গাইছিলেন বিশ্বনাথ:
আগে দেহের খবর জান গে রে মন,
তত্ত্ব না জেনে কি হয় সাধ।
দেহে সপ্ত স্বর্গ, সপ্ত পাতাল,–
চৌদ্দ ভুবন কার ভ্রমণ।।
এই দেহে হয় চব্বিশ তত্ত্ব,
গুরুবর্ত করে দেখলি না রে
হয়ে অহঙ্কারে মত্ত।
আছে চব্বিশের উপর তিন তত্ত্ব,
যাতে মত্ত হয় রসিকগণ।।
আরো আঠারো চিজে দেহ গঠন হয়েছে,
পিতার চার, আর মাতার চার
দেখ দেহে রয়েছে।
আরো গুরু যে তায় দশ দিয়েছে,
সে কথা কি নাই স্মরণ।।
বলি ওরে মন-কানা, তোর ভ্রম তো গেল না,
দেহের মধ্যে কে আপন-পর, তাও তো চিনলি না।
এবার যত্ন করে গুরুদ্বারে চক্ষে দিলি না রে জ্ঞানাজ্ঞান।।
এই দেহেতে আছে বাইশ মোকাম–
তার কার বা কোন স্থান,
দেখ না খুঁজে, কোথায় বিরাজে
তোর পরম গুরু আত্মারাম।
ক্ষ্যাপা রাধাশ্যাম তুই না জানিস তত্ত্ব-প্রমাণ–
গোঁসাই গুরু চাঁদের এই বচন।।
রাধাশ্যাম বলছেন দেহতত্ত্ব না জানলে বাউল সাধন কখনও কোনওভাবেই সার্থক আকার নিতে পারে না। কেননা মানবদেহতেই মূলতত্ত্বের বাস। দেহকে ঘিরে থাকে উপলব্ধ-সত্তা। বাউল বলেন আত্মা। আত্মা তাঁদের কাছে ভগবান স্বরূপ। বাউল তো কল্পিত মূর্তির ভগবানে বিশ্বাস রাখেন না সাধারণত বাউলের ভগবান আত্মা। এই প্রাণস্পন্দ যুগল দেহসাধনা থেকে উঠে আসা স্পন্দ। ‘ভগবান’ কথাটিই কিন্তু যথেষ্ট যুগল-দ্যোতক। ‘ভগ’ কথার অর্থরূপ গর্ত। ‘বাণ’ হল লিঙ্গ। বাউলও গুহ্যপ্রতীকে বাণকে লিঙ্গই বলেন। নতুন কোনো আলাদা অর্থের প্রতীকরূপ বাণকে তিনি দেখেন না। যা সচরাচর তারা করে থাকেন। তবে যেটা মনে হয় তাঁদের সব প্রতীককল্পেরই একটা সদর্থক ভাবনা থাকে। ভেবেচিন্তেই বাউল সমাজ প্রতীককল্পগুলোকে তৈরি করেছেন। এখানেও সদর্থক অর্থেই তাঁদের ভেতর ভাবনা কাজ করেছে। প্রতীককে তারা অনুভূতিদেশের আলো দিয়েছেন। দিয়েছেন রক্তশব্দ, সমুদ্রশব্দ সব। যার জন্য প্রতীক প্রাণবন্ত তরঙ্গ তুলছে বাউলেরই গানে। চন্দ্র তাঁদের এমনি এমনি কি বাঁ নাক আর সূর্য ডান নাক হয়ে উঠেছে? মোটেই না। ইড়া পিঙ্গলার তেজদীপ্তি নিয়েই তো তারা ডান-বামের শিরোপা ধরেছে। পূর্ণচন্দ্রকে বাউল প্রেম বলেন। প্রেমের ভেতরে তো চিরকালই নরম মাধুর্য এক জ্বলজ্বল করে, বাউল তাই পূর্ণচন্দ্রকে প্রেম প্রতীকে রেখেছেন। ক্ষীরকেও প্রেম নামেই অভিহিত করে থাকেন তারা। ক্ষীরের জমাট নরম মিষ্টতার সঙ্গে প্রেমের ভাষার উৎসার তো সঠিক অর্থেই যায়। নীর তাঁদের কাম বা রজ। আভিধানিক নীর তো জলসূচক। রজ উন্মোচিত আবরণ তাই সে নিয়েছে বাউল-প্রতীকে। তিন, ছয়, পাঁচ প্রতীকেও তো শরীরের কেন্দ্রগত সব মাংসময়তা আছে। দেহে সপ্তস্বর্গ, সপ্ত পাতালের কথা বলেছেন রাধাশ্যাম গানে। শরীরস্থ প্রলয়ঙ্কর শক্তি সব। সাধকগণ তাঁদের প্রতীকময়তার দেহেই জীবন্ত করে রেখেছে। দেহ ব্ৰহ্মাণ্ড। নিয়েই সহজিয়া তাই অন্তর্লোকের অনুসন্ধিৎসাকেই পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছেন গুরুর সংযুক্ত আধারে। দেহকে বাউল ‘পরম পুরুষ’ হিসাবে দেখেন। দেহ আত্মোপলব্ধির একেকটি স্তর। গুরু নির্দেশিত সেই স্তর ভেদ করে সাধক আধ্যাত্মিক উপলব্ধিতে উপণীত হন। আধ্যাত্মিক এই বিকাশ বাউল সাধকের আত্মিক বিকাশ। যুগল সাধনে শরীরস্থ অস্থি চর্মময় আধারে তারা মহারসের আনন্দধারা উপলব্ধ করে থাকেন। বাউল ক্রিয়ামূলক আচরণে চক্রস্থ নাড়িকে সতেজ করে, ষড়রিপুকে দমন করে পঞ্চভূতকে, সপ্তপাতাল আর। সপ্তস্বর্গকে বিকশিত করে সঙ্গিনীর শরীরে সাড়ে চব্বিশ চন্দ্র ছুঁয়ে, অষ্টম ইন্দুকে প্রতিলব্ধ করে ‘অটল’ হয়ে ওঠেন।
অটল কী? একবার প্রবৃদ্ধ বাউল সাধক শশাঙ্কশেখরকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম।
বললেন, বিন্দুধারী ব্ৰহ্ম গো। মনের মানুষ হওয়া তো ব্রহ্মকে ধরে থাকা। ব্রহ্ম আত্মা নাড়ির ধুকপুকানি।
তারাপীঠে আশ্বিণের শুক্লা চতুর্দশী তিথিতেই একবার দেখা হয়েছিল যোগমায়া ভৈরবীর সঙ্গে। সাধুসন্তের সমাগমের উজ্জ্বল এই লগ্নযোগে যজ্ঞ করতে তিনি পৌঁছেছেন। থাকেন আগ্রায়। তার ভৈরব বিশ্বেশ্বর নাকি স্বয়ং শিব। ভক্ত-শিষ্যর এমনই সব মতামত। আর মা আদ্যাশক্তি মহামায়া। তা মহামায়া আমাকে সেই বিকেলে বললেন এমন এক আশ্চর্য কথা, আমি তো শুনে হতবাক হয়ে গেলাম।
মা বললেন, শব্দতে আস্তরজ্ঞান থাকে। শব্দ তাই ব্রহ্ম। একা শব্দ হল প্রকৃতি। শব্দবন্ধ হল তার পুরুষ নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা রূপ। কালী কি?
জিজ্ঞাসা করলাম, কী মা?
–আস্তর ফাটা, দ্যাখ, কালী হল কামনাকেই বশীভূত করে নেওয়া।
–কীভাবে তা হয়?
–কালী তো রতিযোগের নারী ক্রিয়াশীল। তিন রতির এক রতি হল গিয়ে কালী। বিপরীত বিহার করছেন তিনি। শিব নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে। যেন মরে রয়েছে। যুগল সাধনায় নিষ্ক্রিয় শিবকে, পুরুষকে তো শক্তি জাগায়। তাই পুরুষ ব্রহ্মলাভের জন্য শক্তিরূপা কালীর কামনাকে হরণ করে নেন। নিণা কালী অর্থাৎ কামনা সগুণা হয়। আর তা হলেই সাধক অটল অমর হয়ে যায়।
মায়ের এই কথা শুনে আমার বাউলের অটল হবার কথা মনে পড়ে গেল। মা কে বললাম, মা এতে কী সাধক সহজ মানুষ হন?
বললেন, বাউল বলেন ও কথা। ঠিকই বলেন, সাধককে তো সহজ হতেই হবে। সহজ কী?
জিজ্ঞাসা করলেন মা।
বললাম কী মা? আপনি বলুন। আপনার কথা শুনতে চাই।
