নবকুমার গাইতে লাগলেন গান। আসরে তার কাছাকাছি বসে আমি লক্ষ করলাম চোখে তার জল চিকচিক করছে। নবকুমার কাঁদছেন আর গাইছেন:
গুরু, দোহাই তোমার, মনকে আমার লও গো সুপথে।
তোমার দয়া বিনে তোমায় সাধবো কি মতে।।
তুমি যারে হও গো সদয়, সে তোমারে সাধনে পায়;
বিবাদী তার স্ববশে রয় তোমার কৃপাতে।।
যন্ত্রেতে যন্ত্রী যেমন, যেমন বাজায় বাজে তেমন।
তেমনি যন্ত্র আমার মন, বোল তোমার হাতে।।
জগাই মাধাই দস্যু ছিল, তারে গুরুর কৃপা হল।
অধীর লালন দোহাই দিল সেই আশাতে।।
গুরু শিষ্য-বাউলকে কীভাবে সহজ মানুষে পরিণত করান একবার জিজ্ঞাসা করেছিলাম নবকুমারকে।
বাউল বললেন, রিপু মারা শেখান গুরু রিপু মরলে দেহের ইঁদুর-বিড়াল দেহেই খেলে বেড়ায়। বিড়াল ইঁদুরখানাকে খেয়ে আত্মতৃপ্ত হয় না।
–বিড়াল কী? জিজ্ঞাসা করেছিলাম বাউলকে।
বললেন, বিড়াল হল কাম। বিড়ালের যেমন আঁশ ছাড়া, মাছ ছাড়া রোচে না। তেমনই দেহের কামও ছকছক নোলা নিয়ে বসে থাকে কখন ইঁদুরখানাকে খাবে।
জিজ্ঞাসা করলাম, ইঁদুর কী?
–ইঁদুর হল সহজ ইন্দ্রিয়। জ্ঞানেন্দ্রিয় একখানা। আমাদের পাঁচ কর্মেন্দ্রিয়গুলো সরলে পাঁচ জ্ঞানেন্দ্রিয় সাড়া দেয়। কর্মেন্দ্রিয়গুলোই তো রিপু মারে। আর তখনই জ্ঞানের বিকাশ হয়। আর তা হলেই বিড়াল মাছ পর্যন্ত ছোঁয় না। সর্বদা কাশী যেতে চায়। শোনেননি নাকি সেই গান?
বাউল এবার সুর ধরলেন একতারায়। সঙ্গত দিলেন ঘরোয়া সান্ধ্য আসরে। গাইলেন না। গেয়ে উঠলেন তাঁরই শিষ্যসামন্তের একজন গুরুরই নির্দেশিকায়।
বিড়াল বলে মাছ খাব না, আঁশ ছোব না কাশী যাবো।
আবার বার মাসেই একাদশী, আমি বিশ্বনাথের প্রসাদ পাবো।
উঠি এক নেংটি ইঁদুর, ও তার কপালে টিপ মাথায় সিঁদুর
(বলে) আমি ঢাকাই শাড়ি পরে আবার মেজদার বৌদি হবো।
উঠি এক কোলা ব্যাঙ আবার বের করে সে লম্বা ঠ্যাং;
(বলে) আমি এক লাফেরে লঙ্কা গিয়ে, রাবণ মেরে রাজা হবো।
উঠি এক লাল পিপড়ে, সে বলে, আমি চলি কলে কৌশলে
আমি রেললাইনে মাথা দিয়ে বোম্বাই মেল আটকাবো।
আবার রাস্তা ধারের কেলে কুকুর, সে বলে, হব আমি কেষ্টঠাকুর
আমি কদম তলায় লেজ নাড়িয়ে শ্যামের বাঁশি কেড়ে নেবো।
নবকুমার বললেন, গুরুর সান্নিধ্যে এলেই দেহের বিড়াল মাছ ছোঁয় না। মাছ তো কাম। কাশী কাম মারার তীর্থক্ষেত্র। মহাদেব স্বরূপ তার অবস্থান। এই মানবদেহ। তার শুদ্ধতার জন্যই তো একাদশী করা। ইন্দ্রিয়গুলোকে মনে নিয়ে বোঝাপড়া সারা। সারতে গিয়ে নেংটি ইঁদুরখানা বেরোয়। ব্যাঙ বেরোয়। পিপড়ে আসে। এগুলো সব গিয়ে মদমত্ততাকে সামলায়। বাউল কী তার আর একা পারে? তখনই গুরু লাগে।
গুরুতত্ত্বের আরেক গান শুনেছিলাম নিত্যানন্দ বালার নতুনপল্লীর আখড়াতে বসে। নিত্যানন্দ সেদিন ছিলেন দারুণ মুডে। ভক্তশিষ্য পরিবেষ্টিত একেবারে। সবে সতীমার মেলা ভেঙেছে গতকাল। আজও সব বাউল যেয়ে উঠতে পারেননি আখড়া ছেড়ে। নিত্যানন্দর বাড়ির আখড়াতেও বাউল গমগম। সন্ধ্যার আসরে ক্রিয়াকরণের পর গেয়ে উঠলেন পাঞ্জু শাহের পদখানা।
গুরু-রূপে নয়ন দে রে মন
গুরু বিনে কেউ নাই তোর আপন।।
গুরু-রূপে অধর মানুষ দিবে তোরে দরশন।।
পিতার ভাণ্ডে কি রূপ ছিলি,
মায়ের গর্ভে কি রূপ হলি, মন,
পূর্ব-পরে নিরন্তরে গুরুরূপে নিরঞ্জন
রজবীজে মিলন কে করিল,
কোথায় আছে তার আসন,
ব্রহ্মাণ্ডের গড়ন গড়ে সে কোন্ জন।।
কোথায় ছিলি, কার বা সাথে ভাবে এলি, ওরে মন।
অধীর পাঞ্জ বলে, গুরু ধরে কর তার অন্বেষণ।।
নিত্যানন্দ বললেন, তা খ্যাপা আপনি মনের মানুষের কথা বলছিলেন না। সেদিন? আজ বলি দেহ না জাগলে চিনবেন কী করে তারে দেহ তো সাতে আবদ্ধ।
জিজ্ঞাসা করলাম। কী এই সাত?
বাউল বললেন, সাত সপ্তধাতু। যা দিয়ে স্থূল দেহ তৈরি। শুক্র-রজ, রক্ত, মাংস, মেদ, অস্থি, ত্বক–এই সাতে শরীর গঠিত। তাতে আবার পাঁচের সমন্বয়–ক্ষিতি, অপ, তেজ, মরুৎ, ব্যোম। এই এগারোর আবাসভূমি শরীর। গুরু চেনান তারে।
–কীভাবে চেনান গুরু?
–সে বড়ো কঠিন কাজ। চক্ৰ চেনেন আপনে?
মাথা নেড়ে বললাম, না। সেভাবে তেমন জানি না। তবে নটা চক্রের কথা শুনেছি। বললেন, এত অল্পজ্ঞানে ‘মনের মানুষ বুঝবেন কী করে আপনি?
বললাম, সহজভাবে বলুন না। যদি ধরতে পারি।
–কী করে ধরবেন খ্যাপা? আগে গুরু ধরেন। তবে তো আপনে মানুষ ধরবেন। ইচ্ছা করে কিছু বললাম না। কেবল হাসলাম। আসলে আমার জানাটা কেবল নয়–নিত্যানন্দর জানাটা দিয়ে আমি জানতে চাইছি আজকের বাউল সমাজকে। তার পেশা গান। গানের জন্য দরবার করেন তিনি। এখানে-ওখানে ছুটে বেড়ান রীতিমতো গৃহী বাউল তিনি। ঘোষপাড়ার প্রায় সমস্ত বাউলই এখন তাই। তার মধ্যে দু’একজন কেবল সাধনভজন করেছেন কিছুটা। নবকুমার তাঁদের একজন। সাধন-সঙ্গিনী কৃষ্ণাকে নিয়ে বাউলপাঠ শুরু করেছিলেন। এখন নতুন সঙ্গিনী নিয়ে আছেন। তবে গায়ক বাউলরা তত্ত্বটাকে বেশ রপ্ত করেছেন। গান বেচে, তত্ত্ব বেচে, খানিকটা গুরুগিরি করে তারা পেট চালান। ভক্ত শিষ্য জোটান। তবে নিত্যানন্দ কথা বলেন সুন্দর। তার গানেরও সুনাম আছে বেশ। ডাক আসে দূর-দূরান্ত থেকে। ভক্ত-শিষ্যর সংখ্যাও তার কম নয়। রীতিমতো নবকুমারের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা চলে।
