চাঁদ আসলেই এক প্রতীকী অবিচ্ছেদ্যতা। প্রকৃতি-পুরুষে। সাধক-সাধিকাতে। সাধক-সাধন সঙ্গিনীতে চাঁদ সদানন্দ ভাবের পরিবেশ তৈরি করে দেয় সাধক শরীরে।
দশমহাবিদ্যারূপে শক্তির যে নানা রূপ দেখি আমরা, সেখানে আদ্যাশক্তি হিসাবে কালী কৃষ্ণবর্ণা। দেশশক্তি হিসাবে তাঁর নাম তারা। এরূপে তিনি নীলবর্ণা। এই দুই রূপই কল্যানময়ী মাতৃরূপ। দু’জনেরই কপালে চন্দ্রকলা বর্তমান। দেশ ও কাল অনন্ত বলে মানলেও কালের উৎপত্তি ও লয় আছে। দেশেরও উৎপত্তি ও লয় আছে। চাঁদ সেই উৎপত্তি ও লয়কেও প্রতীকী অর্থে প্রকাশ করে। ওঠে ও ডুবে যায়। যদিও বিজ্ঞান বলছে চাঁদের রূপ দিনের আকাশেও থাকে সূর্যের তেজস্ক্রিয়তায় চাঁপা পড়ে। তাহলে এটাও তো ঠিক চন্দ্র ও সূর্য দেশ ও কালে সর্বশক্তিসম্পন্ন। তাদের উপস্থিতি মহাশূণ্যে সবসময়। শরীরকেও সেই প্রতীক দিয়ে বসেন সাধক। শরীরের নাড়ি তাই হয়ে ওঠে চন্দ্র ও সূর্য নাড়ি। চক্রে চক্রে বিরাজ করে চাঁদ। তার বলবীর্যকে আমরা দেখি সাধকের শরীরে। চাঁদ এভাবেই ভাবের মাত্রাকে বৈভব এনে দেয়। চাঁদে যান মানুষ। চন্দ্রকে আহ্বান করেন। আবিষ্কার করেন চাঁদে প্রাণের প্রহর কোন ছোটবেলাতে মা তো আকাশের চাঁদ দেখিয়েই শিশুকে বলেন–’আয় আয় চাঁদমামা টী দিয়ে যা। / চাঁদের কপালে চাঁদ টী দিয়ে যা।‘ আর ঠিক তখনই চাঁদমুখ শিশুর হাসি ফোটে মুখে চাঁদের বুড়ির চরকা কাটার গল্প এখনও এই কম্পিউটার, সিডির যুগেও ঠাকুমা-দিদিমার মুখে হাঁ করে শোনে বাচ্চারা। চাঁদকে তেমন করেই দৃশ্যত হাজির করেন বয়স্করা। তাঁদের বাত-বেদনার সঙ্গেও জড়িয়ে যায় চন্দ্র মহিমার কথা। পূর্ণিমা অমাবস্যাকে তারা ব্যথা প্রকটের কাল হিসাবেও চিহ্নিত করেন। এ সময় রসস্থ হয়ে ওঠে শরীর। তাই ব্যথা প্ৰকটে তারা ময়দা-আটা খান। ভাতকে বর্জন করেন। বাউলের ‘রস’ শুক্র-রজ বা বীর্য-রজ অমাবস্যার মহাযোগে ‘চারচন্দ্র’, ‘সাড়ে চব্বিশ চন্দ্র’র প্রতীকে, ইশারায় ইন্দ্রিয়কে অচল করে দিয়ে, প্রবৃত্তিকে নিষ্কাম করে নিয়ে চন্দ্রের আধিপত্যকে চিহ্নিত করে। পদকর্তা বাউল তাই চন্দ্রপাঠের ইস্কুলে গিয়ে অকৃতকার্য হয়ে গেয়ে ফেরেন: ‘চাঁদ আমার ভাগ্যে’ হল না। এই অকৃতকার্য শিষ্যকে কৃতকার্য হবার প্রতীকী মন্ত্র। সাবধান বাণী। বাউল তাই বারবারই গেয়ে ফেরেন চাঁদের কথা চন্দ্র নিয়মের মুদ্রিত অক্ষর নিয়ে লেখা হয় অজস্র গান। চন্দ্রবিধি, নিষেধাজ্ঞা, পালন, নির্দেশ, শিক্ষা, চর্চা, প্রচার, সাধনা সবই একাকার হয়ে যায় বাউলের এ সব গানে। তেমনই এক গান শুনেছিলাম চৈতন্য বাউল আশ্রমে।
গাইছিলেন বাউল:
চাঁদের বিবরণ জানে যে জন সুজন বলি তারে
চাঁদ অমাবস্যা হলে চলে যায় পাও-তলে দক্ষিণ কনিষ্ঠ আঙুল ভিতরে
চাঁদ প্রতিপদ হলে চলে যায় পাতালে দ্বিতীয়াতে মিলে পায়ের উপরে
থাকে তৃতীয়াতে পায়ের গোছোতে মিলে চতুর্থীতে হাঁটুর উপরে।।
পঞ্চমীতে তায় জানুর উপর রয় ষষ্ঠীতে কোমরেতে যায়
সপ্তমীতে স্থিতি নাভিতে বসতি অষ্টমীতে রয় বক্ষ মাঝারে
নবমী যোগেতে কণ্ঠ ‘পরে আসে দশমীতে ঠোঁটের উপরে
একাদশ যোগে থাকে নাসিকাতে মিলে দ্বাদশ চোখের ভিতরে
ত্রয়োদশী হলে যায় কপালে চতুর্দশীতে পূর্ণিমা যে
পূর্ণিমাতে রয় পূর্ণ মগজেতে আর্জান বলে ধন্য সাধুতে হরে।।
এই পদে দেহে চন্দ্র পরিক্রমার কথাই বলা হয়েছে। ‘সাড়ে চব্বিশ চন্দ্র’ পরিক্রমা করেন সাধক সাধিকার শরীরে। সেই পরিক্রমারই বর্ণনা রয়েছে এই গানে। ‘চাঁদ অমাবস্যা হলে চলে যায় পাও-তলে দক্ষিণ কনিষ্ঠ আঙুল ভিতরে’। অমাবস্যা এখানে রজঃপ্রবৃত্তির কাল। যে কালে সাধক চন্দ্র পরিক্রমা শুরু করেন। সঙ্গিনীর পদনখে (পাও তলে দক্ষিণ কনিষ্ঠ আঙুলে ভিতরে), প্রতিপদে চাঁদ অবস্থান করে পাতালে। পাতাল’ এখানে অষ্টম চন্দ্রের যোনি। দ্বিতীয়াতে পায়ের উপরে। তৃতীয়াতে গেছে। চতুর্থীতে হাঁটু। চাঁদ এভাবে সঙ্গিনীর প্রত্যঙ্গ গুলোকে ছুঁয়ে দিচ্ছে। চাঁদ হল চন্দ্র সাধক। যার চন্দ্ররূপী নাড়ি, চন্দ্র চক্র সব জেগে গেছে। সিদ্ধির পরিস্থিতি তৈরি হয়ে উঠেছে। পূর্ণিমার চাঁদ। সাধকের প্রেমময়তা। জ্ঞান ও বোধিচর্চার গুরুকেন্দ্রিক ভাব-উপলব্ধি। আর্জান শাহের আরেকটি পদে পাই–’আগে পড়গা ইস্কুলে প্রথম যে স্বরে অ-এর স্বর যেও না ভুলে। / অ-এতে অন্ধকার ছিল স্বর বেয়ে আলো করিল/ একা চন্দ্র টলে গেল পক্ষ গেল মিলে।’ ‘চন্দ্র টলা’ মানে গুরু নির্দেশিত সাধনার ভিতটুক নড়ে যাওয়া। ‘টলা’ মানে হল শুক্র বা বীর্য স্খলিত হয়ে যাওয়া সাধিকার যোনির ভেতর। বাউল ‘অটল মানুষ’ হওয়ার কথা সব সময়ে বলে থাকেন। ‘অটল মানুষ’ হল ঈশ্বরতুল্য মানুষ। মূর্তিময়তায় সাধারণত বাউলের বিশ্বাস নেই। ‘ঈশ্বরতুল্য মানুষ’ হল ‘বস্তুরক্ষার মানুষ’। শুক্র সঞ্চয়ের মানুষ। শুক্রের অধগতি না আসা হল ‘অটল মানুষের’ সাধনলব্ধ ফল। সাধক বাউল দেহমিলনে সাধক শরীরকে উধ্বগতি দিয়ে বস্তুরক্ষা করে থাকেন। বাউল সাধনাতেও বস্তু বিসর্জন একেবারে নিষিদ্ধ। বাউল বলে রজঃপ্রকাশের তিনটি দিনে সঙ্গিনীর শরীরে কোনওরূপ কাম থাকে না। তার জন্যই সাধনে শুক্র স্খলিত হয় না। ‘প্রেমজন্ম’ হয়। সন্তান জন্ম হয় না। এই জন্ম সিদ্ধ সাধকের জন্ম। বাউল বলেন কামগায়ত্রী থাকে সাড়ে চব্বিশ চন্দ্রে।
