জগদীশ পণ্ডিতের শ্রীপাঠে একদিন অতি বৃদ্ধা বৈষ্ণবী আমাকে বলেছিলেন, তা ছেলে তুমি আমি কেউ পুরুষ নই গো।
তাহলে আমরা সব কী? জিজ্ঞেসা করেছিলাম বৈষ্ণবীকে।
বৈষ্ণবী বলেছিলেন, কী আবার? কৃষ্ণের পৃথিবীর আমরা সব হলাম গিয়ে নারী। তা তুমি ছেলেই হও আর মেয়েই হওকৃষ্ণ একা বেটা ছেলে। জোয়ান মরদ। পুরুষ।
শ্রীনিবাস গোস্বামীও এই শ্ৰীপাঠে বসে একদিন বলেছিলেন, আমরা সব নারীবেশে চৈতন্য হয়ে কৃষ্ণের উপাসনা করি। চৈতন্য কেবল মহাপ্রভু নন। চৈতন্য আমাদের বিবেক, বৈরাগ্য আর জ্ঞান। এই তিনের বিকাশ হলেই আমরা বুঝতে পারব আমাদের স্বরূপ নারীর।
–আপনি তো চৈতন্যদেবের রাধাভাবে উপাসনার কথা বলছেন?
–তা নয়। তা নয়। চৈতন্যদেবই আমাদের বুঝিয়েছিলেন রাধাভাবে উপাসনা করে শরীর থেকে কামের সব বীজমন্ত্র ঝেরে ফেলতে। তাই তো কামগায়ত্রী।
বাউলও সে কথা বলেন। সঙ্গিনীর শরীরে ‘সাড়ে চব্বিশ চন্দ্র’কে তারা জাগিয়ে নিয়ে কামগায়ত্রী রচনা করেন। কামবীজকে ধ্বংস করে দেন এভাবে তারা।
.
বহুল প্রচারিত পদটিতে আমরা দেখেছি চাঁদকে ফাঁকি দিয়ে ভোট নেবার কথা বলছে অজ্ঞাত পদকর্তা। ভোট’ এখানে নির্বাচন ঠিকই। এই নির্বাচন সাধনার মৌলিক প্রত্যয়। যেখানে ফাঁকি দিয়ে আর ভোট নেওয়া যাবে না, মানে সাধনা চলবে না, কারণ ভোটার অর্থাৎ সাধক চিনে গেছেন চাঁদকে। চাঁদের চলিষ্ণুতা শরীরস্থ সাক্ষ্যে হাজির করে। দিতে জানেন সাধক। সাধনায় তাই চাঁদ চেনা জরুরি। সাধকরা এখন তা চিনে গেছেন। প্রথমে সাধক চাঁদকে আদর করে কমিশনার করে দিয়েছিলেন। কিন্তু চাঁদ গুরুত্ব দেয়নি। ভোটারকে। চাঁদ অহংকারে মত্ত ছিল। পদকর্তা বলছেন–চাঁদের পাওয়ার তিন বছরের। তিন–তিনটে নাড়ি ঠিকই। কিন্তু এখানে ‘তিন’ সাধনার প্রথম তিনটে স্তর–স্থূল, প্রবর্ত, সাধক। এই তিন স্তরে চাঁদের ভূমিকা অনিবার্য। তার ‘পাওয়ার স্বীকার করেন দেহসাধক। চন্দ্র ঠিকঠাক সাড়া না দিলে সাধনা মোহাবস্থাতেই থেকে যাবে। সিদ্ধ দশাতে আর যাবে না। কখনও। তাই তিন বছর অর্থাৎ তিন স্তরের রঙ্গভূমিতে চাঁদের ইতিবাচকতা রয়েছে। সাধক বাউল যার জন্য তখন চাঁদের দৌরাত্ম সহ্য করেন। তারপর সিদ্ধদশাতে চাঁদ দিয়ে কাম বশীভূত করে নিয়ে তিনি চাঁদকেই চোখ রাঙান।
০১.২ দেহের খবর জান গে রে মন
চৈত্র-পূর্ণিমার চাঁদ নিয়ে কুলের পাটের মেলা সাজে। চাঁদ যেন এক চৈতন্য। যমুনা-খালে আদিগন্ত ছড়িয়ে যেয়ে যে যখন তার হাসি ছড়ায় আর বাতাস ফাঁকা ধানের মাঠে সরু খালের জলীয় হাওয়া তুলে এনে ধানকে বাজায়, তখন মনে হয় নদিয়ার জ্যান্ত গৌর হাসছেন আর তাঁর হাসিই খলবল বেজেবেজে যাচ্ছে ধানের মাঠে। এ মেলার ধারক-বাহক আমাদের গৌরই। চৈতন্য স্মৃতি-বিজরিত এ মেলা। কুলিয়ার পাটের মেলা। লোকে বলে কুলের পাটের মেলা। অনেকে আবার বলেন, অপরাধ ভঞ্জনের মেলা। কথিত: বিশিষ্ট তার্কিক দেবানন্দ গোস্বামীকে চৈতন্যদেব এখানেই তর্কযুদ্ধে পরাজিত করেছিলেন। তার্কিক হিসাবে যথেষ্ট সুনাম ছিল দেবানন্দের। এ বিষয়ে তাঁর যথেষ্ট অহংকার তৈরি হয়েছিল মনে যে, তাঁকে তর্কযুদ্ধে পরাজিত করবার মতো কেউই নেই। নবদ্বীপের তাবড় তাবড় সব পণ্ডিত তাঁর সঙ্গে তর্কযুদ্ধে একেবারে কুপোকাত হয়ে গিয়েছিলেন। এ-হেন তার্কিককে যখন চৈতন্যদেব পরাস্ত করেছিলেন, তখন অবশ্য চৈতন্যদেবের পরিচিতি বাংলা-বিহার-ওড়িশা ছড়িয়ে পড়েনি। সাধারণ এক শাস্ত্রজ্ঞ যুবকের কাছে পরাজিত হয়ে দেবানন্দের চোখ খুলে গিয়েছিল। তিনি নাকি চৈতন্যদেবের কাছে তখন তাঁর অহংকার জনিত সব অপরাধ স্বীকার করে নিয়েছিলেন আর নদিয়ার গৌর তাঁকে ক্ষমা করে দিয়েছিলেন। সেই মাহাত্মেই প্রচুর মানুষজন, সাধুগুরু, বৈষ্ণব-বাউল সব আসেন এখানে। যে যার অপরাধ স্বীকার করে নেন শ্রীপাঠের গৌরমূর্তির কাছে। নামকীর্তন চলে। বাউল। গানও হয়। তুলনায় নির্জন খালের ধার ফাঁকা থাকে। ওখানে বসে লোক হাওয়া খায়। দু’দণ্ড জুড়ায়।
আমরা দুই বন্ধু যে উদ্দেশ্যেই মাঝ-মেলায় গিয়ে বসলাম খালপাড়ে। মানুষজন কেউ নেই। মেলা তখন আমাদের গৌরচাঁদের ঝলক নিয়ে তার বিকিরণ ছড়াচ্ছে সমানে।
সবে বসেছি আমরা। শীতল জ্যোৎস্নায় চোখমুখ সব চকচক করছে, চুল উড়ছে। সুজিতের থলথলে পাজামায় হাওয়ার মাতন লেগেছে। ও দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সিগারেট খাচ্ছিল।
হঠাই শুনি একতারার বোল উঠেছে খালধার থেকে ভেসে আসছে গান। তার রেশ কানে এসে লাগছে আমাদের। আমরা উঠে গান বরাবর এগিয়ে গেলাম। সুজিত বলল, যা সিগারেটটা শেষ করে যাচ্ছি।
গিয়ে দাঁড়ালাম আমরা বাউলের পাশে। একমনে গেয়ে চলেছন তিনি। চেনা গান আমার। কতবার কতজনের মুখে যে শুনেছি জালালউদ্দিনের এই পদ। একেক শোনায় একেক আবেশ এনে দিয়েছে মনে। আজকে বাউল যেন মানুষের উচ্চ্যমন্য, অহংকারী সত্তা সব এক-এক করে খুলে সাজিয়ে রেখে দিচ্ছেন যমুনাখালের তাল তাল শক্ত কাদায়। মানুষের দ্বৈততা, তাঁর গ্রামীন ও নাগরিক যাপন সংক্রান্ত প্রচলন সব যেন বাউল খুলে ফেলছেন মানুষের আসল ব্যক্তিময়তায়। তেমনই আমার মনে হচ্ছে। ভাবছি, চৈতন্যের অন্তর্গত সত্তা এখনও এতখানি করতে পারে?
বাউল গাইছেন:
