ভিড়ের মাঝে সুমিত্রাকে খানিক নিভৃতে পেয়েছিলাম। বললেন, মচ্ছবের রান্নার পোড়াকাঠখানা দেখেছেন; দেখেন, আমার এখন তেমন দশা। সাধন পুড়েছে। ভজন নিয়ে তাই থাকি। ভজনই শান্তি, পাপ, প্রায়শ্চিত্ত। ভজন হল উত্রাই। তাই তিরবেগে ছুটতে ছুটতে আজ এখানে তো কাল ওখানে।
আমি সুমিত্রা চলে যাবার পর ভাবলাম, পড়শি তার এখন কেবল গান। তাকেই তিনি আজ্ঞাচক্রে দ্বিদলে স্থান দিয়েছেন। লালন যদি থাকতেন, সুমিত্রার এই ব্যথা কি বুঝতে পারতেন আজ। সুমিত্রার শরীরের অগাধ পানিতে একদিন বাউল-সাধক তরণী ভিড়িয়েছিলেন। তাতে স্কন্ধ-মাথাহীন পড়শি তিনি পেয়েছিলেন কিনা জানা নেই আমার। তবে সুমিত্রা পড়শির সেই উপেক্ষিত ছোঁয়ায় জীবনের সর্বশেষ অধ্যায়টি খুঁজে পেয়েছেন এখন। যে অধ্যায়ে গানখানি তার সর্বস্বতা নিয়ে পড়ে আছে একেবারে স্বতঃসিদ্ধ অস্তিত্বের অন্যরকম এক আরশিনগর। যেখানে দাঁড়ালে পড়শির হাঁ হাঁ রব কেবলই শোনা যায়। পড়শি কেঁদে ফেরে বাউলের হাওয়ায় হাওয়ায়।
*****
কুলের পাটের মেলায় বেশ রাতের দিকে শুনলাম কাঁটাগঞ্জের বাউল অরুণ দাসের গান। ততক্ষণে ভিড় থিতু হয়ে বসেছে আসরে। ইতিউতি অনেকে চাটাই পেতে গা এলিয়ে দিয়েছে খানিক। অরুণ দাস গাইতে উঠছেন। প্রথম গানেই দেহতত্ত্বকে ছিঁড়েখুঁড়ে টেনে বের করতে থাকলেন। যন্ত্রীদের থামিয়ে বললেন, এই এত মানুষের মধ্যে মানুষ। করতে হবে নিরীক্ষণ। কী বলেন সব খ্যাপা? ঘুমিয়ে পড়লেন নাকি! ডুবকিতে চাপড় দিল সঙ্গত শিল্পী। একতারা বাজিয়ে নিলেন। ধরলেন মানুষতত্ত্বের গান। কুলের পাট গমগম করতে থাকল সুর আর তালের মানুষে।
বাউল গাইলেন:
এবার আপনার খবর আপনি জান রে মন
মানুষ কোথায় আছে কর নিরীক্ষণ।
আমি আমি সবাই বলে আমি কে চেন গা আগে
তার কর গা অন্বেষণ।
এমন মানব জনম পাবি যদি
ধর গা হাড়িরামের ওই চরণ।
তারে খুঁজেও পাওয়া যায়
আপনি-হারা হলে পরে কোথায় পাওয়া যায়
আপনাকে আপনি হতেছ হারা
খুঁজে করগা তার অন্বেষণ।
এই দেহেতে চৌদ্দ কোঠা
যেমন শোলার পাখি কয়গো কথা
শতেক হাড়ে পিঁজরাটা গাঁথা–
হাওয়া বল্ ছাড়া এ কল রবে গো পড়ে।
শুধু খাঁচার কথা কবে না তোর।
সদানন্দ ভাবছে বসে কি করবি মন শেষে
ও তার কর গা অন্বেষণ
এমন মানব জনম পাবি যদি
ধর গা হাড়িরামের চরণ।
অরুণ বাউলের গানে নিজেকে চেনারই কথকতা রয়েছে। সেজন্যই দেহের চোদ্দ কোঠাকে শোলার পাখির কথা বলার উপমার সঙ্গে সামঞ্জস্য করা হয়েছে। চোদ্দ কোঠা চোদ্দ ভুবনে সামিল–দুই চোখ, দুই নাক, দুই কান, মুখ, মাজা, পায়ু, উপস্থ, বুক, স্তন, নাভি আর ব্রহ্মরন্ধ্র। চোদ্দকে দশেন্দ্রিয় আর চার ভূত মিলিয়েও দেখতে পারি আমরা। চোদ্দ ভূবনে দুই শরীরের প্রত্যঙ্গ রয়েছে সব। সাড়ে তিন কোটি নাড়ি আছে। আছে পঞ্চভূতেরও বাসস্থান। সাত ধাতুর উপাদান আছে। এই সমন্বয়ের ঐক্যতান তখনই একীভূত হয়, সাধনক্রিয়া শুরু হয়। অষ্টপাশ নাশ হয়। আর অষ্ট সিদ্ধির একটি কিন্তু লঘিমা। ইচ্ছামতন হাল্কা হবার ক্ষমতা। এতে শোলার পাখির কথা বলার প্রতীক রয়েছে। দেহের যোগক্রিয়াতে হাল্কা স্তরই শোলার পাখির কথা বলা। এই কথা বলতে হয় বায়ুযোগে। বায়ুই সাধককে। উজ্জীবিত করে রাখে। বায়ুর অভিষেক ঠিকঠাক শরীরে না হলে উপর্যায়ের উদ্ভাসিত বহুমাত্রিক শক্তিকে সাধক কখনই আয়ত্ত করে উঠতে পারবেন না। শরীর তৈরি করে বায়ু। বায়ু কুণ্ডলিনী শক্তিকে জাগায়। আজ্ঞাচক্রে কুলকুণ্ডলিনী উঠে এলে শ্বাসপ্রশ্বাস ক্রিয়া প্রায়
বন্ধ হয়ে যায়। কারণ এই অঞ্চল থেকেই শূন্যতা দ্যোতিত হয়। নিজস্ব স্বতন্ত্র ব্যক্তিসত্ত্বার। বোধ জাগে। এই শূন্যতা হল পূর্ণতা। সাধক তৈরি শক্তির শরীর নিয়ে তখন সেজে ওঠেন। ‘কুল’ সংস্কৃত ভাষাতে পরম চেতনার নামান্তর। এর আরও এক অর্থ রূপ বা আকৃতি। কুণ্ডলিনী শক্তির কাজ হল কুলকে বেঁধে ফেলা। আর তা হলেই রূপ তখন অরূপ হয়ে ওঠে। এই রূপ অধর মানুষের রূপ। যা সাধকই কেবল ধরতে পারেন। পদকর্তা সদানন্দ সেই মানুষের নিরীক্ষণের কথাই বলেছেন।
ছিন্নমস্তার উপাসক আলো সাধু একবার আমায় বলেছেন, আমাদের শরীরের তো একান্ন পীঠ আছে।
জিজ্ঞাসা করেছিলাম, কীভাবে তা আছে?
বললেন, একান্ন পীঠ শরীরের একান্নটা স্তর।
–কী এই স্তর?
–ছয় চক্রের স্তর। এতে সাতটি করে তরঙ্গ আছে। ছয়কে সাত দিয়ে গুণ কর তুই। বিয়াল্লিশ হল। এই ছয়ে আরও তিন স্তর আছে। তাহলে যোগে নয় হয়। সর্বমোট একান্ন হল। সতীর একান্ন টুকরো দেহবিশ্ব রে। সমগ্র শক্তি। ইতিবাচক মানুষে একান্ন থাকে।
বাউলের ইতিবাচক মানুষ হল অনুভূতির মানুষ। সহজ মানুষ।
বাউল বললেন, মানুষের তিরোধান হয় মানুষ দিয়ে গো! বুঝলেন না খ্যাপারা সব স্থূল মানুষ না মরলে সিদ্ধ মানুষ হবে কীরূপে? কী কন খ্যাপা?
আমি দেখছি চৈত্ৰচাঁদে কুলের পাটে চৈতন্যমূর্তিতে মানুষের হাওয়া লাগছে যেন। থই থই মানুষের শ্বাসে চৈতন্য কি বন্ধ মন্দিরে ঘুমিয়ে আছেন মানুষের নিরবচ্ছিন্ন এই হাওয়ায়! অরুণ বাউলের গানে ও একতারায়।
০১.৩ ত্রিকোণ যন্ত্র পাতালভেদী মধ্যে আছে মহা ঔষধি
পাঁচ পিড়ির আশ্রমে বসে আছি। বৈশাখের বিকেলবেলা। তবু তাত কমেনি সেইভাবে বাতাসে। ভক্তশিষ্য তেমন কেউ নেই। ফাঁকা, নিরিবিলি বসে আছি শিবশঙ্কর দাস বৈরাগ্যের পাশে। পুঁইয়ের মাচার নধর লতাও সব নুয়ে পড়েছে তাপে। পেঁপের রং হলুদ হয়েছে। কিন্তু পাতা সব নেতিয়ে রয়েছে। কুয়োতলা থেকে জল তুলে বাউলানি ভিজিয়ে দিচ্ছেন আশ্রমের গাছের গোড়া। ডালপালাতেও ছিটে দিচ্ছেন।
