চৌষট্টি কলার উল্লেখ আছে কামশাস্ত্রে। মিলনের সময় আলিঙ্গনাদিকে চৌষট্টি প্রকার হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছে—‘আলিঙ্গন-চুম্বন-নখচ্ছেদ্য-দর্শনচ্ছেদ্য-সম্বেশন সৌকৃত-পুরুষায়িতৌ-পরিষ্টকানাদ্মষ্টানমষ্টধা।’ আলিঙ্গন, চুম্বন, নখ দিয়ে আঘাত করা, দাঁত দিয়ে উত্তেজনা জাগানো, অঙ্গমর্দন করা, উত্তেজিত অবস্থাতে সাড়া দেওয়া, মিলন, চূড়ান্ত পর্বের পর স্থিতাবস্থা–এই আট প্রকার ভেদের প্রত্যেকটির আট ভাগের উপবিভাগ করে চৌষট্টি কলার কথা বলা হয়েছে। তবে একথারও উল্লেখ আছে যে, মিলনে সব সময়ই যে চৌষট্টিটি দশার সূত্রপাত ঘটবে এরকম কোনো কারণ নেই। বিশেষণ হিসাবে বলা হয়েছে সপ্তপর্ণ অর্থাৎ কিনা ছাতিম গাছের প্রত্যেক পল্লবেই যে সাতটি করে পাতা থাকবে বা পূজা সবসময় যে পঞ্চাপচারে হবে, এমন কোনো বাধ্যবাধকতা যেমন নেই তেমনই মিলনে যে সব সময় এই চৌষট্টিকলার প্রয়োগ ঘটবে এরও কোনো মানে নেই। পদাবলি আমাদের কিন্তু চৌষট্টি নায়িকার সন্ধান দিয়েছে। আবার আমরা চৌষট্টি রসের কীর্তনের সম্বন্ধেও কিন্তু অবহিত আছি। বৈষ্ণবীয় আচরণে চৌষট্টি প্রকার সেবারও উল্লেখ পাই। বৌদ্ধ-সহজিয়াতেও চৌষট্টি পাপড়ির পদ্মের কথা উল্লেখ আছে। আমাদের শরীরস্থ
যে সপ্তম পদ্মচক্র তাঁর দলকেও কিন্তু চৌষট্টিদল বিশিষ্ট হিসাবে দেখানো হয়েছে। বাউলও তাঁর গানে চৌষট্টির প্রতীককে সামনে এনেছেন। মানবদেহকে কোলকাতার সঙ্গে তুলনা করে পদকর্তা বলেছেন: ‘তাঁর বাইরে আলো ভিতরে আঁধার / মানবদেহ কলিকাতা অতি চমৎকার / চৌষট্টি গলির মাঝে ষোলোজন প্রহরী আছে / তিনশত ষাট নম্বরে হয় রাস্তা বাহাত্তর হাজার।’ চৌষট্টি গলি হল রক্তবাহী প্রধান ধমনী, তা সংখ্যারূপ। যেটা বলতে চাইছি তা হল: চৌষট্টির রূপক, প্রতীকী আবেগ-ইচ্ছা-অনুভূতি ব্যক্ত যে কুক্ষিগত আচরণ। তা অতি আবশ্যিক উপাচার। কখনও তা সুখদায়ক কামাচারের কখনও বা তা সাধিত অনুশাসনে আচ্ছন্ন দেহাচারের। আটটি ভাবের উল্লেখ আমরা পাই দেহসাধনায়–স্তম্ভ, স্বেদ, রোমাঞ্চ, স্বরভঙ্গ, বেপথু, বৈবর্ণ, মূৰ্ছা ও অশ্রু। অষ্টশক্তির কথাও বলে থাকেন সাধক। অণিমা, লঘিমা, ব্যাপ্তি, প্রকাম্য, মহিমা, ঈশিত্ব, বশিত্ব, কামবসায়িত। অষ্টপাশের কথাও বলে থাকেন সাধক বাউল–ঘৃণা, লজ্জা, শঙ্কা, ভয়, জিগীষা, জাতি, কুল, মান। এই অষ্টরূপকে কিন্তু আমরা কামশাস্ত্রেও দেখে থাকি। সেখানে ললাট, অলক, কপোল, নয়ন, বক্ষ, স্তন, ওষ্ঠ ও মুখের মধ্যে চুম্বনের উল্লেখ আছে। চৌষট্টিকলার একটি রূপ নখচ্ছেদ্য। তাকেও আবার আটটি স্থানে রাখা হয়েছে–বগল,স্তন, গলদেশ, পৃষ্ঠদেশ, জঘন, কটির একদেশ, কটির পুরোভাগ, নিতম্ব–এই আট স্থানে নায়কের নখক্ষত সৃষ্টির কথা বলা হয়েছে। বাউল কিন্তু অষ্টম ইন্দু বা অষ্টম চন্দ্ৰস্পর্শের কথা বলে থাকেন। তাহলে এই আটের ব্যবহার দু’ধারায় আছে। সুখদায়ক কামাচারেও রয়েছে আটের বহুরূপী প্রতিফলন। আবার সাধনাচারের আট চেতনাসম্পৃক্ত এক অধ্যায়। এই চেতনা কামকে প্রেমে সমুজ্জ্বল ও ঋদ্ধ করে নিয়ে আত্মাকে সংগৃহীত পরমাত্মার সঙ্গেই মিলিয়ে দেওয়া। বাউল সাধনে এ যেন এক শৌর্য প্রদর্শন। তন্ত্র তথা সমস্ত যুগল দেহসাধনার সম্মিলিত চেতনা, আশা, উদ্বেগ, প্রেরণা, প্রতিজ্ঞা, প্রার্থনা–এগুলো সবই দাউ দাউ আদর্শের গহন শিখা।
শিবশঙ্কর গানে ‘ত্রিবেণী সংহতি’কে তিন রতির উর্ধ্বাঙ্গই দিয়েছেন। তিন রতি, তিন নদীরূপী স্রোতধারা, বাউল প্রতীকের ‘রূপ সায়রের তিনধারা’। প্রথম দিনের মিলনে বাউল বলেন গুণের মানুষ উঠে আসবে। এই গুণ তমগুণ। দ্বিতীয় দিনে রসের মানুষ। তৃতীয় দিনে সহজ মানুষ। বাউল বলেছেন: ‘যখন নদী হয় উথলা তিনজন মেয়ের লীলাখেলা।’ কীভাবে হয় এই লীলাখেলা?
চৈতন্যচরিতামৃতে বাউলের তিন রতিকে তিন বাঞ্ছা হিসাবে দেখা হয়েছে। বলা হয়েছে: ‘তিন বাঞ্ছ পুণ্য করি রস আস্বাদন।।/ আলিঙ্গনে ভাব পুণ্য কান্তিতে চুম্বন। / সিঙ্গারে প্রেমরস বাঞ্ছিতপূরণ।।/ পিরিতি আনন্দময় চিন্ময় কেবল। / সেইভাবে বস হইয়া করে সম্বল।।/ নিজরূপে স্বয়ং রূপে এক রূপ হয়। / এক দেহ সে জানিহ নিশ্চয়/ নিজরূপে সঅং রূপ এক দেহ হয়। গোলোক বৃন্দাবন বলি অতএব কয়।’ বাউলের এই লীলাখেলাতে প্রথম চারচন্দ্র ভেদ করতে হয়। সঙ্গিনীর রজ গুরু যোগাড় করে রাখেন। তা সাধক বাউলকে পান করতে হয়। কেউ বলেন সঙ্গিনী নিজে তা পান করেন। আবার কেউ বলেন না, সঙ্গিনীর কাজ তা নয়। পান করে থাকেন কেবল সাধক বাউল, যথেষ্ট মতভেদ আছে এই ক্রিয়াকরণে। এই পান ক্রিয়াকে তাঁরা বলেন গ্রহণ। অর্থাৎ শরীরের জিনিস শরীরেতে ফিরিয়ে নেওয়া। এটাই তাঁদের ভেদ। চার চন্দ্রের একচন্দ্র ভেদ। তারপর মূত্র যতবার হবে তা নারকেল মালা বা পাত্রে ধরে আবার শরীরে ফিরিয়ে আনা। মল হাতের তালুতে ফেটে খাওয়া আর বাকিটা শরীরে মাখা। এই চারচন্দ্র ভেদকে বাউল ব্রহ্মচর্যদশা বলেন। এরপরই মিলন দশা আসে। তবে ব্রহ্মচর্যে কতদিন পর রসরতির মিলন হবে তা নিয়েও যথেষ্ট মত পার্থক্য আছে। কেউ এক মাস, ছ মাস, দশ বা বারো মাসের কালক্ষেপের কথা বলেন। তবে সেই অপেক্ষা-যোগ এখন এতখানি সময় পর্যন্ত মানা হয় কিনা তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। কেননা বাউলকে তো এখন তাড়াতাড়ি সিদ্ধ স্তরে পৌঁছতে হবে। তবে না তাঁর পসার জমবে। ভক্তশিষ্য তৈরি হবে। খ্যাতি রটবে। যেটা মনে হয় চারচন্দ্র ভেদ একটা নিমিত্তকরণ। আসলে যে করণকার্য তা তো নাড়ির। ইড়া নাড়ির, পিঙ্গলা নাড়ির, সুষুম্না নাড়ির। শরীরের বাইরের বায়ুকে প্রথমে বাঁ নাক দিয়ে টেনে কিছুক্ষণ সেই বায়ু বাঁ নাকে রেখে তাকে আবার ডান নাকে ফিরিয়ে নেওয়া হয়। বায়ু যখন টেনে অভ্যন্তর পূরণ করা হয় তখন তা পূরক। এতে উদর জলপূর্ণ কলসির মতো বায়ু জমা থাকে তাই তা কুম্ভক আর যখন তা ডান নাক দিয়ে বের করে দেওয়া হয় তখন তা রেচক। এই যোগশিক্ষাই বাউল সাধককে ক্রিয়াকরণে আসলে সাহায্য করে। মিলনে এর সাহায্যেই বাউল মূলাধারের শুক্রকে ব্রহ্মরন্ধ্রে উঠিয়ে নিতে পারেন। তাই চারচন্দ্র ভেদ না হয় হল কিন্তু শ্বাসক্রিয়া ঠিকঠাক না হলে শুধু চারচন্দ্র ভেদ, ব্রহ্মচর্যের দীক্ষার কি মূল্য আছে? আসল হল শরীর গঠন। তা ভেদে হয় ঠিক কিন্তু সেই ভেদ বায়ুভেদ বায়ুকেই বশ করেন সাধক। তবে বাউল ‘দমের কাজ’ করার কথা সব সময়ই বলেন।
