়েছে। অঘোরী মতে মৃত্তিকা = মুদ্রা, জল = মৎস্য, অগ্নি = মদ, বায়ু = মাংস, মৈথুন = ব্যোম। তবে সাধক ভেদে এর প্রভেদ থাকতে পারে। যেটুকু বুঝেছি প্রতীকী অর্থময়তাতে এসব তলিয়ে দেখলে বোঝা যায় পার্থক্য কেবল দৃষ্টিকোণের এর বেশি কিছুই নয়। বাউলের পঞ্চভূতে পরে আসছি। এই বিধিকল্প যথাযথ সময়েই পেশ করব। যেটা বলেছিলাম বাউলের অর্চনার কথা।
