বাউল স্বাধিষ্ঠানকে অনেক সময়ই বাদ দেন দেখেছি। তাহলে দাঁড়ালো: অষ্টপদ্ম চক্র। সহস্রার আটে চলে এল। আর সহস্রারেই সাধক বিসর্গাকারের মণ্ডলবিশেষ দেখতে পান ধ্যানযোগে। এই বিসর্গাকারের তেজোময় মণ্ডলটিকে তারা বলেন বিন্দুসম। এখানে। পরম শিবের স্থান বলে তাঁদের বিশ্বাস। শিব শক্তিদ্যোতক। যোগকালে সমস্ত পদ্মচক্রের পাঁপড় ছিড়তে ছিড়তে সাধক ব্রহ্মরন্ধ্রের উপরে সেই বিন্দুরূপকে দেখেন। ‘বিন্দু’ এখানে উর্ধ্বারেতা সমত্ত ধরতে পারি। কেননা মূলাধারের শুক্র যোগক্রিয়াতে সহস্রারের ব্রহ্মরন্ধ্রে এসে জমা হয়। তখনই দিব্যজ্ঞান, নিরাকার শূণ্যতার দেখা পান সাধক। মায়াচ্ছাদিত পরমাত্মা থৈ থৈ করতে থাকে সাধক শরীরে। বিন্দু দেখাকে বাউল উধ্বারেতার ইঙ্গিত স্বরূপই দেখেন বোধহয়। আর তারা যেহেতু অষ্ট চক্রের কথা বলে থাকেন, সেই জন্যই অষ্টদল পদ্ম রূপ। অষ্ট জিনিসের কথা বলেছেন রাধাশ্যাম। অষ্টপাশ বাউলের-লজ্জা, ঘৃণা, ভয়, শঙ্কা, জিগীষা, জাতি, কুল, মান। এগুলোর কর্মযোগকে তারা থামিয়ে দেন। সাধক অষ্ট সিদ্ধির কথা বলেন। তান্ত্রিক সাধনাতে এর উল্লেখ পাই। অণুর মতো যোগবলে ক্ষুদ্র হয়ে যেতে পারেন সাধক (অণিমা)। বড় হয়ে যান (মহিমা)। ইচ্ছামতো হাল্কা হতে পারেন। আবার (গরিমা)। যা ইচ্ছা লাভ করতে পারেন (প্রাপ্তি)। ইচ্ছামতো কোনো জিনিস পেতে পারেন (প্রকাশ্য)। কোনো কিছুর উপর প্রভূত্ব বিস্তার করতে পারেন (ইশিত্ব)। বশ করতে পারেন যাকে তাকে (বশিত্ব) বাউল সাধকের এই অষ্টসিদ্ধি নেই এটা হলফ করে বলতে পারি। তাঁদের আট আটপাশের বাঁধন কাটা। আর অষ্টদল পদ্ম ধারণাকল্প। বাস্তবিক এরকম পদ্মচক্র শরীরে কিন্তু নেই। যেটা মনে হয় অষ্টপাশ মুক্তি হওয়াই তাঁদের অষ্টবৃত্তির নাশস্বরূপ আটটি দলপদ্ম। নবরঙ্গে ফুল ফোটার কথা বলেছেন পদকর্তা। নবরঙ্গ নয়বিধা ভক্তিরস। এই রসে রাধাভাব আসে। শরীর প্রকৃতি হয়। রাধাশ্যাম তাই বলেছেন: ‘নব রঙ্গে ফুল ফুটিলে ডোমর আসে উড়ে/ ফুলের মধু দেখতে সাদা আপনি খেয়ে উদর ভরে। / সমুঝ দিয়ে দেখ চেয়ে পুরুষ নহে সবই মেয়ে। / থাকবে যদি পুরুষ হয়ে চল ভেদ বিচারে’–এই ভেদ বিচার হল চারচন্দ্র ভেদ। তারপর সাড়ে চব্বিশ চন্দ্ৰস্পর্শ। ভাবাশ্রয়। বাণক্রিয়া। তিন দিনের যোগে এই বৈতরণী পার হলে বাউল বলেন শরীরে ‘সহজ মানুষের’ উদয় হয়েছে। সহজ মানুষ হল প্রকৃতি-পুরুষের নিবিড় আনন্দময় অবস্থা। যেখানে প্রেম শৃঙ্গার। তিনদিনের রেচক–পূরক–কুম্ভকের ক্রিয়ায় নাড়ি পরিষ্কার হয়ে যায়। বায়ুর সাম্যতা থাকে শরীরে। সুষুম্নার পথ সহজ সরল হয়ে ওঠে। আর এই সুষুম্না দিয়েই। বাউল সাধক নীচস্থ বীর্যকে উপরে ঠেলে তুলে দিয়ে সঙ্গিনীর শরীরে নিবিড় অচঞ্চল হয়ে পড়েন। এই অবস্থাই বাউলের সহজ মানুষের বিলাসস্বরূপ। বাণ ক্রিয়ার কথা বলেছি আমরা। কুম্ভক শক্তির উপর এই ক্রিয়া নির্ভরশীল। মদন, মাদন, শোষণ, স্তম্ভন ও সম্মোহন–এই পঞ্চবাণ-ক্রিয়া থাকে যুগল মিলনে। মদন হল ক্রিয়াযোগে রতিশক্তির উত্তেজক অবস্থা। মাদন হল সঙ্গিনীর দেহের বিভিন্ন উত্তেজক স্থানগুলোতে চুম্বনস্পর্শ দিয়ে উত্তেজনা জাগিয়ে দেওয়া। বাউল একে ‘হিল্লোল’ও বলেন। শোষণ হল সঙ্গিনীর শরীর। থেকে কামকে তুলে নেওয়া। স্তম্ভন যুগ্মদেহের স্থিরতা। সম্মোহন দেহের হিতাহিত শূন্যতা। মনের মানুষের বা সহজ মানুষের স্থিরকৃত ভূমি হল সম্মোহন। এখানে শরীর এলেই ওই বোধেন্দ্রিয় ক্রিয়া করে। রাধাশ্যাম বলেছেন: ‘থাকবে যদি পুরুষ হয়ে চল ভেদ-বিচারে/ একটি পুরুষ নিজে ছুরতে জগত মাঝে ঘুরে।’
পুরুষ এখানে বাউলবস্তু। কৃষ্ণধন। তার জন্যই লক্ষ নারীর মন জোগানোর কথা। ‘লক্ষ নারী’ সাধন শরীর। তাকে ঠিকমতো চালনা করলেই ‘প্রেমের মরা আপনি মরে।’ অর্থাৎ কিনা শরীর শূন্যতায় অখণ্ডতা দেখা দেয়। পরমাত্মা বিরাজ করে শুধু।
কুলের পাটের মেলায় বাউল হরি বৈদ্য রাজ খ্যাপার যে পদ শুনিয়েছিলেন সেখানেও বলা হয়েছে: ‘মানুষ হয়ে মানুষ হয়ে কর গে যা মানুষের লীলা/ ধরবি যদি সে মানুষে খুলে দেহের তালা।’ ‘বাউলের পরমতত্ত্ব’ সব দেহ ঘিরেই। চক্র ও তার সন্নিহিত পদ্ম; ইড়া, পিঙ্গলা, সুষুম্না নাড়ি এগুলোকে আশ্রয় করেই তাঁদের তত্ত্ব বিরোচিত। তান্ত্রিক আচার, সহজিয়া বৈষ্ণব মতো সবই দেহকে শ্রীক্ষেত্র করে সামনে এগোনো। তার জন্যই পদকর্তা দেহের তালা খুলতে বলছেন। শরীরের মধ্যে ব্রহ্মাণ্ডকে উপলব্ধ করতে বলছেন। সাধনপদ চর্যাপদের ভাষাতেও দেহস্থ অন্দরকে ঠিকঠাক জানার কথাই লেখা হয়েছে–’ঘরে অচ্ছই বাহিরে পুচ্ছই/ পই দেকখই পড়িবেশী পুচ্ছই। / সরহ ভণই বঢ় জাণউ অপ্পা। / ণউ সো ধেঅণ ধারণা জপ্পা।।‘ ঘরের মধ্যেই পরমতত্ত্ব আছে। তুমি কেবল বৃথাই বাইরে তার জন্য একে-তাকে জিজ্ঞাসা করছ। তোমার প্রিয় ভেতরই আছে, তবু তুমি প্রতিবেশীকে জিজ্ঞেস করছ সে কোথায় আছে। সরহ বলছেন, ওরে মূর্খ, আত্মতত্ত্বকে জান সত্য ধারণা নিয়ে। ধ্যান ধারণার দ্বারা দেহকে না জানলে কিছুই জানা যাবে না। এখানকার ‘তোমার প্রিয়’ সেই বাউল কথিত মনের মানুষই। দেহকে সাধক সহজ বৃন্দাবন মনে করে থাকেন। দেহ মথুরাও। এই দুই জায়গার আবেশ বাউল দু’জনের শরীরে মেখে সাধনাতে এগোন। জীবন্ত এক প্রতিভূ সব সময়ই তৈরি করতে চান বাউল। গৌরাঙ্গের রক্তমাংসের পরতও খুলে যায় তাঁদের দেহতত্ত্বের গানে। বৈষ্ণবীয় আধার এভাবে বাউলে ঢোকে। পদকর্তারা বৈষ্ণবীয় কবি চন্ডীদাসকেও তাঁদের অন্তর্ভূক্ত করে নেন। রামীকে তাঁদের সাধনগুরু সাজিয়ে নারীকে প্রতিনিধি স্থানীয় এক বিশেষ সিংহাসনই দেন। সহজিয়া-বৈষ্ণবরাও ‘মানুষ’, ‘সহজ মানুষ’ বলতে অন্তরস্থ সত্তাকে শ্রীকৃষ্ণ হিসাবে বোঝেন। এক্ষেত্রে চৈতন্যদেবই তাঁদের পথ দেখান। তার প্রতিমূর্তি, রাধাভাবের নিমগ্ন সাধনায় শ্রীকৃষ্ণ হয়ে ওঠে পরমতত্ত্ব। মানুষ, সহজ মানুষ। তাঁদের অনেক পদেই মানুষের এই অভিজ্ঞানকে আমরা দেখে থাকি। যেমন-’মানুষ মানুষ ত্রিবিধ প্রকার মানুষ বাছিয়া লেহ। / সহজ মানুষ অযোনি মানুষ/ সংস্কারা মানুষ-দেহ।।‘ বা, ‘সব পরিজন লয়ে সঙ্কৰ্ষণ / সহজ মানুষ হইলা। / সহজ রূপেতে সহজ মানুস/আস্বাদে মানুষ লীলা। অথবা, ‘সহজ মানুষ কোথাও নাই। / খুঁজিলে তাহারে নিকটে পাই। / যোনিতে জনম তাহার নয়। / তাহার জনম রাগেতে হয়।‘ চৈতন্য পরবর্তী সহজিয়া বৈষ্ণবধর্ম বাউলের প্রাথমিক স্তরের পাঠশালার মধ্যে বেশ কিছুটা ঢুকে আছে। যতই দুদ্দু শাহ লিখুন না কেন: ‘বাউল বৈষ্ণবধর্ম এক নহে তো ভাই/ বাউল ধর্মের সাথে বৈষ্ণবের যোগ নাই। / বিশেষ সম্প্রদায় বৈষ্ণব / পঞ্চতত্ত্বে করে জপতপ/ তুলসী মালা অনুষ্ঠান সদাই। / বাউল মানুষ ভজে/ যেখানে নিত্য বিরাজে/ বস্তুর অমৃতে মজে/ নারী সঙ্গী তাই।‘ বাউলের ধর্ম মতে বৈষ্ণবধারা যেমন আছে তেমনই অদীক্ষিত সাধনাবর্জিত বাউলরাও আছেন। আছেন যুগলমতের উপাসকগণ। চিন্তামণির মত রয়েছে। মারিফত পন্থীরাও আছেন। দরবেশি ধারা প্রবেশ করেছে। চিস্তিরামত, তরিকপন্থী, সহজিয়া, পাবনাস্রোত, কচ্ছাধারী সম্প্রদায়, শরিয়ত তরিকতের মিলিত ভাবাদর্শ, মথুরানন্দের স্রোত এসে মিশেছে বাউল-ফকিরের সম্প্রদায়ে। অখিলপন্থী, কালাচাঁদী, তান্ত্রিক সাধন, সহজিয়া, শ্রীরূপের মতাদর্শীরাও বাউল আধারে একত্রে মিলেমিশে আছেন সব। তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে যেটা দেখা যায় বাউলের দীক্ষাগুরু বৈষ্ণব, শিক্ষাগুরু বাউল। আবার উল্টোটাও আছে। শিক্ষায় আসন, যোগ, দেহচর্চা, মুদ্রার ব্যবহারিক প্রয়োগের কথা বলে থাকেন বাউল সাধক। তবে তন্ত্রসাধকদের মতো তারা মুদ্রার অতখানি ব্যবহার করেন বলে মনে হয় না। মুদ্রাকে বলা হয় কুণ্ডলিনী শক্তির চাবিকাঠি। কুণ্ডলিনী যোগের জন্য দশ ধরণের মুদ্রা ব্যবহার জানা প্রয়োজন। খেচরী হল প্রধান মুদ্রা। সিদ্ধাসনে বসে যোনিমুদ্রার সাহায্যে যোগীগুরু চোখ, নাক, কান, মুখ সব। আচ্ছন্ন করে দেন, যাতে বাইরের কোনো কু-প্রভাব দেহে এসে না পড়ে। গোরক্ষসংহিতাতে। সিদ্ধাসন সম্পর্কে বলা হয়েছে: ‘যোনিস্থানকমংঘ্ৰিমূলঘটিতং কৃত্বা দৃঢ়ং বিন্যসেৎ / মেট্ৰেপাদথৈকমেব হৃদয়ে ধৃত্বা সমং বিগ্রহ। স্থানুঃ সংযমিতেন্দ্রিয়োহ চলদৃশা পশ্যন্ জবোরর/ চৈতন্যাখ্যকপাটভেদজনকং সিদ্ধাসনং প্রোচ্যতে। যোনিস্থানকে বাঁ পায়ের গোড়ালি দিয়ে চাপ দিয়ে মূলদেশ বা মলদ্বার অঞ্চলের সামান্য কিছু উপরে উঠে পড়ে। এরপরই কাকিনীমুদ্রায় সাধক প্রাণবায়ুকে গ্রহণ করেন। প্রাণের সঙ্গে যোগসাধনে অপান বায়ু আসে। তখনই দেহের ছয় চক্রের দরজা খোলে। সাধক এখানে মন্ত্র জপেন ‘হুং হংসং’। ‘হুং’ তেজরশ্মি বা সূর্যতেজ। এতে কুণ্ডলিনী শক্তিতে উত্তাপ ছড়ায়। ‘সং’ হল ইচ্ছা। মূলাধারচক্রে বায়ু থাকে চন্দ্রসূর্যরূপী। হুং তো জাগিয়ে দিল কুণ্ডলিনীকে। ‘স’ টেনে তোলে। সহস্রারে উঠে যায় বায়ু। তখন সাধকের মনে হয় সর্বত্র প্রসারিত, বিরাজিত তিনি। তখনই। আনন্দময় হয়ে ওঠেন তিনি। তন্ত্রশাস্ত্র একে বলছে শিব। সাংখ্যদর্শন নাম দিয়েছে পুরুষ। বৌদ্ধশাস্ত্র শূন্যতা। উপনিষদ বলছে ব্ৰহ্মণ। অশ্বিনীমুদ্রাতে যতক্ষণ না বায়ু সুষুম্নাতে আসছে ততক্ষণ এখানে অবস্থান করেন সাধক। ইড়া-পিঙ্গলাতে / চন্দ্র-সূর্যতে তখন বায়ুবেগ টেনে সুষুম্নাতে এলে তখন তলপেটের মাংসপেশি একবার বাঁয়ে একবার ডানে সরে যায়। এতে কুণ্ডলিনী জাগে। এর সঙ্গেই চলে যোনিমুদ্রাতে সিদ্ধাসনে প্রাণবায়ু গ্রহণ এবং প্রাণবায়ুর সঙ্গে অপান বায়ুর সমন্বয় সাধন। শক্তিচালান মুদ্রার প্রয়োজন হয়ে পড়ে সাধকের যোনিমুদ্রার আগে। অশ্বিনীতে তলপেটে নানা আওয়াজ হতে থাকে। কুম্ভকের সাহায্যে এখানে কুণ্ডলিনীকে সহস্রারে নিয়ে যাওয়া হয়। তন্ত্রগুরু দেখেন এখানে শিবের সঙ্গে শক্তির মিলন হচ্ছে। এই মিলনে তিনি আনন্দময় হয়ে ওঠেন। মহাবেধ মুদ্রাতে যোগী মনকে নিবিষ্ট করে নেন। এখানে চন্দ্র, সূর্য, তেজ বা অগ্নি সব একাকার হয়ে যায়। মানে হল ইড়া, পিঙ্গলা, সুষুম্নার ত্রিবেণীযোগাযোগী ভদ্রিকাকুম্ভক ও পদ্মাসন করতে থাকেন। পদ্মাসনে বসেই তলপেটকে সংকুচিত করেন তিনি। খেচরী মুদ্রাতে জিভকে বের করে। আনা হয় দুই ভুরুর মাঝখানে। এতখানি প্রসারিত হয় জিভ। এই স্থান বাউলের আরশিনগর। বাউলও আজ্ঞাচক্র ভেদ করেন। পরমাত্মারূপ তার জ্ব-পদ্মে। যুগল তিনি তা লাভ করেন। রাজ খ্যাপা তাই তার পদে বলেছেন: ‘পরমাত্মা রূপে এসে মানুষে মানুষ আছে মিশে সাধন কল্পে / পাবি দিশে রবে না আরে ত্রিতাপ জ্বালা / দ্বিদল পরে দেয় পাহারা বেদবিধি পার উল্টা খেলা।’
