চিন্গে মানুষ ধরে
মানুষ দিয়া মানুষ বানাইয়া সেই মানুষে খেলা করে।
কীসে দেব তার তুলনা কায়া ভিন্ন প্রমাণ হয় না।
পশুপক্ষী জীব আদি যত এ সংসারে
দুইটি ভাণ্ডের পানি দিয়া অষ্ট জিনিস গড়ে
তার ভিতরে নিজে গিয়ে আত্মারূপে বিরাজ করে।
মায়া সূতে জাল বুনিয়ে প্রেমের ঘেরে ভাব জাগায়ে
প্রাণেতে প্রাণ মিশাইয়া রহে জগত জুড়ে
নব রঙ্গে ফুল ফুটিলে ডোমর আসে উড়ে
ফুলের মধু দেখতে সাদা আপনি খেয়ে উদর ভরে।
সমুঝ দিয়ে দেখ চেয়ে পুরুষ নহে সবই মেয়ে।
থাকবে যদি পুরুষ হয়ে চল ভেদ-বিচারে
একটি পুরুষ নিজ ছুরতে জগত মাঝে ঘুরে–
লক্ষ নারীর মন জোগাইয়া প্রেমের মরা আপনি মরে।
আমাদের দেখে বলে বসলেন, বসেন।
আমরা পর-পর বসে গেলাম খালপাড়ে। যমুনা থেকে তখন হাওয়া উঠছে সমানে। বাউলের চুলদাড়ি নড়ছে। আমাদের মুখে চকচক করছে চৈত্রের চাঁদ।
জিজ্ঞাসা করলাম, মেলা ছেড়ে এখানে একা বসে গাইছেন? কাউকে বুঝি আর শোনাতে ইচ্ছা জাগছে না?
বাউল বললেন, তা নয়। মেলা হল গিয়ে হাঁ কর্তা। সর্বক্ষণ গিলছে। ভাবলাম একা বসে কিছু সময় ত্রিবেণীরে গান শোনাই।
বললাম এখানে আপনি তিন নদী কোথায় পেলেন?
হাসলেন বাউল। মনে হল চৈত্র-চাঁদ হেসে উঠছে তার মুখে।
–তিন তো সদা সর্বদা আমরা ধরে রাখি কর্তা। তিন তো মাইনষের মইধ্যে খেলা করে। তিনখান নদী লইয়া মানুষ নাড়েচড়ে। কথা কয়। ও কর্তা, মাইনষের ত্রিবেণী তো মাইনষের অন্দরে খেলা করে।
বুঝলাম, বাউল তিনটি নদীস্বরূপা নাড়ির কথা বলছেন।
বললাম, তিন যদি মানুষের মধ্যেই থাকে তাহলে মজা যমুনা খালের প্রতীকে লাভ কী? নিজেকে গান শোনালেই তো হল।
–কর্তা, প্রেমরে কি আপনে দেখবার পারেন? পারেন না। মাইনষের মধ্যে দিয়া প্রেমরে দেখেন। প্রেম যে কর্তা তালে প্রতীক নিল? নিল না? কী কন?
আমি চুপ। বাউলের মুগ্ধতায় নিমজ্জিত হয়ে গেছি। বন্ধুদেরও যেন ত্রিবেণী স্নান হয়ে গেছে রাত নটার কাঁটায়।
বলে চলেছেন বাউল।
মজা যমুনাডারে পিঙ্গলা মনে কইরা যদি ভেতর শানাই, তা কর্তা মনে পড়ব হেইগার মইধ্যে সঞ্জলের স্রোত ছিল। এই যমুনার তো গঙ্গা, সরস্বতীর সঙ্গে মিলন-মিশন ছিল। ত্রিবেণীখান অ্যাহনো যদি দেখেন, তবে দ্যাখবেন সেই ভাব-ভালবাসার রেখাখান দেখা যায়। যমুনা তো আয়নামহলের ঘরডারে মনে করায়। মজা যমুন্না যে ফিসফিসাইয়া কয় দিন গেল, নাড়ি জাগব কবে? যমুনা যে বাড়বাড়ির কাছারি ঘরে হেইডার বিচার চায়। তাই তারে মনে লইয়া মজাডারে গান শুনাই। মানুষ জাগাই। ভেতর-মানুষের আওয়াজ খান শোনেন কর্তা।
একতারাটা টুং টুং করে বাজিয়ে ধরলেন বাউল। গাইতে থাকলেন।
মানুষ হয়ে মানুষ হয়ে কর গো যা মানুষের লীলা
ধরবি যদি সে মানুষে খুলে দে দেহের তালা
মানুষে মানুষ রয়েছে ধর গে মানুষ মানুষের আহে
মানুষে মানুষ পেয়েছে বৃন্দাবনে ব্রজবালা।।
লইলে মানুষের সঙ্গ উথলিবে প্রেমতরঙ্গ
সাক্ষ্মী আছে শ্রীগৌরাঙ্গ কৈলাসেতে পাগল ভোলা
পরমাত্মা রূপে এসে মানুষে মানুষ আছে মিশে
সাধনকল্পে পারি দিশে রবে না আর ত্রিতাপ জ্বালা
দ্বিদল পরে দেয় পাহারা বেদবিধি পার উলটা খেলা।
রাজা হয়েছে দিশেহারা হল না তার মানুষ ধরা
রাজেশ্বরী দিচ্ছে সাড়া যোগ দিতেছে যোগে চেলা।।
আমরা শুনলাম বাউলের মানুষ এসে সাড়া দিচ্ছে ফাঁকা এ ধারে। মেলার কলরবের মানুষ সব যমুনার ফুরফুরে হাওয়ায়, ধবধবে চাঁদে যেন মানুষের লীলায় মেতে উঠছে। না হলে গৌরের জ্যান্ত লীলায় এখনও এত মানুষের সমাগম হয়?
বাউল বললেন, একদিন চাঁদমারী আসেন। বিস্তর গান শোনাব মানুষের। আমার বসতির কাছ ঘেঁষে ইড়া নদী। পিঙ্গলায় তো বসে রইলেন। সরস্বতীটা দেখে আসেন পঁচিশে চৈত্র। ত্রিবেণী শ্মশানঘাটে গান আছে। আসবেন।
উঠে পড়লেন হরি বৈদ্য বাউল। খালপাড় ধরে হাঁটতে হাঁটতে মিশে গেলেন দেবানন্দ গোস্বামী নামাঙ্কিত সৌধের ধার দিয়ে মানুষের স্রোতে।
তাঁকে আর দেখা গেল না। যমুনার ফুরফুরে হাওয়ায় মানুষের অন্তর্দীপ্তি খুঁজে ফেরা বাউলকে মানুষের ভিড়ই মিশিয়ে নিল চৈত্র-পূর্ণিমায়।
*****
‘মানুস-ধরে’ মানুষ চিনবার কথা বলেছেন হরি বৈদ্য বাউল। মানুষ ধরা হল গুরুর কাছে যাওয়া। গুরুর আসন বাউলের কাছে হৃদয় সিংহাসন। গুরুকে তারা পরমতত্ত্ব হিসাবেও ব্যাখ্যা করেন। মানবগুরুও বলে থাকেন বাউল। কেননা বাউলই মানুষ হলে ওঠেন গুরুর নির্দেশিকায়। গুরুই সাধক বাউলকে মানুষে পরিণত করে দেন। তারা মানুষকে ‘মনের মানুষ’, ‘সহজ মানুষ’, ‘ভাবের মানুষ’, ‘রসের মানুষ’, ‘আলেখ মানুষ’ ইত্যাদি নানা অভিধায় ভূষিত করে থাকেন। মনের মানুষ তার কাছে আত্মস্বরূপ। নিজের ভেতর নিজের জ্যান্ত উপস্থিতি, নড়াচড়া, কথা বলা ইত্যাদি নানা ইন্দ্রিয়গত উপস্থিতিকে টের পাইয়ে বাউল গুরু সাধক বাউলকে ক্রমান্বয়ে ‘মনের মানুষ’, ‘সহজ মানুষ’ ইত্যাদির নানা অভিজ্ঞানে পরিণত করান। গানে তাই বলা হয়েছে, মানুষ দিয়া মানুষ বানাইয়া সেই মানুষে খেলা করে।
বাউলগুরু শিষ্যর মানুষ সত্তার বিকাশ দিয়েই মানুষ বানিয়ে দেন সাধক বাউলকে। তখনই এই মানুষের মধ্যে সেই মানুষে খেলা করে সেই মানুষ হল বাউলের নানা তকমাধারী সব মানুষ। গুরু তাঁকে সেই মানুষ’ তৈরি করান। বাউল সাধনায় গুরু তাই ঈশ্বরের মতো। গুরুই শিষ্যকে মানুষের স্থির নিবেশ দিয়ে সহজতার সামনে দাঁড় করিয়ে দেন। গুরু বাউলের অশ্রুময় সত্তা যেন। অন্তরালের আবরণ খসিয়ে গুরুই বাউলকে অন্বেষণের উত্যাক্ষা, অন্তর্লোককে সামনে এনে হাজির করান। বাউল তার সব অসূয়া। কারুবাসনাগুলোকে মুছতে থাকেন গুরু নির্দেশিত সাধনাতে এসে। গুরু তার কাছে সমর্পণ। নিবেদন। গুরু তার বস্তুজগৎকে ভাবজগতের দিকে টেনে নিয়ে যান। গুরুতত্ত্বের গানে বাউল বারবারই সেকথা প্রকাশ করে ফেলেন। লালন সহ প্রাচীন পদকর্তাদের গানে গুরু তাই আত্মবিশ্লেষণে সবসময়ই সজীব হয়ে ওঠেন। গুরু, সাধক বাউলের ব্যার্থতা, জ্বালা, যন্ত্রণা, খরস্রোতকে অগ্নিময় কেন্দ্রাভিগ করে দেন। গুরুর প্রতি যার জন্য সাধক বাউলের আকুতি প্রাচীন, আধুনিক, নবীন সব পদকর্তাদের লেখায় ঝলসে ওঠে। লালনের বহুশ্রুত সেই গুরুবন্দনার গান বাউল আখড়াতে গেলে হামেশাই শোনা যায়। অনেক বাউলকেই দেখেছি আসর বন্দনা সারেন এ গান দিয়েই। গরিফার এ আসরে নবকুমার দা বাউলকে এ গান দিয়েই আসর বন্দনা করতে আমি শুনেছিলাম। মঞ্চে উঠে গুরুপ্রণাম করে বাউল সে আসরে ধরলেন বহুশ্রুত এই লালনের গান। নবকুমারের কণ্ঠ উন্মুক্ত অশ্রুভরা নিমগ্ন বেদনা নিয়ে যেন ছড়িয়ে পড়ল গরিফার মস্ত ফুটবল খেলারই মাঠে।
