জিজ্ঞাসা করলাম, কী এই মন্ত্র?
বললেন, কাম বীজ ক্লীং। ক্লীং কামদেবায় বিদ্বহে পুষ্পবাণায় ধীমহি তন্নো কৃষ্ণ প্রচোদ্দয়াৎ।
–এগুলো কী?
–সব হল কৃষ্ণবীজ। শরীরে কৃষ্ণ জাগানো।
রাধামন্ত্র জপের কথা একবার বলেছিলেন জগদীশ পণ্ডিতের শ্রীপাঠের সদানন্দ বাবাজি।
বললেন, কৃষ্ণই চৈতন্য। তাঁর বীজমন্ত্র হল–ক্লীং কৃষ্ণচৈতন্য নমঃ। রাধা হলেই কৃষ্ণ মেলে। রাধার বীজমন্ত্র তাই জপতে হয় সবসময়।
কী এই মন্ত্র? জিজ্ঞাসা করলাম।
বললেন, ওঁ শ্রীং হ্রীং রীং রাধিকায়ে স্বাহা। আর রাধিকারও গায়ত্ৰীমন্ত্র আছে। হল–ক্লীং রাধিকায়ৈ বিদ্বহে প্রেমরূপায় ধীমহি তন্নো রাধে প্রচোদ্দয়াৎ।
এগুলো সব হল গিয়ে আসলে রক্ষামন্ত্র। ঢিলাইচণ্ডীর সাধু পরিতোষ বাবা একবার আমায় দক্ষিণাকালীর বীজমন্ত্রের ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন।
বললেন, ওঁ ক্রীং ক্রীং ক্রীং হুং হুং হ্রীং হ্রীং দক্ষিণে কালিকে ক্রীং ক্রীং ক্রীং হুং হুং হ্রীং হ্রীং স্বাহা। ক্রীং হল বুঝলি রক্ষা কর। দক্ষিণা কালী আমার মস্তক রক্ষা করো। ক্রীং ক্রীং ক্রীং–এই ত্রিবীজরূপিণী খড়গধারিণী কালিকা আমার ললাট, হুং হুং বীজদ্বয়রূপিনী নেত্রযুগল, হ্রীং হ্রীং বীজদ্বয়রূপিনী আমার কর্ণযুগল রক্ষা করুন। এরপর বলা হয় স্বাহা বাঁ ফটু স্বাহা। বুঝিস এর মানে?
বললাম, আপনি বলুন?
–স্বাহা হল প্রণাম করা। লুটিয়ে পড়া। ফটু হল সর্বাঙ্গে। মানে কালী সারা দেহে বিরাজমান হও। এ হল গিয়ে সাধনের শক্তি।
ঠাকুর রামকৃষ্ণদেব প্রেমোন্মত্ত হয়ে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরকে বুঝিয়েছিলেন, ‘তাকে পাণ্ডিত্য দ্বারা বিচার করে জানা যায় না।
তবে কীভাবে তাকে জানা যায়? ঠাকুর গেয়েছিলেন:
কে জানে কালী কেমন?
ষড়দর্শনে না পায় দরশন।।
মূলাধারে সহস্রারে সদা যোগী করে মনন।
কালী পদ্মবনে হংস-সনে, হংসীরূপে করে রমণ।।
আত্মারামের আত্মা কালী প্রমাণ প্রণবের মতন।
তিনি ঘটে ঘটে বিরাজ করেন, ইচ্ছাময়ীর ইচ্ছা যেমন।।
মায়ের উদরে ব্রহ্মাণ্ড ভাণ্ড, প্রকাণ্ড তা জানো কেমন।
মহাকাল জেনেছেন কালীর মর্ম, অন্য কেবা জানে তেমন।।
প্রসাদ ভাষে লোকে হাসে, সন্তরণে সিন্ধু-তরণ।
আমার মন বুঝেছে প্রাণ বুঝে না ধরবে শশী হয়ে বামন।।
গান থামিয়ে ঠাকুর বিদ্যাসাগরকে বলেছিলেন, ‘দেখলে, কালীর উদরে ব্রহ্মাণ্ড ভাণ্ড প্রকাণ্ড তা জানো কেমন। আর বলছে, ষড়দর্শনে না পায় দরশন–পাণ্ডিত্যে তাকে পাওয়া যায় না।’
কালী শব্দটির যদি আমরা অর্থ করি তাহলে দাঁড়ায়: কালের সঙ্গে ঈ শক্তি যুক্ত হয়ে হয়েছেন কালী। ঈ হলেন ঈশ্বরী। কালী হচ্ছে আসলেই কালকে উপলব্ধ করার মহাশক্তি। কালীর যে রূপ শিবের বুকে পা দিয়ে জিভ বের করে থাকা, এর অর্থ হল কালী আদ্যাশক্তি হিসাবে পূজিতা। আদ্যাশক্তির অর্থ হল অদনময়ী। অদন মানে ভোগ। যা কিছু আমরা ভোগ করছি তা শুধু পঞ্চইন্দ্রিয় দিয়েই ভোগ করছি না, করছি সর্বাঙ্গ দিয়ে। ঠাকুর বলেছেন ষড়দর্শনে কালীকে জানা যায় না। সাধনার মূল আধারই তো ষড়রিপুকে ত্যাগ করা। বাউলও তো তাই বলেন। বলেন ষড়রিপুকে মারার কথা। তাঁরও তো রয়েছে পঞ্চভূত। যা শরীরস্থ চক্রে জাগিয়ে রাখেন দেহসাধক। বাউলের যে পঞ্চবাণ তা তো রিপু দমনেরই। নিক্ষেপ। এটাই তাঁর অঙ্গীভূত সাধনা। গোবিন্দ গোঁসাই এর যে গান নরোত্তম বাউল। আমাকে শুনিয়েছিলেন সেখানে ‘বিষম সে ত্রিপাণি নদী’র কথা বলেছেন পদকর্তা। তা যেমন তিন নাড়ি তেমনই তিন গুণও। তিন রস হিসাবেও কিন্তু তাকে চিহ্নিত করতে পারি। বাউল বলেন তিনদিনের কারণ-রসে তিন শক্তির আধিপত্য থাকে। প্রথমদিনে ব্রহ্মার, দ্বিতীয় দিনে বিষ্ণুর, তৃতীয় দিনে মহেশ্বরের। বহু বাউল গানেই এই প্রতীকময়তাকে দেখতে পাই। পদকর্তা বলেছেন: ‘ত্রিকোণ যন্ত্র পাতালভেদী / মধ্যে আছে মহা ঔষধি।’ ত্রিকোণ যন্ত্র হল গিয়ে সঙ্গিনীর যোনির অবয়ব। মহাঔষধি রজঃধারা। এই জল নিয়েই বাউলের কারবার। তাই বলা হয়েছে— ‘ওঠে ঘুরনো জল যদি না থাকে গুরুবল/ তবে খুলবে মণিকোঠা বাঁধবে ল্যাঠা/ সেখানে খুব খবরদার।‘ জল ওঠার অর্থ–সঙ্গিনীর সত্তায় রজঃরূপের যখন পূর্ণপ্রকাশ হয় তখন রজঃবীজ মস্তক থেকে নেমে এসে রজঃদ্বারে প্রবাহিত হতে থাকে। এই স্রোতপ্রবাহকে, জলকে সাধক গুরুবলেই নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন। গুরু সেই রজঃস্রোতে সাঁতার কাটতে শেখান। কিন্তু তা করতে গিয়ে মূলাধারের শুক্রের যদি নিয়ন্ত্রণ না থাকে, শুক্র নিম্নগামী হয়ে পড়ে তখন সাধন পথে বিপর্যয়। তাকেই ল্যাঠা হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছে গানে। নদীর ভিতর গরল-সুধা’র কথা বলেছেন পদকর্তা। যা আসলে প্রথম দিনের রজঃনাম হিসাবে চিহ্নিত। গরল পানের অর্থ হল গরল রসকে ওজে বা মিছরিতে পরিণত করে নেওয়া। গরল স্রোত থেকে কামকে তুলে প্রেমের জলধারাকে সাজিয়ে দেওয়া। আর এ ধারাকেই ‘উল্টো কল নেমেছে ঢল’ বলে চিহ্নিত করে দিয়েছেন গোবিন্দ গোঁসাই। তিন দিনের বারুণী স্নান’ হল–তিনদিনের রজঃযোগে অবগাহন। শাস্ত্রমতে চৈত্রমাসের কৃষ্ণ ত্রয়োদশী শতভিষা নক্ষত্র যুক্ত হলে এই শুভযোগ হয়। এই যোগে গঙ্গাস্নানে পূণ্য লাভ হয়ে থাকে বলে কথিত আছে। বাউলের এই যোগ অমাবস্যার তিথি পদকর্তা তাই বলেছেন: ‘তিন দিন বারুণী তাইতে স্নান শুনি / নাইলে সে মহাযোগে অনুরাগে / কাম-কুম্ভীর কি করবে তার।
