এই উল্টাখেলাতেই বাউল সাধক মনের মানুষকে বোঝেন, উপলব্ধি করেন। আর তার জন্যই তো বাউলের যত হাহাকার। এমনই এক হাহাকারের বহুশ্রুত গান শুনেছিলাম কৃষ্ণা দাসীর বাড়িতে বসেই। এক বিকেলে আমি আর চন্দ্রানী পৌঁছেছিলাম কৃষ্ণার ওখানে। তখন কৃষ্ণা সবে একতারা নিয়ে বসেছেন। পড়ে এসেছে বিকেল। কৃষ্ণা বললেন, কাল রেডিও সেন্টারে গাইতে হবে। ডাক এসেছে। তাই বসেছি।
ব্যস্ত হয়ে পড়লেন আমাদের দেখে বললেন, চা করি।
চন্দ্রানী বলল, ও সব পরে হবে। আগে গান শুনি।
কৃষ্ণা পুনরায় একতারা তুলে নিলেন হাতে গাইতে লাগলেন বহুশ্রুত সেই গান। কৃষ্ণা গাইছেন মন প্রাণ ঢেলে। সবে তখন নবকুমারের সঙ্গে তার ছাড়াছাড়ি হয়ে গেছে। তার গানে যেন সেই সম্পর্কের তিক্ত-কষা যুক্তির জাগর হয়ে ফুটে উঠছে সব। তিনি গাইছেন:
আমি কোথায় পাব তারে আমার মনের মানুষ যে রে–
হারায়ে সেই মানুষে তার উদ্দেশে দেশ বিদেশে বেড়াই ঘুরে।
লাগি সেই হৃদয়শশী সদা প্রাণ হয় উদাসী
পেলে মন হত খুশি দেখতাম নয়ন ভরে।
আমি প্রেমানল মরছি জ্বলে নিভাই কেমন করে
মরি হায় হায়রে
ও তার বিচ্ছেদে প্রাণ কেমন করে
ওরে দেখ না তোরা হৃদয় চিরে।
দিব তার তুলনা কি যার প্রেমে জগৎ সুখী
হেরিলে জুড়ায় আঁখি সামান্যে কি দেখিতে পারে
তারে যে দেখেছে সেই মজেছে ছাই দিয়ে সংসারে।
মরি হায় হায়রে–
ও সে না জানি কি কুহক জানে
অলক্ষে মন চুরি করে।
কুল মান সব গেল রে তবু না পেলাম তারে
প্রেমের লেশ নাই অন্তরে–
তাইতে মোরা দেয় না দেখা সে রে।
ও তার বসত কোথায় না জেনে তার গগন ভেবে মরে
মরি হায় হায় রে–
ও সে মানুষের উদ্দিশ যদি জানিস কৃপা করে
আমার সুহৃদ হয়ে ব্যথার ব্যথিত হয়ে
আমায় বলে দে রে।
বাউল বলেন মনের মানুষ দ্বিদলে অবস্থান করেন। দ্বিদল হল আজ্ঞাচক্রের স্থান। তারপর ষোড়শ দলে নেমে আসেন। ষোড়শ দল বিশুদ্ধচক্রের স্থান। সেখান থেকে দশমদলে নামেন তিনি। মণিপুরে। তারপর চতুৰ্দলে স্থিত হন। মূলাধার চক্রে। মূলাধারের এই সহজ মানুষকে সাধক বাউল উজানে ঠেলে নিয়ে দ্বিদলে স্বরূপকে উপলব্ধ করেন।
কৃষ্ণার গানে তার স্বরূপ নিয়েই নিভৃততম স্রস্ততা, শিহরণ, অনিশ্চয়টুকু ফুটে উঠেছে। আমাদের উপনিষদ বলছে, বাইরের সত্যকে খুঁজে বিভ্রান্ত হয়ে পড়ার কোনো কারণ নেই। নিজের মধ্যে ডুব দিলে পরমের সঙ্গে তার কোনো পার্থক্য থাকে না। ‘তৎ তৃম অসি’–তুমিই সেই। এই তুমি আনন্দ-স্বরূপ নিজেরই অন্তরাত্মা। দ্রষ্টা, দৃষ্টি এবং দ্রষ্টব্য। একই সরলরেখার জিনিস। চার অবস্থার কথা বলা হয়েছে উপনিষদে–জাগ্রত, সস্বপ্ন। নিদ্রা, স্বপ্নহীন নিদ্রা, তুরীয় অবস্থা। এই চার অবস্থাকে আমরা বাউল সাধনার চারটি স্তরের সঙ্গে মিলিয়ে নিতেই পারি। জাগ্রত = স্থূল, স্বস্বপ্ন নিদ্রা = প্রবর্ত, স্বপ্নহীন নিদ্রা = সাধক, তুরীয় অবস্থা = সিদ্ধ। বাউলের অষ্টদল পদ্মের কথা আমরা কিন্তু উপনিষদে পাই। সেখানে বলা হয়েছে, অনাহত চক্রের নীচে অষ্টদল পদ্ম থাকে। এখানে ইষ্টদেবতার পূজা করতে হয়। বাউলের নিষ্ট ও ইষ্ট মনের মানুষ। তাই সাধক বাউল রজ পানের পর ঘুমঘোরে এই পদ্মেরই দেখা পান স্বপ্নাচ্ছন্ন অবস্থাতে। এটা উপনিষদের দ্বিতীয় স্তর। বাউলেরও প্রবর্ত স্তর শিক্ষা-দীক্ষার শুরুর সময়ই তো চারচন্দ্র ভেদ করতে হয় তাকে। অষ্টদলে আট বৃত্তির কথাও বলছে উপনিষদ। পূর্ব দলে পূণ্যমতি, দক্ষিণ-পূর্বদলে নিদ্রা ও আলস্য, দক্ষিণ দলে কুরমতি, দক্ষিণ-পশ্চিম দলে পাপমতি, পশ্চিম দলে নীচতা, উত্তর-পশ্চিম দলে ক্রিয়ার ইচ্ছা, উত্তর-পূর্ব দলে বস্তুগ্রহণ। এই আট বৃত্তি কিন্তু মনের মানুষ লাভের জন্য যথেষ্টই সংযোগ সূচক।
মনের মানুষের জনপ্রিয় আরেক গান অনেক বাউলের মুখেই শুনতে পাওয়া যায়। ঘোষপাড়ার মেলায় সুমিত্রা দাসীর গলাতে সেই গানের কথা মনে এলে এখনও সেই উজ্জ্বলতার ঘোরকে কাটাতে পারি না আমি কিছু কিছু গান যেন গায়কেরই একান্ত হয়ে ওঠে। সুমিত্রার এই গানকে আমার মনে হয়েছিল একান্ত নিজস্ব গান। তার স্বপ্ন, স্বপ্নভঙ্গ, সঙ্কটাপন্ন অর্থনীতি, পরিবার বিচ্ছিন্নতা–সব মিলিয়ে মনে হয়েছিল যেন এ গান তার গাইবার জন্যই রচিত। যখন সুমিত্রাকে দেখেছিলাম, ঠিকানা চেয়েছিলাম পুনরায় যোগাযোগের তখন নিজস্ব কোনও আস্তানা ছিল না তার। মাধবপুর, মুড়াগাছা, অতঃপর বীরভূম, বর্ধমান কোথাও স্থিতু হতে পারেননি এই নারী। সঙ্গীহীন উদাত্ত সঙ্গীত নিয়ে কেবল গ্রাম বাংলা চষে ফেলছেন তিনি। অথচ স্বপ্ন ছিল সাধনভজন করবেন। সাধকের প্রতারণা তাকে মুখর ও জেদি করে কেবল ছেড়ে দিয়েছে গানের দরবারে। সুমিত্রার তাই ভেঙে পড়া বিচ্ছিন্ন নগরে রোষ, ক্ষোভ আর বিদ্বেষের আরশিনগর রয়েছে। পড়শি তার এখন নাকি কেবলই গান। এ সুমিত্রার নিজের কথা।
ঘোষপাড়ার মেলায় সেবার তিনি গাইলেন:
আমি একদিনও না দেখিলাম তারে
আমার বাড়ির কাছে আরশিনগর
ও এক পড়শি বসত করে।
গ্রাম বেড়িয়ে অগাধ পানি
ও তার নাই কিনারা নাই তরণী পারে–
আমি বাঞ্ছা করি দেখব তারি
আমি কেমনে সে গাঁয় যাই রে।
বলব কি সেই পড়শির কথা।
ও তার হস্ত-পদ-স্কন্ধ-মাথা নাই রে।
ও সে ক্ষণেক ভাসে শূণ্যের উপর
আবার ক্ষণেক ভাসে নীরে।
পড়শি যদি আমায় ছুঁত
আমার যম-যাতনা যেত দূরে।
আবার সে আর লালন একখানে রয়
তবু লক্ষ যোজন ফাঁক রে।
