ত্রিপানিতে তিনটি ধারা,
নিধারাতে আছে ধরা,
ঠিক রেখ নয়নের তারা।
পলকে প্রলয়, হয়ে যাবি ক্ষয়,
স্থূলে মূলে সকল ভুলে
করতে হবে হাহাকার।।
বাঁকা নদীর পেছল ঘাটে
যেতে হবে নিষ্কপটে
সাধুবাক্য ধরে এঁটে।
তিনদিন বারুণী, তাইতে স্নান শুনি,
নাইলে সে মহাযোগে অনুরাগে,
কাম-কুম্ভীর কি করবে তার।।
রসিক ডুবুরি হলে,
ডুব দিয়ে সেই গভীর জলে,
অনায়াসে রত্নধন তোলে।
গোঁসাই গোবিন কয়,কুবীরচাঁদের জয়,
ভেবে গোপাল মূর্খ, পায় রে দুঃখ,
দিনে দেখে অন্ধকার।।
শ্রীরূপ-নদী নারীর শ্রী-মণ্ডিত বিভা নিয়েই গোবিন্দ গোঁসাইয়ের গানে যেন উঠে এসেছে। শ্রী এখানে নারীর অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের নয়। শ্রী তার রজঃপ্রবাহের স্রোতধারার। এই শ্রীরূপ-নদীটিকে হৃদয় দিয়ে বিচার করার কথা বলা হয়েছে গানে। হৃদয় হল পূর্ণচন্দ্রের। হৃদয়। নারীর রজঃপ্রবৃত্তি হল বাউল সাধকের অমাবস্যা-যোগ। এই অমাবস্যা এই কারণেই, এ সময় সঙ্গিনীর শরীরে অন্ধকারময় কামের ঘনঘটা দেখা দেয়। আর তার ভেতরই পূর্ণচন্দ্রের উদয় হয়। পূর্ণচন্দ্র প্রেম। কামকে বাউল প্রেমে রূপান্তরিত করে নেন। অধর মানুষ হয়ে ওঠেন তিনি। সহস্রারে অটল রূপে বিরাজ করেন তিনি। তাঁর জন্যই শ্রী রূপ নদীতে অবগাহন। পদে বলা হয়েছে: ‘দেখে ভব-গর্ত হলি মত্ত/ আস্বাদন কি বুঝলি তার।’ ভব-গর্ত হল সঙ্গিনীর যোনি। ভব কথার অর্থ জন্ম বাঁ উৎপত্তি। সত্তা, স্থিতি, ইহলোক হিসাবেও ‘ভব’কে আমরা দেখতে পারি। রজঃস্রোতের উৎপত্তিকেই এখানে ভব-গর্ত হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছে। রজঃবীজকে বাউল সত্তা হিসাবে মানেন। জীবের স্থিতি রজঃপ্রবাহেই আসে। এর আস্বাদন না বোঝার কথাই বলা হয়েছে। কারণ ভবগর্তে নিরবচ্ছিন্ন কামাচার বাউল সাধকের উদ্দেশ্যে কখনও নয়। বাউল সাধনার মুখ্য বিষয় তিন দিনের ক্রিয়া ও শেষে বিশেষ ক্রিয়া। যোগ-মিলনের আগে দুই পর্ব আছে। নামগ্রহণ আর ভাবগ্রহণ প্রবীণ সাধক দয়াল খ্যাপা এ কথা বলেছিলেন আমাকে।
মদনমোহন আশ্রমে বসে দয়ালকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম দেহ মিলনের যোগক্রিয়ার কথা।
বললেন, প্রথমে গুরু নাম দেন। গুরুমন্ত্র জপতে জপতেই শরীর সেই মন্ত্রভাবকে টেনে নেয়। ভাব এলেই ক্রিয়াকরণ শুরু হয়। চারচন্দ্র তো আগে থেকেই নিয়ম করে পালন করতে হয়।
খুব জরুরি কি চারচন্দ্রের ক্রিয়া? জিজ্ঞাসা করলাম।
–অবশ্যই। চারচন্দ্র শরীরকে উপযোগী করে। দম ধরতে সাহায্য করে গিয়ে ওই চারচন্দ্র। এই আমার নিরোগ সুঠাম শরীর নিয়মিত চার চন্দ্র সাধনের ফল।
–আপনি কি এখনও এই ক্রিয়াযোগ করেন? মল, মূত্র শরীরে ফিরিয়ে নেন?
বললেন, এ বিষয়ে তো বলে বোঝানো যাবে না বাবা। গুরু শিষ্যকে শ্বাস নিয়ন্ত্রণ শেখান। এই ক্রিয়া আটবার, বত্রিশবার–এই করে করে রপ্ত করে নিতে হয়। রেচক, পূরক, কুম্ভক করতে হয়। কুম্ভক নাড়ি শোধন করে বাবা। বিন্দুকে স্থিরতা দেয় শরীরে।
গানে যে আস্বাদনের কথা বলা হয়েছে তা হচ্ছে বিন্দুধারণের স্থিরতা। বাউল সাধক বলে থাকেন কুম্ভক ক্রিয়াতে এই শক্তি অর্জিত হয়। বায়ুর সাম্যতা রাখে কুম্ভক ক্রিয়া। মূল-সাধনা বাউলের ধরে রাখে কুম্ভক ক্রিয়াই। প্রথমে যেটা করতে হয় শরীরের বাইরে বায়ুকে বাঁ নাকে টেনে নিতে হয়। প্রাণ বায়ু এতে শরীরের ভেতর প্রবেশ করে। এই জমা বায়ুকে ডান নাকে নিয়ে কিছু সময় রেখে দিয়ে তাকে আবার বাঁ নাকেই ত্যাগ করে দেন দেহসাধক। বাইরের বায়ুকে টেনে শরীরের অভ্যন্তরভাগ পূরণ করাই হল বাউলের পূরক। আর বায়ু যে এভাবে শরীরে ধারণ করে রাখা; শরীরকে বায়ু ভরিয়ে পূর্ণ করে রাখা। তা হল তাঁদের কুম্ভক। আবার বায়ুকে বাইরে বের করে দেওয়া বাউলের রেচক। মূলত দুই বায়ুর ক্রিয়া ইহা। সাধুসন্তরা বলেন প্রথমে ডান হাতের আঙুল দিয়ে ডান দিকের নাকে বায়ুকে রোধ করে ওঁ বা যার যার গুরুমন্ত্র ষোলো বার জপ করতে করতে বাঁ নাকের সাহায্যে বায়ুকে ভেতরে এনে কনিষ্ঠা ও অনামিকা আঙুল দিয়ে বাঁ নাকে রেখে বায়ুরোধে। ওঁ বা গুরুমন্ত্র চৌষট্টিবার জপ করতে করতে কুম্ভক করতে হবে। তারপর আঙুল ডান নাক থেকে তুলে মন্ত্র বত্রিশবার জপ করতে করতে ডান নাকে এনে বায়ু রেচক করতে হবে। এইভাবেই পুনরায় বিপরীতক্রমে অর্থাৎ শ্বাসত্যাগের পর এই ডান নাকের সাহায্যে মন্ত্র। জপ করতে করতে পূরক এবং দুই নাকে কুম্ভক, শেষে বাঁ নাকে রেচক করতে হবে। আবার প্রথমবারের মতো অবিকল দু নাকের সাহায্যে পূরক, কুম্ভক, রেচক করতে হবে। বাউল বলেন কুম্ভক শক্তির উপরই তাঁদের বাণক্রিয়া নির্ভর করে। দেহ মিলনের সময় মদন, মাদন, শোষণ, স্তম্ভন, সম্মোহন–এই পঞ্চবাণের ক্রিয়ার কথা বলে থাকেন বাউল সাধক। লালনের গানে আমরা পাই—’পঞ্চবাণের ছিলা কেটে/ প্রেম যজ স্বরূপের হাটে। সিরাজসাঁই বলে রে, লালন, / বৈদিক বাণে করিস নে রণ, / বাণ হারায়ে পড়বি তখন রণ-খোলাতে হুবড়ি খেয়ে।।’
‘বৈদিক বাণ’ কী? দেহমিলনের সময় কামই কামের একান্ত পরিনাম। কামকে উপভোগ্য স্তরে নিয়ে যাবার জন্যই নরনারী নানা প্রত্যঙ্গে নানারূপ ক্রিয়াকরণে মেতে ওঠেন। কেননা কামকে তাঁরা চুড়ান্ত রূপে ভোগ করতে চান। তার জন্যই কামশাস্ত্রে যৌনমিলনের প্রস্তুতিস্বরূপ নানা আলিঙ্গন, চুম্বন, দেহে নখচিহ্নের স্মরণীক অধ্যায়, দন্তক্ষতের রূপকল্প, ভঙ্গি বা আসন, শীৎকার ধ্বনির নানা রূপের কৌশলক্রিয়ার কথা লেখা হয়েছে। যাতে কাম, সম্ভোগক্রিয়া একেবারে উত্তেজক অধ্যায়ে চলে আসে। নরনারী তৃপ্তি লাভ করেন। বাস্তবিক এই তৃপ্তি। রিপুর উত্তেজনা থেকেই এই আকর্ষণ, মিলন। যে মিলনে তৃপ্তির সাথে সন্তান জন্মেরো এক বিধিবদ্ধ অধ্যায় আছে। তাই বলা ভালো, এই কাম-প্রবর্তিত দেহ-মিলন এবং এতে সন্তান সৃষ্টিই হল বৈদিক বাণ। লালনের গানে এই বাণকৌশলের ইঙ্গিত রয়েছে। বাউল বলেন, বিশ্বাস রাখেন যে, এই পঞ্চবাণের যে ক্রিয়া তাতে রয়েছে কেবল চূড়ান্ত সম্ভোগক্রিয়ায় কামকে উপভোগ। এই কাম ভোগমূলক। লালনের পদে, গুরু সিরাজ সাঁই তাই লালনকে বলছেনেই পঞ্চবাণের ছিলা কেটে ফেলতে হবে। দেহকে কামক্রিয়ার ভেতর না রেখে দেহকে ব্যবহার করতে হবে স্বরূপতত্ত্বকে জানার জন্য। তার জন্যই বাউল সাধক দেহ থেকে কামকে তুলে ফেলে প্রেমে রূপান্তরিত করে ফেলেন। ঠিক যেমন দুধ থেকে সর তুলে মাখন বা ঘি বানানো হয়। কীভাবে বাউল সাধক এই পঞ্চবাণের ছিলা কেটে ফেলেন?
