ক্রিয়াযোগেই বাউল কামকে বশীভূত করে রাখেন। আলাপনের কথা আগেই বলেছি। ক্রিয়া শুরু হয় তা দিয়েই। এখানে চলে দৃষ্টিস্থাপন। তাঁরা একে ‘নেহার’ বলে থাকেন। স্থিরদৃষ্টি তাঁদের ‘আরোপ’। বহু বাউল গানে এর উল্লেখ আছে। এই অবস্থাতেই কুম্ভক শুরু করেন বাউল। কুম্ভকেই মিলন ক্রিয়ার মূল ভিত্তি। প্রাণ আর অপান বায়ুকে কুম্ভকের সাহায্যে মিলিয়ে দিয়ে ঊর্ধ্বগত হতে যান বাউল সাধক। এই সাধনা তাঁদের দম সাধনা।
সাধন দাস বৈরাগ্য একবার আমাকে বলেছিলেন, বাউল জীবন দমে শুরু দমে শেষ।
জিজ্ঞাসা করেছিলাম, দমক্রিয়া কি শুধু সঙ্গিনীর সঙ্গে দেহ মিলনের সময়ই করে থাকেন বাউল সাধক?
–তা কেন? দমেই তো শরীর গঠন। সঙ্গিনীর সঙ্গে মিলন না হলেও সাধক কি শুক্র ক্ষয় করেন কখনও? করেন না। দমেতেই তো শুক্র উপরে ওঠে। বিন্দুবীজকে তো দমেতেই সাধক শরীরে রেখেছেন।
জিজ্ঞাসা করেছিলাম, তাহলে চার চন্দ্রের সাধনা কি বাউল সারা জীবন করে করেন।
–সেইভাবে চারচন্দ্র সকল সাধক হয়তো করেন না। তবে বীজকে তো উধ্বগতি দেন সকলেই। না হলে আর সহজ সাধনাটা হল কী করে?
গোবিন্দ গোঁসাই বলেছেন: ‘রসিক ডুবুরি হলে/ ডুব দিয়ে সেই গভীর জলে/ অনায়াসে রত্নধন তোলে।’ বাউলের রত্নধন স্থিতাবস্থা। অভ্যাস-প্রণালীতে অটল হয়ে যাওয়া। বাউল বলেন: ‘টলে বীজ, অটলে ঈশ্বর, / টলাটল ত্যজ্য করে ভজে সেই রসিক শেখর।‘ রস তাঁদের সাধনার মূলবস্তু। রসই তাঁদের অপ্রাকৃত দেহধারী ভাবের মানুষে পরিণত করে রাখে। দ্বিদল পদ্মে বাউল বলেন ভাবের মানুষের দেখা পান। সাধক আর সাধন সঙ্গিনীর দুই আত্মা যখন এক হয়ে ওঠে দমক্রিয়ায় তখনই আজ্ঞাচক্রে এই পদ্ম। ফোটে। বাউল বিকশিত হন মনের মানুষ বা ভাবের মানুষে।
*****
নিয়ামতপুরে প্রতি সাত-ই বৈশাখ খ্যাপাচাঁদের স্মরণ-উৎসব হয়। সেই উপলক্ষ্যে বাউল গানের আসরও বসে। এই আসরেই রামনগরের রসিক ভক্তিদাস বাউলের একখানি গান শুনেছিলাম যেখানে সেই নদীর দখলদারিকেই আয়ত্ব করতে চাইছেন বাউল সাধক।
বাউল গাইছিলেন:
নদী নদী হাতড়ায়ে বেড়াও অবোধ মন!
মিছে ভ্রমেতে কর ভ্রমণ।।
তোমার হৃদয়-রত্নাকরের মাঝে,
আছে অমূল্য রতন।।
দেহে থাকতে সহজ মানুষ, ধরতে না পারে যে জন।
তাঁর বৃথাই জন্ম, নরের অধম, বিধাতারই বিড়ম্বন।।
কাঞ্চন ত্যাজিয়ে কেবা কাচেতে করে যতন।
যেমন স্বর্গ ত্যাজে ইচ্ছা করি নরকে করে গমন।।
যে যা বলে তারই কথায় দৌড়ে বেড়ায় ত্রিভুবন।
তোমার ঘরের মধ্যে বিরাজ করে বিশ্বজয়ী সনাতন।।
কারুর কথা না শুনিবি, শুনবি স্বগুরুর বচন।
তবে ঘরে বসি দিবানিশি করবি তারে দরশন।।
ছাড়বি না পাইলে রসিক, প্রেমিক, সুজন মহাজন।
ও তোর যে দিনে চৈতন্য হবে, লক্ষ্য করবি নিত্যধন।।
নিতাই দাস বাউলে বলে, শুনশুন সাধুজন।
কেন আত্মতীর্থ ত্যাজ্য করে মিছে তীর্থ পর্যটন।।
শাস্ত্রে বলা হয়েছে–’অন্তঃস্নানবিহীনস্য বহিঃস্নানেন কিং ফলম!’ অর্থাৎ অন্তস্নান বিহীন ব্যক্তির বাহ্যস্নানে কোনো ফল নেই। অন্তঃস্নান কীভাবে করা যায়? এই স্নান সম্পন্ন হয় গুরুর কৃপায়। গুরুই শিষ্যকে আত্মতীর্থ দর্শন করান। কোথায় রয়েছে এই তীর্থ? এই তীর্থ ভ্রদ্বয়ের মধ্যে অবস্থিত। আজ্ঞাপদ্মচক্র। দ্বিদলের পদ্ম। এই পদ্মের কর্ণিকাভ্যন্তরে শরচ্চন্দ্রের ন্যায় নির্মল শ্বেতবর্ণ ত্রিকোণমণ্ডল আছে। ত্রিকোণের তিন কোণে। সত্ত্ব, রজ, তম এই তিনগুণ এবং ত্রিগুণান্বিত ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও শিব এই তিন দেব আছেন। ত্রিকোণমণ্ডলের মধ্যে শুক্লবর্ণের চন্দ্ৰবীজ ঠং দীপ্তিমান হয়ে আছে। ত্রিকোণমণ্ডলের এক দিকে শ্বেতবর্ণ বিন্দু আছে। তাঁর পাশে চন্দ্ৰবীজ প্রতিপাদ্য বরাভয় শাসিত দ্বিভুজ দেববিশেষের কোলে জগন্নিধান-স্বরূপ শ্বেতবর্ণ দ্বিভুজ ত্রিনয়নের জ্ঞানদাতা শিব আছেন বলে সাধক কল্পনা করেন। তিনি এও কল্পনা করে থাকেন যে, দ্বাদশভূজা হাকিনী শক্তিরও বিকাশ এখানেই। আজ্ঞাচক্রের উপরেই ইড়া, পিঙ্গলা, সুষুম্না–এই তিন নাড়ির মিলন স্থান। এই স্থানের নাম ত্রিকূট বা ত্রিবেণী। ত্রিবেণীর উপরে সুষুম্না নাড়ির মুখের নীচে একটা অর্ধচন্দ্রাকার মণ্ডল আছে। অর্ধচন্দ্রের উপর তেজঃপুস্বরূপ একটি বিন্দু আছে। ওই বিন্দুর উপরে উধ্বাধোভাবে দণ্ডাকার নাদ আছে। এটি দেখতে অনেকটা দণ্ডায়মান তেজোরেখার মতন। এর উপরে শ্বেতবর্ণ একটি ত্রিকোণমণ্ডল অবস্থিত। তাঁর মধ্যে শক্তিরূপে শিবাকার হকারার্ধ্ব আছে। এখানেই বায়ুর ক্রিয়া শেষ হয়ে এসেছে। এই আজ্ঞাপদ্মকেই জ্ঞানপদ্ম বলা হয়ে থাকে। এর অধিষ্ঠাতা পরমাত্মা। ইচ্ছা তাঁর শক্তি। অষ্টশক্তির এক শক্তি। সাধক দেখেন এখানে প্রদীপ্তশিখারূপিণী আত্মজ্যোতি স্বর্ণরেণুর মতোই বিরাজমান। তিনি বলেন এই স্থানেই জ্যোতির্দর্শন হয়। যা হল সাধকের আত্মপ্রতিবিম্ব। এই পদ্মচক্রে ধ্যানে বসলে জ্যোতিঃদর্শন ঘটলে যোগের চরম ফল নির্বাণপ্রাপ্তি হয়।
সাধকে এই আত্মপ্রতিবিম্ব দর্শনই বাউল সাধকের কাছে রস-রতিকে উধ্বর্গত করে উচ্চস্থানে দ্বিদলপদ্মে নিয়ে যাওয়া। টল অটল নয়, একেবারেই সুটল হয়ে যাওয়া।
দয়াল খ্যাপা আমাকে বলেছিলেন, সাধক সাধনা করেন লিঙ্গ শাসনের। লিঙ্গতেই ব্রহ্মাণ্ড থাকে।
