শিবশঙ্কর বললেন, দেখেন খ্যাপা, গাছ-লতা সব কেমন হাসছে। জল হল গিয়ে খ্যাপা আশ্রয়। মানুষের, পশু-পাখির, গাছ-লতার। বাউল তো তাই জলসাধনা করে। জলের জন্যই তো তার আকুতি। প্রাণপাত। তাই তো নদীর ঘাটে যাওয়া খ্যাপা।
একতারা তুলে নিলেন বাউল। বললেন, জলের একখানা গান গাই খ্যাপা। বোঝেন খ্যাপা, জল কী করে, কীভাবে করে।
গাইতে থাকলেন বাউল চিরপরিচিত সেই গান। তার গানে পাঁচ পিড়িতে মানুষ ভিজছে যেন। শীতল হচ্ছে মন।
গাইছেন বাউল:
মেয়ে গঙ্গা যমুনা সরস্বতী
মাসে মাসে জোয়ার আসে ত্রিবেণী সংহতি।
যখন নদী হয় উতলা তিনজন মেয়ের লীলাখেলা
একজন কালা একজন ধলা একজনা লালমতী।
মেয়ের গুণ কে বলতে পারে কিঞ্চিৎ জানেন মহেশ্বরে
একজন শিরে একজন বুকে ধরেন পশুপতি
রসিক মেয়ে থাকে ঘরে ঘরের রসের জগৎ দেখে
তার সাক্ষী আছে গোপের মেয়ে গোকুলের সতী–
সতী হয়ে ধর্ম রাখে লয়ে উপপতি।
এবার মলে মেয়ে হব মহৎ সঙ্গ চেয়ে লব
দাস কমল বলে থাকবে না তার বংশে দিতে বাতি।।
মেয়ে গঙ্গা যমুনা সরস্বতী।
বাউল বললেন, মেয়ে হল খ্যাপা, ভবনদী। সাধক বাউল মেয়ে ধরেই পরপারে যান। মেয়ে রতি নিয়ে জন্মায় বলেই বাউল তার ধারা পায়। রজঃধারা কি পুরুষ শরীরে বয়? রতি হল অনুরাগ।
জিজ্ঞাসা করলাম, কীসের অনুরাগ?
–প্রেমের, রাগের, ভাবের সে অনুরাগ শরীরে হয়। বাউল নদীর ভাবেই ভবনদী পার হয় নারী কী এমনি-এমনি নদী খ্যাপা? নদীর ভাবেই সাধকের মহাভাব হয়।
–রতিকে তো আপনারা রসও বলেন?
–রসই তো। তিন নদীর তিন ধারার রসে বাউল স্নান করে। হাবুডুবু খায়। পরে যারা যায় তারা ভবনদী থেকে মহাভাবখানা তুলে নেয়। সাধক তো নৌকা খ্যাপা। নদীর উজানে বায়।
আসাননগরে বসে বাঙালঝির মোজাম্মেল ফকিরের গলাতে শুনেছিলাম এমনই এক নৌকার গান। ধরা বিকেলে লালন মেলায় রং লাগেনি তখনো। দুই বাংলার একত্র হাওয়ায় মোজাম্মেলের কথা ছড়িয়ে পড়ছে চারধারে। তার পাশে বসে চুপ করে শুনছি আর ভাবছি বাউল-ফকিরদের প্রক্ষেপণগুলো এক হয়ে গিয়েছে কোথাও সহজিয়া প্রেরণায়। হাটে-মাঠে-গঞ্জে সহজিয়া প্রবচন এখনো এই অস্বাচ্ছন্দ্যের সুরে কী ভীষণ শরিক
সংগতির সুরকে একত্র করে রাখছে খসে পড়ছে সব ভেদাভেদের দেওয়াল।
মোজাম্মেল গাইছেন:
নৌকা বাইও সাবধান হইয়ারে মাঝি ভাই–
বাইও সাবধান হইয়া।
আল্লাহ নবীর নামরে মাঝি ভাই স্মরণ রাখিয়া।
তিন তক্তারি নৌকারে মাঝি ভাই মধ্যে জোড়া
বিপাকে পড়িলেরে মাঝি ভাই নৌকা যাবে মারা।
বাতাসে চালায় রে নৌকা আজবও গঠন
গলইয়ে ভরিয়া রে দিছে অমূল্য রতন।
শরীয়তের পাইকরে মাঝি ভাই মারিফতের নাও।
মায়া-নদী বাঁকেরে নৌকা উজান বাইয়া যাও।
গাবকালি লাগাইয়ারে নৌকা যত্ন করে বাও।
নুনা জলে খাইলেরে তক্তা ভাঙ্গিয়া পড়ে নাও।।
নায়ের মাঝে আছেন রে মাঝি ভাই নায়ের মহাজন।
এ করিম কয় না চিনিলে বিফলও জীবন।
ফকির বললেন, আল্লাহ নবীর নামে নৌকা, হেইয়া বাওয়াই কর্তা সারা জেবনের কাজ। আল্লাতালার প্রেরিত পুরুষ হইল গিয়া নবী। তিনিই তো বানাইছেন সাধের তরণীখানি। মাইনষের কাজ হইল হেইডা শুধু সুন্দরভাবে বাইয়া যাওয়া। হের লেইগ্যা তো সাধনা। তিন তক্তারি কাঠে বানাইতে কইছে মুর্শিদ নৌকারে। ববাঝেননি তিন তক্তারি কী?
বললাম, শরীরের তিনখানা নাড়ি।
–হ ঠিক কইছেন একেবারে কর্তা। নাড়ির বাতাসই তো চলায় নৌকা। নৌকা বাইতে হয় মায়া-নদীর বাঁকে-বাঁকে। তা কর্তা, মুর্শিদে মতি হইছে আপনের? নাম লইছেন? নাড়া বাঁধছেননি?
বললাম, না না। আমি হলাম জিজ্ঞাসু মানুষজন শুধু।
— এইডা কী কন্। আপনে অনুরাগী মানুষজন। নবীর নিকটে আইতে আইতেই দ্যাখবেন কর্তা, একদিন না একদিন আপনের অনুরাগ আইব। তখনই কর্তা মুর্শিদের দেখা পাওনের লাগি মন আনচান করব। এত উৎসুক্য আপনের। কর্তা দেহ গঠন করতে হইব না? সোনার গৌর আপনার দেহখান না হইলে তো পোকে খাইব। যমে শয়তানে টানাটানি করব। সময় আছে কর্তা, আপনের এই কাঁচা বয়সে মুর্শিদ ধইরা দেহখান গইড়া লন। তারপর ঘুরেন যত খুশি মেলায়-খেলায়। না হইলে কর্তা সব বৃথা যাইব। আল্লাহরে ডাকলে হইব না শুধু।
বাতাস বইছে। দুই বাংলার বাতাস এসে যেন ভিজিয়ে দিচ্ছে আমাকে আর মোজাম্মেলকে। অদূরে বাংলাদেশের গাছগাছালির হাওয়া একত্রিত হয়ে নাচছে অখণ্ড বাংলায়। ফকির এবার তাঁর সাধের দোতারাটা হাতে তুলে নিলেন। গান ধরলেন:
শুধু কি আল্লা বলে ডাকলে তারে
পাবি ওরে মন-পাগলা
যে ভাবে আল্লাতালা বিষম লীলা ত্রিজগতে করছে খেলা।
কতজন জপে মালা তুলসী-তলা হা
তে ঝোলা মালার ঝোলা
আর কতজন হরি বলি মারে তালি
নেচে গেয়ে হয় মাতেলা।
কতজন হয় উদাসী তীর্থবাসী
মক্কাতে দিয়াছে মেলা।
কেউ বা মসজিদে বসে তার উদ্দেশে
সদায় করে আল্লা আল্লা।
স্বরূপের মানুষ মিশে স্বরূপ দেশে
বোবায় কালায় নিত্য লীলা
স্বরূপের ভাব না জেনে চামর কিনে
হচ্ছে কত গাজীর চেলা।
নিত্য সেবায় নিত্য লীলা চরণ মালা
ধরা দিবে অধর কালা
পা তাই করে হেলা ঘটল জ্বালা
কি হবে নিকাশের বেলা।
গান শুনতে শুনতে দেখি সন্ধ্যা মজেছে সবে। বাউল-ফকিরের জমায়েতে মেলা সরগরম হয়ে উঠছে। গুরু-মুর্শিদের দেশে আমি তখন খুঁজে ফিরছি বাউলকে। আমার দোরের কপাট তাঁর গানগুরু ও সঙ্গের অনুশাসনই কেবল খুলে দিতে পারে। হাওয়া বইছে। আসাননগরে। গুরুর দিগ্বলয়ে নেমে আসছে হাওয়া বাউলেরই সমাসীন আধারে, ছেড়ে আসা মোজাম্মেলের মুখও যেন ঝলসে উঠছে তার ভেতর।
