শিবশঙ্কর আমাকে বলেছিলেন, দম হল দমন রিপুকে, রতিকে দমন।
জিজ্ঞাসা করেছিলাম, দমই তো বাউল সিদ্ধির আসল কথা?
–তা ঠিক। তবে চন্দ্রভেদ অনেকটা মন্ত্রসিদ্ধির মতো। বাউলের জপ আর কী।
–বাউল তাহলে গুরুমন্ত্র জপেন?
–হ্যাঁ, আমাদের মন্ত্রজপ তো আছে।
–কী মন্ত্র?
–কৃষ্ণমন্ত্র।
বাউল তো মূর্তিতেই বিশ্বাস রাখেন না। সবই তাঁর জ্যান্ত তবে বাউল কৃষ্ণমন্ত্র। জপ করেন কেন? মজলিশপুরে বসে শশাঙ্কশেখর দাস বৈরাগ্যকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম।
বললেন, কৃষ্ণ অনুরাগ। প্রেমের অনুরাগ কৃষ্ণ। কামের বিরাগ কৃষ্ণ। শরীর কৃষ্ণ। ভাব কৃষ্ণ। দুইজনের মিলন কৃষ্ণ।
বললাম, সব তো কাম-গায়ত্রীর দিকেই যাচ্ছে?
–যাবেই তো। কাম হল ক্লীং। ক্লীং হল কৃষ্ণ। কামকৃষ্ণ। এই কামকৃষ্ণকে সাধক শুধু কৃষ্ণ করেন।
–কৃষ্ণ তাহলে কী? জিজ্ঞাসা করলাম।
–কৃষ্ণ হল আত্মাকে ত্যাগ করে পরমাত্মায় বিরাজ করা। কৃষ্ণ হল প্রাপ্তি। স্কুল শরীরের মৃত্যু কৃষ্ণপ্রাপ্তি। সিদ্ধ শরীরের দশা। কৃষ্ণলাভ।
গানে তিন দিনের লীলাখেলাকে তিন রঙ দিয়েছেন পদকর্তা–’একজন কালা একজন ধলা একজন লালমতী।‘ এই তিন রঙ প্রতীকী রজঃরং। ধারাস্রোতের যেমন নাম দিয়েছেন বাউল, তেমনই রজঃরঙের নামকরণ। তবে মতান্তরে চার রঙের কথা বলে থাকেন কোনো কোনো বাউল সাধক। ঢিলাইচণ্ডীর তান্ত্রিক সাধু বলেছিলেন নারী থাকে। মূলাধারে। পদকর্তা কমল বলেছেন: ‘মেয়ের গুণ কে বলতে পারে কিঞ্চিৎ জানেন মহেশ্বর / একজন শিরে একজন বুকে ধরেন পশুপতি।‘ মহেশ্বর এখানে শিবরূপী বাউল সাধক। ‘মেয়ের গুণ’ হল সাধনসঙ্গিনীর রজ নয়–তিন দিনের রজঃযোগ। সাধনক্রিয়া। কমল বলেছেন ‘মেয়ের গুণ’ শিরে ধরবার কথা। শির এখানে মস্তিষ্ক দ্যোতক হলেও আসলে তা সাধক শরীরের নবম পদ্মচক্র সহস্রার। ব্রহ্মরন্ধ্রের উপর মহাশূন্যে শ্বেতবর্ণের সহস্রদল পদ্মচক্রের কল্পনা করে থাকেন দেহসাধক। বলা হয় এখানে মাতৃকাবর্ণেরা আছে। এটি বৃহৎ শক্তিমণ্ডল হিসাবে কল্পনা করেন সাধক। কেননা মূলাধারের শুক্র প্রাণ-অপান বায়ুর সহযোগে প্রধানত তিন নাড়ির সাহায্যে ব্রহ্মরন্ধ্রে গিয়ে অবস্থান করে। এতে নাকি সাধক শরীরে তুরীয় দশার সৃষ্টি হয়। রজগুণেই মহাযোগক্রিয়ায় তা হয়ে থাকে। তাই পদকর্তা বলেছেন মেয়ের গুণ শিরে অধিষ্ঠান করবার কথা। মেয়ের গুণকে শিরে/ ব্রহ্মরন্ধ্রে ধারণ করার অর্থ সিদ্ধাসন লাভ। পরিতোষ বাবার মত নিলে সাধকের সিদ্ধ হয়ে ওঠা মেয়ের গুণ বুকে ধরার অর্থ দ্বাদশ পদ্মকে ধারণ। হৃদয়ে বন্ধুকপুষ্পসদৃশ বর্ণবিশিষ্ট দ্বাদশদলযুক্ত অনাহত চক্র আছে। এর বারোটি বৃত্তি মেয়ের গুণেই সাধক নাশ করতে পারেন। বৃত্তিগুলো: আশা, চিন্তা, চেষ্টা, মমতা, দম্ভ, বিকলতা, বিবেক, অহঙ্কার, লোলতা, কপটতা, বিতর্ক ও অনুতাপ। কীভাবে এইসব বৃত্তি নাশ হয়? কুলকুণ্ডলিনী জাগবার পর মণিপুরে এসে সেই শক্তিরূপী নারী বা এক্ষেত্রে পদকর্তা কথিত ‘মেয়ের গুণ’ যখন অনাহত পদ্মচক্রকে ফাটিয়ে বিশুদ্ধতে ঢুকতে যায় তখন এইসব বৃত্তি নাশ হয়। এগুলো সবই স্থূল শরীরের পাশ। অনাহতে এলে সাধক শরীরের স্থূলতা নষ্ট হতে থাকে না; একেবারে নষ্ট হয়ে যায়। তাই সাধক তখন মেয়ের গুণে বুকে পশুপতিকে ধরেন। অর্থাৎ তাঁর পশুত্ব বৃত্তি সব নাশ হয়ে যায়। কমল বলেছেন–রসিক মেয়ে থাকে ঘরের রসে জগত দেখে। এই রস সহজসত্তার বিকাশ। বাউলের মনের মানুষের শিরোপা। তার সাক্ষী হিসাবে পদকর্তা ‘গোপের মেয়ে গোকুলের সতী’র কথা বলেছেন। কারণ দেহসাধনাতে রাধাও শক্তি বিশেষত আদ্যাশক্তি হিসাবে বন্দি হয়েছেন। দেহের বিভিন্ন পদ্মচক্রে তাঁর গুণশক্তিকে উপলব্ধ করে থাকেন বাউল সাধক। রাধা সঙ্গিনী যেমন ঠিকই, তেমনই রাধা সাধনশক্তির দ্যোতক বলেই সাধক শরীরেও অবস্থান করেন এভাবেই প্রতীকময়তাতে। তাই রাধারূপী শরীরই ‘সতী হয়ে ধর্ম রাখে লয়ে উপপতি। মেয়ে হবার বাসনা প্রকাশ করেছেন পদকর্তা–’এবার মলে মেয়ে হব মহৎ সঙ্গ চেয়ে লব/ দাস কমল বলে থাকবে না তাঁর বংশে দিতে বাতি।‘ মরা কিন্তু এখানে দেহসাধকের ‘জেন্তে মরা’। জীবাত্মার বিনাশ হয়ে পরমাত্মার প্রকাশ। বাউল সাধনা, বাউলের গান সেই আলোকেই প্রকাশিত হতে চায়। বারবার।
*****
চৈতন্য বাউল আশ্রমে বসে নরোত্তম দাসের মুখে শুনেছিলাম নদীর আরেক বিজয়দুন্দুভি। ভরা বর্ষার প্যাচপ্যাচে কাদা নিয়ে সেদিন উপস্থিত হয়েছিলাম বাউল আশ্রমে। নরোত্তমের সঙ্গিনী পা ধোবার জল দিলেন প্রথমে। তখন চাঁদমারীর কাছে গঙ্গা ফুসছে। হরি বৈদ্য বাউল সে খবর দিয়ে দিয়েছেন আমাকে।
নরোত্তম বললেন, আজ ‘তালে নদী পেরোনোর একখানি গাই গাই।’
হরি বৈদ্যই একতারায় সুর দিলেন।
বাউল গাইলেন:
শ্রীরূপ-নদীটি অতি চমৎকার।
তোরে বলি সার, হৃদে কর বিচার,
দেখে ভব-গর্ত হলি মত্ত,
আস্বাদন কি বুঝলি তাঁর।।
বিষম সে ত্রিপানি নদী,
ত্রিকোণ যন্ত্র পাতালভেদী,
মধ্যে আছে মহা ঔষধি।
ওঠে ঘুরনো জল, যদি না থাকে গুরুবল,
তবে খুলবে মণিকোঠা, বাঁধবে ল্যাঠা,
সেখানে খুব খবরদার।।
নদীর ভিতর তলায় গরল-সুধা,
এক পাত্রেতে রহে সদা,
সুধা খেলে যায় ভব-ক্ষুধা।
গরল পান করে প্রাণেতে মরে,
ছুটে সেই উল্টো কল নেমেছে ঢল,
শিখতে হবে আপ্তসার।।
