–সহজ হল সহস্রবার কাছে যাওয়া। কার কাছে যাবেন সাধক? যাবেন পরমা প্রকৃতির কাছে। তার কাছে গিয়ে নাড়িকে সহস্রবার জাগিয়ে নেবেন। সহজের সহস্র তখন চলে যাবে সহস্রার পদ্মে। এখানের ক্রিয়ায় সাধক অটল হবেন। রসিক হবেন। কারণ যে তিনি রস ধরেছেন।
বাউলও এই রস ধরেই কিন্তু রসিক হন। মনের মানুষ, সহজ মানুষ তার রসস্থ আলোকসম্পাত। সর্বোচ্চ দশা। নিভৃত ঘরে দ্বিদলের ক্রিয়া দ্বিদল প্রস্ফুটিত হয় আজ্ঞাচক্রে। এখানে তিন নাড়ির মিলনস্থল। বাউলের ত্রিবেণী। হৃদ্বয়ে এই দ্বিদল পদ্ম থাকে। বাউল কথিত তা আরশিনগর। সাধক বলেন শ্বেতবর্ণ পদ্ম এটি। এই সাদাকে পরমাত্মা স্বরূপ কল্পনা করতে পারি। কামনার নাশে ‘কালী’ মুছে ‘সাদা’ আসছে। দুই দ্বলে দুই বর্ণের কথা বলেন সাধক। ‘হ’ ও ‘ক্ষ’। ‘হ’ কে হৃদয়দ্যোতক আর ‘ক্ষ’কে ক্ষণ(শুভক্ষণ, শুভাগমন, ভাগ্যবান) হিসাবে কল্পনা করে নিলেই কিন্তু মনের মানুষের রেশটি যেন আরও স্পষ্ট হয়। হৃদয় দিয়েই উধ্বারেতার অনুভূতিকে ধরা ছোঁয়া যায়। ভাষা দিয়ে নয়। আর তা ভাগ্যবানের পক্ষেই সম্ভব। সবাই তো আর সেই স্তরে, মুহুর্তে, ক্ষণে যেতে পারেন না।
যোগমায়া মা বলেছিলেন, বীর্য হল কার্ত্তিক।
আমি চমকে গিয়েছিলাম শুনে। জিজ্ঞাসা করলাম, কীভাবে মা বীর্য কার্তিক হলেন?
বললেন, তোর রূপ পরিষ্কার। কিন্তু তুই কালো হলেও কার্তিক হবি। বীর্য সবার কার্তিকের রূপের মতনই রূপময়। আর নারীর রজ হল লক্ষ্মী। রজঃস্রোতেই সাধক ঐশ্বর্য লাভ করেন। তার ঐশ্বর্য বীর্যের উদ্ভাস। বীর্যের সঙ্গে সাধকের সাক্ষাৎকার ঘটে ব্রহ্মরন্ধ্রে।
*****
রাধাশ্যাম গানে গুরুবর্তের কথাই বলেছেন: ‘এই দেহে হয় চব্বিশ তত্ত্ব/ গুরুবর্ত করে দেখলি না রে/ হয়ে অহঙ্কারে মত্ত।’
চব্বিশ তত্ত্ব হল ক্ষিতি, অপ, তেজ, মরুৎ, ব্যোমের পাঁচ। পঞ্চভূত। মিষ্টি, টক, লবনাক্ত, তেতো, ঝালের এই পঞ্চস্বাদ। চোখ, কান, নাক, জিভ, ত্বক, পানি, বাক, পাদ, পায়ু উপস্থের দশ। দর্শেন্দ্রিয়। কাম, ক্রোধ, লোভ, মদ, মোহ, মাৎসর্যের ছয়। ষড় রিপু। অনিমা, মহিমা, লঘিমা, গরিমা, পতি, প্রকাম্য, ইশিত্ব, বশিত্বের আট। অষ্টসিদ্ধি। সর্বমোট চব্বিশ। দেহের এই চব্বিশ তত্ত্বের হদিশ গুরু দেন। গুরু সাধকের দেহ আধারিত বিজ্ঞান। শরীরের আকাশ,বাতাস, তেজ, জল, পৃথিবীর সন্ধান সাধককে দেন গুরু। ভাব, যোগ ও ক্রিয়াসংযোগে। রাধাশ্যাম তার কথাই বলেছেন পদটিতে। চব্বিশের তিন তত্ত্ব। রতিকল্প–ইড়া, পিঙ্গলা, সুষুম্না। যাতে মত্ত হয় রসিকগণ। অর্থাৎ কিনা বাউল সাধক নিজে নাড়ির করণক্রিয়া বুঝে নেন, জেনে নেন গুরুর কাছে। তারপর তিনি রপ্ত করে ফেলেন। আর তখনই ‘আঠারো চিজ’কে জানতে হয়–’আরো আঠারো চিজে দেহ গঠন হয়েছে/ পিতার চার, আর মাতার চার/ দেখ দেহে রয়েছে। আর গুরু যে তায় দশ দিয়েছে, সে কথা কি নাই স্মরণ।।’
পিতার চার-হাড়, শিরা, শুক্র, মগজ। মাতার চার-মাংস, চামড়া, রক্ত, চুল। গুরুর দেওয়া দশ–দশেন্দ্রিয়। গুরুই তো ইন্দ্রিয়গত উপলব্ধি প্রদান করে থাকেন সাধক বাউলকে। তাই গুরুবর্তের কথাতে তা মনে রাখতে বলা হচ্ছে। গুরুই তো সাধক বাউলকে জ্ঞানচক্ষু দেন। তাই গুরুর স্থান পিতামাতার পরই। বৈষ্ণবরা বলেন–’গুরু ত্যজি গোবিন্দ ভজে, / সেই পাপী নরকে মজে।’ শাস্ত্রে বলা হয়েছে–’ন চ বিদ্যা গুরোস্তুল্যং ন তীর্থং ন চ দেবতা / গুরোস্তুল্যং ন বৈ কোহপি যদৃষ্টং পরমংপদম।।/ ন মিত্রং ন চ পুত্রাশ্চ ন পিতা ন চ বান্ধবাঃ। ন স্বামী চ গুরোস্তুল্যং যদৃষ্টং পরমং পদম। একমপ্যক্ষরং যস্ত গুরুঃ শিষ্যে নিবেদয়েৎ। পৃথিব্যাং নাস্তি তদ্রব্যং যদ্দত্ত্বা চাণী ভবেৎ।’ কোনও বিদ্যা, কোনও তীর্থস্থান, কোনও দেবতা, কিছুই গুরুর তুল্য নয়। গুরুর মতো বন্ধু কেউ নেই। পিতা, পুত্র, স্বামী, বন্ধু কেউই গুরুতুল্য হতে পারেন না। গুরু শিষ্যকে যা প্রদান করেন (মন্ত্র, যোগ, ক্রিয়া ইত্যাদি) তার তুল্য বস্তু পৃথিবীতে নেই। বাউল সাধক তাই গুরুতত্ত্বেরই সাধনা করেন। তাঁদের মত, গুরুতত্ত্বের যে স্বরূপ তার তিন রূপ। প্রথম রূপ ভোক্তা। যিনি স্কুল শরীর ভোগ করেন। দ্বিতীয় রূপ পুরুষ আর তৃতীয় প্রকৃতি। পুরুষ আর প্রকৃতির যুগল সাধনাতেই অনির্বচনীয় স্তরে চলে যান সাধক। যা তাঁদের সহজ মানুষের স্তর। সমস্ত মানুষ। অভিধা শেষে গিয়ে সাধকের অতীন্দ্রিয় গুরুতত্ত্বে মেশে। বাউল তখনই গুরুরূপের স্বরূপ দেহতত্ত্বের, মানুষতত্ত্বের, সাধনতত্ত্বের গান রচনা করেন আর প্রদর্শিত পথে হাঁটেন। কুলের পাটের মেলায় হরি বৈদ্য বাউল পরম গুরুতত্ত্বের মানুষকেই তাই সামনে আনছিলেন একা বসে পূর্ণচন্দ্রের আভায়– ‘কীসে দেব তার তুলনা কায়া ভিন্ন প্রমাণ হয় না/পশুপক্ষী জীব আদি যত এ সংসারে/দুইটি ভাণ্ডের পানি দিয়া অষ্ট জিনিস গড়ে–তার ভিতরে নিজে গিয়ে আত্মারূপে বিরাজ করে।’
পদকর্তা বলছেন মানুষ দিয়ে মানুষ বানানোর কথা। দেহ সাধনায় মানুষ বানানো হয় যুগল ঘনসংবদ্ধতার গাঠনিক সৌকর্যকে নিয়েই। দুই ভাণ্ডের পানির কথা বলেছেন রাধাশ্যাম। দুই ভাণ্ড যুগল দেহ। পানি রজ-বীর্য। অষ্ট জিনিস কীভাবে তৈরি হয় দুই ভাণ্ডের পানিতে? তৈরি হয় সাধনের সময়। বাউল সাধনার সময় দিনক্ষণ আর তিথিতে মাপা। তাঁদের ক্রিয়াকরণ তিনদিনের। যখন সঙ্গিনীর শরীরে রজস্রোত বইতে থাকে সাধনার প্রথম দিনে তখন থাকে নিরবিচ্ছিন্ন কাম। এই কাম তাঁদের কাছে লীলাসূচক। তখন বাউল সাধক চারচন্দ্র ভেদে নামেন। মল, মূত্র, শুক্র, রজ সব শরীরে ফিরিয়ে নেন। এতে নাকি দেহে একটা পরিবর্তন আসে। অনেক বাউল সাধকই বলেন চারচন্দ্র ভেদের পরে শরীরে তারা অষ্টদল পদ্ম দেখতে পান ঘুমের ঘোরে, স্বপ্নেসেখানে। বিন্দু প্রতীকের কথাও তারা বলেন। আসলে যেটা মনে হয় একটা ধারণার কথা বলেন তারা। ভাবেন আর স্বপ্নময়তার আবেশে সেই ছবি ফুটে ওঠে। তবে তা একান্তই ঘুমঘোরে কিনা বলা শক্ত। কেননা অষ্টদলের পদ্মচক্র তো আমাদের শরীরে যোগসাধক কখনও কল্পনা করেন না। মূলাধার চতুৰ্দলবিশিষ্ট। স্বাধিষ্ঠান ষড়দল বিশিষ্ট। মণিপুর দশ দলের। অনাহত দ্বাদশ দলের। বিশুদ্ধ ষোড়শ দলের। আজ্ঞা দ্বিদলের। গুরুচক্র শতদলবিশিষ্ট। সহস্রার সহস্রদলবিশিষ্ট পদ্মচক্র। তাহলে অষ্টদলের কথা এল কীভাবে? গানেও কিন্তু অষ্টদল পদ্মের উল্লেখ পাই। মণি গোঁসাইয়ের গানে এর স্পষ্ট উল্লেখই আছে: ‘অষ্ট ক্রোশ গভীরের নিচে রূপের একটা গাছ রয়েছে। / একশত সাত ফুল ত্রিজগৎ তার গন্ধে আকুল/ ফুল ফুটে তার মাসে মাসে মধু খায় ভ্রমর ডালে বসে।।’
