পাঁচ পিড়িতে বসে শিবশঙ্কর গাইছিলেন তিনটি ধারার সঙ্গম স্থল ত্রিবেণীর গান। নারীকে বাউল নদীর প্রতীক দিয়েছেন। যোনি বা জননাঙ্গ হল নারী দেহের নদী। তাঁর স্রোতপ্রবাহ রজঃপ্রবৃত্তির সমাচ্ছন্নতা। বাউল সাধনা রস-রতির মিলন। সাধনমার্গে এই মিলন আত্মার সঙ্গে আত্মার। রজের সঙ্গে বীর্যের নয়। দুই আত্মা বা সাধন শরীরের একত্র মিলনে জন্ম হয় পরমাত্মার। বাউল বলেন তাঁদের সিদ্ধদশার করনকারণ তিনদিনের। সঙ্গিনীর শরীরে রজ-উদয়ের সময়কে তারা অমাবস্যা হিসাবে চিহ্নিত করে থাকেন। ওই দিনে সঙ্গিনীর শরীরে তমগুণের বিকাশ ঘটে। তম হল তামসিক ভাব। অজ্ঞানতা। এই অজ্ঞানতা কামের বশীভূত দশা আসলে। সঙ্গিনীর এই কামের মত্ততাকে সাধক বাউল বলেন ‘জীবাচার’। জীবাচারের ঊর্ধ্বে উঠে যেতে চান তারা। তাই তারা বলেন প্রকৃতি বা সঙ্গিনীর অন্তর্নিহিত সত্তাই হল রজ। পুরুষের বীর্য বা বীজ। এর মিলনে তাঁরা বিশ্বাসী। তাই জন্যই তাঁদের দেহসাধনা। কেননা তাঁদের মিলন জীবাচারের কখনও নয়–জীবাচারের মিলনে রজবীজের মিলন ঘটে দেহের ভিতরে।
প্রাজ্ঞ বাউল শশাঙ্কশেখর একবার আমায় বলেছিলেন, পুরুষ পুরুষ তো নয়।
জিজ্ঞাসা করেছিলাম, পুরুষ তাহলে কে?
বললেন, পুরুষ বীর্য। আর রজ হল নারী। যোনি-লিঙ্গ তাকে নারী-পুরুষ হিসাবে দেখে ঠিকই। আসলে নারী-পুরুষ কেউই তারা নয়, সবাই একেকজন হিজড়া।
জিজ্ঞাসা করলাম, কী হিসাবে একথা বলছেন আপনি?
–দুই দেহেই বাবা রজ-বীর্য থাকে। তাহলে দাঁড়ায় কী না তাঁরা ছেলে, না মেয়ে। সাধনই বাবা হিজড়াকে নারী বা পুরুষের রূপে এনে দেয়।
–কীভাবে আনে?
–তোমার দেহের উর্ধ্বচক্রে বীহ আছে। নিম্নে রজ। স্রোতধারা যে বয় মৈথুনে, ঊধ্বচক্রের বীজ নীচে নামে। বীজ তখন রজ হয়। সাধক রজকে রজর সঙ্গে মিশায় না কখনও। আবারও উর্ধ্বে তুলে বীজ করে দেয়। এভাবে সাধক সিদ্ধ হয়। পুরুষ হয়। অটল হয়।
ঢিলাইচণ্ডীর তান্ত্রিক সাধু পরিতোষ বাবা একবার বলেছিলেন আমায়, তোর দেহে নারী আছে তুই জানিস? সবার দেহে নারী থাকে। পুরুষ থাকে।
কীভাবে থাকে তা বাবা? জিজ্ঞাসা করেছিলাম।
বললেন, নারী থাকে মূলাধারে। পুরুষ সহস্ৰারে। সাধক সিদ্ধ হলে সহস্রারে কুণ্ডলিনী উঠে যায়। এই শক্তি নারীশক্তি। মূলাধারের সুপ্ত কুণ্ডলিনী সহস্রারে এসে শক্তির সৃষ্টি করে রে। যখন তা সহস্রারে এল তখন সে পুরুষ হল। তাঁর আগে শক্তির নারীর বেশ। আমরা তাই তো বলি নারীশক্তি। পুরুষ শক্তি বলি কখনও?
আমি চুপ।
বাবা বলছেন, সাধনা শুরু হয় নারীতে-নারীতে। সাধক সিদ্ধ হল পুরুষ হয়ে। বীজ ধরে। আর সাধিকার নারীরূপ চিন্ময় হয়। এই যে দেখছিস কালী মা, মা, মাগো… এই মা মৃন্ময় মা চিন্ময় হয় ভৈরবীর শরীরে। জ্যান্ত শিব মা তৈরি করে নারী ছাড়া সাধন হয়? জীবনেও বউ ছাড়া তুই পুরুষ নোস। নারী, বউই তো পুরুষ করে। প্রাণ আনে তোর বউ তোকে সাহায্য করে তোর বউ তোকে পুরুষ করে দিয়ে সে নারী হয়ে ওঠে। তাই তো তাঁর মাতৃরূপ সেই তো আমার মা। মা না থাকলে শালা সব অন্ধকার রে।
মা মা বলে চিৎকার করছেন পরিতোষ বাবা। ঢিলাইচণ্ডীতে মায়ের আজ অমাবস্যার পুজো। বাবা সকাল থেকেই যোগাড়ে লেগেছেন তাঁর। ভক্তশিষ্য গমগম করছে আশ্রমে ভক্তিতে আর বাবার কথায় মাতোয়ারা হচ্ছে সবাই।
*****
শিবশঙ্কর বলেছেন: ‘মেয়ে গঙ্গা যমুনা সরস্বতী/ মাসে মাসে জোয়ার আসে ত্রিবেণী সংহতি।’
সঙ্গিনীকে এই রূপক পরিয়েছেন পদকর্তা সাধক। ত্রিবেণী বাউলের তিন রতি। তিনদিনের রজঃপ্রবাহকে বাউল তাই তিন নামেই চিহ্নিত করেছেন। কারুণ্যামৃত, তারুণ্যামৃত, লাবণ্যামৃত। তিন ধারার এই নামও অর্থদ্যোতক। প্রথম ধারায় সঙ্গিনীর শরীরের কামস্রোতকে সাধক বাউল সদর্থক দিকে চালিত করেন।
ষষ্ঠীখ্যাপা একবার বলেছিলেন, বাউল কাম মারে। মানুষ কাম তোলে।
জীবাচারে আবদ্ধ যেহেতু মানুষ তাই তাঁরা কামকে উপভোগ করেন। আমাদের কামশাস্ত্র সেই কামোপভোগকে সুন্দর সব ধারাভাষ্যেই চালিত করেছে। আর তা করতে গিয়ে পুরুষ বিভাগ এসেছে—‘শশো বৃষোহশ্ব ইতি লিঙ্গতো নায়কবিশেষাঃ।’ পুরুষের লিঙ্গমাপ অনুসারে তাকে শশ, বৃষ ও অশ্ব–এই তিনভাগে ভাগ করা হয়। যেসব পুরুষের লিঙ্গের দৈর্ঘ্য ছোট তাদের শশকের রূপ দেওয়া হচ্ছে। মধ্যম লিঙ্গ ধারণের অধিকারী পুরুষ বৃষ। আর দৈর্ঘ্যের দিক থেকে বারো আঙুল পরিমাপক যে লিঙ্গ ধারণের অধিকারী পুরুষ তিনি অশ্ব শ্রেণির বাৎস্যায়ন এখানে বোধহয় যথেষ্ট বাড়াবাড়ি করে ফেলেছেন লিঙ্গ পরিমাপক স্যাংখ্যিক হিসাব আনতে। শশ = ছয়, বৃষ = নয়, অশ্ব = বারো। আদতে শেষ দুটো যথেষ্ট রকম বাড়াবাড়ির। পর্ণগ্রাফি এই মাপকে অবশ্য গ্রহণ করে মনোরঞ্জন করছে। আপাতত। নীল ছবিতে তাই এখন ঠাঁই হয়েছে বাৎস্যায়নের বৃষ ও অশ্ব পুরুষের। নারীর তিনটি ভাগ হল–‘নায়িকা পুনমৃগী বড়বা হস্তিনী চেতি।’ নায়িকাও আবার পশুদের সঙ্গে উপমা অনুসারে তিন ধরণের হয়ে থাকে–মৃগী, বড়বা বা ঘোটকী, হস্তিনী। পুরুষের। লিঙ্গের দৈর্ঘ্য অনুসারে ভেদ-সূচিত তিন প্রকারের পুরুষ আর নারীর এই পরিমাপকে যোনির সেই ছয়, আট, বারো আঙুল মাপকেই সামনে আনা হয়েছে। চওড়াতে তাকে স্যাংখ্যিক পরিমাপকের আধার দেওয়া হয়েছে। মিলনে সুখদায়ক অনুভূতির জন্যই কামশাস্ত্রের নির্দেশিকা সব। সেজন্যই শশ শ্রেণীর পুরুষের সঙ্গে মৃগী, বৃষর সঙ্গে বড়বা, অশ্বর সঙ্গে হস্তিনীর মিলন বেঁধে দেওয়া হয়েছে। নারীদের ক্ষেত্রেও শেষ দুই শ্রেণীর বিভাজনকে নীল ছবি পুরোপুরি গ্রহণ করেছে।
