কানাই বাউল জেঠিয়ায় গান সেরে গতকাল রাতেই গৌরিবাবুর বাড়িতে এসে উঠেছেন। আজ পার্শ্ববর্তী এক আসরে গাইবেন তিনি। হালিশহর শ্মশান লাগোয়া ছিন্নমস্তার আশ্রমে বসেছে সেই আসর। বিকেল নিভু নিভু বাতি জ্বালিয়ে নিয়েছ। গঙ্গায় জোয়ার লেগেছে। ছলাৎ ছলাৎ শব্দে জল খানিক আছড়ে যাচ্ছে পাড়ে। অন্তিম জীবনের কার্যও সমাধা হচ্ছে কান্না আর শোকে। হরিধ্বনি উঠছে।
আলো সাধুর সন্ধ্যা আরতির পর গান ধরলেন কানাই বাউল। বললেন আজ শুধু গুরুর গানই গাইবেন। অন্য কারও নয়। তাঁকে যেন অনুরোধ করা না হয়। কেননা আজই তাঁর গুরু ইহলোকের মায়া কাটিয়ে ভব সমুদ্রে পাড়ি দিয়েছেন। আজ তাঁর গুরুদেবের তিরোভাব তিথি।
প্রথমে আসর বন্দনা করলেন তিনি। গুরুকে প্রণাম করে সুর ধরলেন
আনন্দে বল জয় গুরু জয়।
জয় জয় জয়, যম পরাজয়,
জয় জগন্নাথ, জয় কী জয়।
আনন্দে বল জয় গুরু জয়।
এরপর গান শুরু করলেন তিনি। ডুবকিতে চাপর পড়ল। দোতারা, খমকও সঙ্গত দিল সেই মতো। তাঁর চোখে ভক্তিরস আর গাঁজার আচ্ছন্নতা। অল্পবিস্তর মানুষ সেখানে। ভাবগম্ভীর পরিবেশ। আলো সাধু তন্ময় হয়ে কানাই বাউলের গান শুনছেন। রামপ্রসাদের। হাওয়া লেগে ছড়িয়ে পড়ছে তাঁর গান। বকুলতলা নিগমানন্দের আশ্রমে সন্ধ্যা আরতির ঘণ্টাধ্বনিও শোনা যাচ্ছে।
আমরা দুই বন্ধু গৌরীবাবুর পাশে বসে। ভাবছি, বাউলের গান কি চৈতন্য ডোবার গৌর মূর্তিতে কাঁপন ধরাচ্ছে? একটু আগেই দেখা গৌরের প্রসন্ন হাসি যেন এখন কানাই বাউলের জর্দার ছোপ লাগা দাঁতে লেগে। একমনে গেয়ে চলেছেন তিনি।
অনুগত বিনে তাঁরে কে চিনিতে পারে
জলের গড়ন মণিকোঠা, মণির ভিতর জলের ছটা,
জলের দরজায় জলের চাবি খুলা,
সপ্ততালায় নব জলের খেলা, জলের মানুষ হৃদে ভৃগুপদ ধরে।
ওই জলে জল বিহরে, অনুগত বিনে তাঁরে কে চিনতে পারে।
জলের স্বর্গ জলের মঞ্চ, জলে সপ্ত পাতাল স্থিত,
ওই জলের কল ঘর্ষণেতে, হর ব্রহ্মা বিষ্ণু হলেও মরে।
জলের জানালায় জলের খেল, জল চিনিলে ছাড়বে যমের জ্বালা,
সেই জলের এক বিন্দুতে শতকোটি ব্রহ্মাণ্ড সঞ্চারে।
জলের পর্বতে জলের অরণ্য, জলের বৃক্ষে জলের লতা ধন্য,
জলের ফুলে ভৃঙ্গরূপে, শ্যাম চরান হংস জলের সরোবরে।
জানি শ্যাম কেমন জল, সে জলে ভাঙ্গিল বিধির বল,
জলের ভিতর স্বতঃ রজঃ তমঃ তিন হয়,
মূঢ় কামিনী কয় অবিশ্বাসে নয়, গুরুর চরণে যে জন দৃঢ় করে।
জলের এই কথকতা প্রথম শুনেছিলাম আমি অজয়ের পাড়ে বসে। তখন বাউল পাঠ পড়তে শুরু করেছি সবে বেশ মনে আছে এই কানাই বাউলই প্রথম আমাকে জলের প্রতীকীকলা খুলে ধরেছিলেন একেবারে সদর দরজা হাট করে। জল যে আমাদের শরীর বস্তুরই অংশভাগ–বীর্য-রজঃপ্রবাহ, কানাই বাউল তার প্রথম হদিশ দিয়েছিলেন।
এই গানের প্রথমেই বলা হয়েছে–’অনুগত বিনে তাঁরে কে চিনিতে পারে। কে এই তিনি? আমরা বলব এ তো জলের ধারার মতোই পরিষ্কার, তিনি হলেন শ্যাম। তাঁর বর্ণনাও তো এখানে আছে–’শ্যাম চরান হংস জলের সরোবরে।‘ তারপরেই অবশ্য ধোঁয়াশা সৃষ্টি করা হয়েছে–’না জানি শ্যাম কেমন জল’ বলে। আর এই না জানা থেকেই উঠে আসে বাউলের অভিজ্ঞান। তিনি কল্পমূর্তির শ্যামে বিশ্বাস রাখেন না। বাউল সাধক। মূর্তিপূজায় বিশ্বাসী নন। সাধারণত কোনো বাউল আশ্রমে কিংবা আখড়ায় কোনও দেবদেবীর পূজা দেখা যায় না। বাউল কখনও কোনও মূর্তির সামনে মাথা নত করেন না। পুস্পাঞ্জলি পর্যন্ত দেন না। বাউলের পূজা বা সাধনা তা সব ওই মানুষকে নিয়েই। এ মানুষ হল অধর মানুষ। খ্যাপা বাবারই গান আছে–সে যে অধর মানুষ/ দেয় না ধরা/ ধরতে হয় এক কৌশলে। / (সে যে) সহজে আসে, সহজে যায়/ (মন) বসে আছে দ্বিদলে। বা, ‘সহজ মানুষ না হলে/ সহজ উপায় বুঝিবে সে কার বলে। / চল সহজে সোজা, ঘুচাও মনের গজা, / নইলে তুলতে নারবি, কর্ম ফেরের বোঝা, / ওহো গুরু মহাজন বলে। অথবা, ‘সহজের পথে চলে যাও/ থেকো না আঁধার ঘরে। / সহজেতে আসে সহজেতে যায়,/ (খ্যাপা) ধরিবে কেমন করে?’
একবার ঘোষপাড়ার মেলায় এক বৃদ্ধ বাউল আমায় বলেছিলেন, বাউল কথার অর্থ হল আসলে গিয়ে অন্বেষণ।
জিজ্ঞাসা করেছিলাম, কীসের সেই খোঁজ? কাকে খোঁজা? –কেন বাবা, নিজেকেই তো খোঁজা। হেঁড়াফাটা আমিকে একত্র করে দেখা কোথায় কোথায় ফেটেছে তার, রিপু করতে হবে না বাবা। তা করতে গেলে গুরু লাগবে। জ্ঞানতত্ত্ব লাগবে।
‘গুরু’ কথার অর্থও তো তাই। ‘গু’হল গিয়ে অন্ধকার আর ‘রু’ হল গিয়ে আলো। যে বা যিনি শিষ্যকে সেই অন্ধকার থেকে আলোর পথে ঠেলে তোলেন তিনিই তো আসলে গুরু।
আনন্দগোপাল দাস বাউলের একখানা গান আছে। বোলপুরের সুরিপাড়াতে থাকেন তিনি। কেঁদুলির মেলাতে বসেই তাঁর রচিত গানখানি শুনেছিলাম।
আমায় বল গুরু কানে কানে
আমি শুনে যাব মনে প্রাণে
গুরু স্থান দিও ওই শ্রীচরণে
আমি সহজতত্ত্ব জানতে চাই।
এই মানুষের এমনি কঠিন প্রাণ
সে গায় না গুণগান
তত্ত্ব জানবে গুরুর কাছে
তাঁরে করে না সন্ধান।
ও তাঁর কলিযুগের এই তো প্রমাণ
দাস আনন্দ বসে ভাবছে তাই।
বাউলের সেই ‘সহজতত্ত্ব’ জানা তো আসলে নিজেকেই জানা। এই আমি, দেহগত আমি, আত্মগত আমিকে সদগুরুর সাহায্যে জাগিয়ে তোলা। বাউল আসলেই এক জাগরণকলা। এই জাগরণই যে তাঁর গান। শরীরের সামগ্রিক দলিলসমূহ। বাউল তাই-ই লিখে রাখেন তাঁর দেহতত্ত্বের গানে। যে তত্ত্বের চারটি অনুপম যোগ বর্তমান–হঠযোগ, তন্ত্রযোগ, জ্ঞানযোগ, ভক্তিযোগ। আমাদের আলোচ্য খ্যাপা বাবা বা শ্রী শ্রী খ্যাপা মনোহর ঠাকুরের গানে এই চারটি ক্রিয়াকৈবল্যকে আমরা সব সময়েই দেখতে পাই। যে তিনটি গানের কথা আমরা বললাম বাউলের মানুষ বিকাশের পথটিকে ঋজু করতে, প্রশস্ত করতে-সেগুলো সবই আত্মদর্শনের গান। এক অর্থে এ তো সেই বৃদ্ধ বাউলের বলা অন্বেষণই। বাউলের সমস্ত গানকে, সাধনাকে আমরা তো এই অভিধাতেই রাখতে পারি। খ্যাপা বাবার এই গানগুলি জ্ঞানযোগের।
