কী এই ব্রহ্মাণ্ড? জিজ্ঞাসা করেছিলাম আমি।
বললেন, রজ আর বীর্য। রজ হল স্ত্রীলিঙ্গ। বীর্য হল পুংলিঙ্গ। লিঙ্গ শাসন হয় এই রস রতি দিয়েই। ত্রিবেণী পেরোতে হয়। নদীই হল সাধন। নদীই সাধককে ভবপারে নিয়ে যায়। এর জন্য সাধকের পাঁচতত্ত্ব রপ্ত করতে হয়।
–কী এই পাঁচটি তত্ত্ব?
–বিবেক,জ্ঞান, সংযম, বৈরাগ্য আর ভক্তি। নদী পারাপারে এ তো লাগেই।
গানে নদী হাতড়ে হাতড়ে বেরানোর কথা বলা হয়েছে। অবোধ ঘন নদীকেই কেবল খুঁজে চলেছে। কিন্তু পদকর্তা বলছেন নদী খুঁজতে গেলে আগে হৃদয় রত্নাকরের মাঝে, যে অমূল্য রতন আছে তাকে খুঁজতে হবে। প্রশ্ন হল–হৃদয় রত্নাকর বলতে পদকর্তা কী বোঝাতে চাইছেন?
‘হৃদয় রত্নাকর’ হল অনাহত পদ্মচক্র। হৃদয়ে দ্বাদশদলের পদ্ম একটি। এই পদ্মের কর্ণিকামধ্যে অরুণবর্ণ সূর্যমণ্ডল এবং ধূম্রবর্ণ ষট্কোণবিশিষ্ট বায়ুমণ্ডল আছে। তাঁর একদিকে ধূম্রবর্ণ বায়ুবীজ যং আছে। এই বায়ুবীজের মধ্যে চতুর্ভুজ বায়ুদেব কৃষ্ণসাধিরোহণে অধিষ্ঠিত। তাঁর কোলে বরাভয়-লসিতা ত্রিনেত্রা সর্বালঙ্কারভূষিতা মুণ্ডমালাধরা পীতবর্ণা কাকিনী শক্তি বিরাজিতা। সাধককে এই বায়ুবীজকে জাগরিত করতে হয়। বায়ুপথ ঠিকঠাক প্রসারিত না হলে, হাওয়া না খেললে, দম ঠিক না হলে কখনওই বাউল সাধক নদীপথকে শাণিত বা চালিত করতে পারেন না। ভেতর নদীতে অন্তস্নান না হলে বাউল তিন রতির রসে, বাঁকা নদীতে অবগাহন করবেন কী রূপে! বাঁকা নদী তো আসলেই স্ত্রী জননাঙ্গের প্রতীক। নদীর বেগ হল বাউলের কামনা। বাউল সাধক বলেন। তাঁদের সাধনা হল গিয়ে পরকীয়া সাধনা। পরকীয়ার অর্থ তাঁরা করেন কিন্তু নিষ্কাম সাধনা। স্বকীয়া তাঁদের স্বকামের নামান্তর। তাঁদের মত গৃহী লোকের পথ এটি। বাউল স্বকীয়া থেকেই পরকীয়াতে যায়। পরকীয়া সাধনে মনকে তাঁরা মৃত প্রতিপন্ন করেন। অচঞ্চল মনকে তাঁরা মৃত হিসাবেই ঘোষণা করে থাকেন–’য চঞ্চলতাহীনং তন্মনো মৃতমুচ্যতে।‘
গানে ‘হৃদ্যে-রত্নাকরের’ মাঝে অমূল্য রতন আছে বলার অর্থই হল বায়ুকে চেনা-জানা, তার সঙ্গে বসতি করার কথা বলা। কেননা শ্বাসের কাজ রপ্ত না হলে নদীরূপী নাড়িও জাগবে না। অন্তস্নানও হবে না। আর বাঁকা নদীর পেছল ঘাটে দম আটকে পড়ে থাকতে হবে।
প্রবৃদ্ধ সাধক শশাঙ্কশেখর দাস বৈরাগ্য একবার আমায় বলেছিলেন, বুঝলে বাবা, সাধকের হল–বায়ুর ঘর বায়ুর বাড়ি বায়ু নিয়ে নাড়িচাড়ি। এই নাড়াচাড়া না হলে সাধক সিদ্ধ হবেন কোন প্রকারে শুনি?
বললেন, বায়ু কী জানো বাবা?
বললাম, কী?
–বায়ু হল বীজাবস্থা। শুদ্ধ চৈতন্য বায়ু। বায়ু না হলে শক্তিতত্ত্ব আর শিবতত্ত্ব জাগবে কীভাবে? এই শক্তি কোথা থেকে আসে জানো বাবা?
জিজ্ঞাসা করলাম, কোথা থেকে?
–মায়া থেকে বাবা।
–মায়া তো পাশ বলেন আপনারা? জিজ্ঞাসা করলাম।
–মায়া তো পাশই বাবা। মায়া মুক্ত হলে আসে শুদ্ধ মায়া। আর এই শুদ্ধ মায়া থেকেই শক্তি ও শিব জাগরিত হয়। যুগল নেয় সত্তা। মায়া হল শরীরের সব সৎ বৃত্তি। অসৎ কী জানো বাবা?
বললাম, আপনার চোখে অসৎ কী? আমি যে অর্থে অসৎ বলব তা হয়তো আপনার সঙ্গে মিলবে না।
বললেন, তা তুমি যে অর্থেই বল অসৎ আসলেই হল অনস্তিত্ব মন। মায়া যে সৎ বৃত্তি তার কারণ মায়া অস্তিত্বের প্রকাশ। মায়াকে শুদ্ধ মায়াতে আনতে হবে। শরীরকে, মনকে অনস্তিত্বের জায়গায় আনতে হবে। তবে না আনন্দশক্তির আত্মপ্রকাশ আসবে। ঘর কী?
বললাম, কী?
বললেন, ঘর হল গিয়ে দেহক্রিয়া। মূলাধারের অস্থি, স্বাধিষ্ঠানের মেদ, মণিপুরের মাংস, অনাহতের রক্ত, বিশুদ্ধের ত্বক আর আজ্ঞার মজ্জা নিয়ে ঘর গঠিত। ঘরকে আগে ক্রিয়াশীল করতে হবে। গুরুই তো ঘরকে দেখায়, চেনায়, জানায়।
খ্যাপাচাঁদের উৎসবে বাউল গিয়েছিলেন–’কারুর কথা না শুনিবি, শুনবি স্বগুরুর বচন। / তবে ঘরে বসি দিবানিশি করবি তাঁরে দরশন।‘
বাউলের এই দেখা, অনস্তিত্বের স্বীকৃতি, অন্তরাত্মার ভেতর মনের মানুষের আনাগোনা নিয়েই বাউলের পথ চলা।
দয়াল খ্যাপা বলেছিলেন, পথ কেমন?
–কেমন সে পথ? জিজ্ঞাসা করেছিলাম।
–পথ হল আনুগত্য। সব উজাড় করে দিলে তারে, তবেই পথ মেলে।
–পথচারী কারা?
জিজ্ঞাসা করলাম, কারা?
–নাড়ি, হৃদয়–এরা হল সব পথচারী। তাদের গুনগুন না শুনলে তুমি পথ পাবা না কোনওকালে। পথ হল ভোমরা। সদানন্দ ভোমরা।
ষষ্ঠী খ্যাপা একবার আমাকে বলেছিলেন, বাউলের পথ হল একতারা। তা খ্যাপা জানো কী এই একতারা?
— কি? জিজ্ঞাসা করেছিলাম।
বললেন, একতারা হল একতানে নিজেরে বেঁধে ফেলা। গানে। মানে।
আমি সেই মনের প্রজ্জ্বলিত ধ্বনি নিয়েই ভাবছি, বাউলের গান কতখানি আজ বাজতে পারে প্রতীকী সেই একতারায়? আমাদের মনে এখন মনেরই কৈশোর বার্ধক্যে উপনীত হয়ে বসে আছে। বাউলের দাউ দাউ আদর্শেও তো ঘুণ ধরেছে।
০১.৪ ফুলের লাগি কতজন হল বিরাগী
রামপ্রসাদের ভিটে লাগোয়া গৌরিপদ গঙ্গোপাধ্যায়ের বাড়ি। গতকাল জেঠিয়ার এক অনুষ্ঠান সেরে এখানেই এসে উঠেছেন কানাই বাউল। বেলপাহাড়িতে থাকেন তিনি। সে এলাকা রাজনৈতিক চাপানউতরে স্পর্শকাতর হিসাবে চিহ্নিত। তবে ওসবের খবর রাখেন না তিনি। আর কতদিনই বা তিনি সেখানে থাকেন। বীরভূমের বেদনাশা বটআশ্রমে যতবারই, যে সময়ে আমি গিয়েছি তাঁর দেখা পেয়েছি। এটা তাঁর গুরুর আশ্রম। ছোটখাটো চেহারার বয়স্ক মানুষটি এখানে থাকলেই বোধহয় ভাবগত তৃষ্ণাকে কিছুটা হলেও নিবারণ। করতে পারেন। কতবার তাঁকে দেখেছি গুরুর সমাধি মাটিতে পড়ে-পড়ে কাঁদতে। তবে শুধু তিনি নন, এ সাধন মাটি গায়ে মাথায় মাখতে, এমন কী মুখে দিতেও আমি অনেক বাউল সাধককে দেখেছি। নামকরা বাউল থেকে অচেনা বাউল অনেকেই খ্যাপা বাবার এই সাধনস্থলকে সিদ্ধপীঠ বলেই মনে করেন। এখানে এসে দু’দণ্ড বসেন, হাসেন, কাঁদেন, গান করেন, অরূপের স্পর্শ অনুভব করেন। তবে সকলেই যে খ্যাপার শিষ্য তা কিন্তু নন।
