*****
অগ্রদ্বীপে মীরা মোহান্তের আখড়ায় বসে শুনেছিলাম চাঁদের আরেক গান। ঘোষপাড়ার মেলা ঘেঁষে শেষাশেষি ফাল্গুনে এ মেলা অনুষ্ঠিত হয়। দোলপূর্ণিমার পরের একাদশী তিথিতে বসে অগ্রদ্বীপের মেলা। লোকে বলে ঘোষঠাকুরের মেলা। মেলার প্রথম দিন চিড়া-মচ্ছব চলে। দ্বিতীয় দিন অন্ন-মচ্ছব সেবার প্রথম উপস্থিত হয়েছি অন্ন-মচ্ছবের দিনে। গিয়ে দেখি ভাত আর তরকারি রান্না চলছে সমানে। গর্ত খুঁড়ে কলাপাতা পেতে ঢালা হচ্ছে তাতে ভাত তরকারি। সেই গরম ভাত পেটে পড়েছে বেলাবেলি। সন্ধ্যার আখড়া সাজেনি তখনও। ভক্ত-শিষ্য, বাউল সব এধার-ওধার ঘোরাফেরা করছে। নদীর ঠাণ্ডা উঠে আসছে হাওয়ায়। মীরা মা গল্পগাছা করছেন ভক্তদের সঙ্গে।
আমার কথা চলছিল কাঁঠালতলার রতন বাউলের সঙ্গে। বললেন প্রতিবার এ আখড়াতেই এসে ওঠেন। কথা চলতে চলতে চলে গেল চন্দ্রকথায়। একতারাটা তাঁর বসবার পাশেই ছিল কাত হয়ে শুয়ে। যেন সেও মচ্ছবের ভাত-তরকারি পেটে পুরে ঝিমুচ্ছে। তুলে নিলেন রতন। ঘুম ভাঙল একতারাটার। টুং টাং হতেই মীরা মা ফিরে বসলেন এদিকে। আলোচনা শ্লথ হয়ে ঘুরে বসল বাউলেরই গানে। রতন বাছার গাইলেনঃ
আমি চাঁদকে চিনলাম না আমার লগ্নেতে চাঁদ ছিল না
চাঁদের হাতি চাঁদের ঘোড়া চাঁদের গরু চাঁদের মেড়া চাঁদ জগৎজোড়া
সেথা চাঁদে চাঁদে লেনাদেনা চৈতন্যের কেনাবেচা।।
চাঁদের হাট চাঁদের বাজার চাঁদ পসারি হাজার হাজার
চাঁদের ওজনদার।।
সেথা লক্ষ লক্ষ ভাবের ভাবী অসংখ্য চাঁদ যায় জানা।
সাড়ে চব্বিশ চন্দ্র আছে কামগায়েত্রী কামবীজের কাছে
সাধক চাঁদ সাধে
ক্ষেপাচাঁদ গোঁসাই বলে সে চাঁদ আমার ভাগ্যে হল না।।
রতন বাউলের গানে আখড়া হয়ে উঠল চাঁদের হাট। ভক্ত-শিষ্য সমবেত হল সব। সেজে উঠল আখড়া। রাতের আখড়ায় গান শুরু হয়ে গেল রতনের গানে। মীরা মা। বললেন, আসর বন্দনার আর দরকার নেই। চন্দ্র বন্দনা হয়ে গেছে।
বাউল বললেন আমায়–অমাবস্যা তিথি আসছে গো সামনে। আজ দ্বাদশী তিথি চলছে।
আবার একতারা তুলে নিতেন বাউল। মাইক এল। এল নানা বাদ্যযন্ত্র। ডুবকিতে চাপর পড়ল। বোল উঠল খমকেও। গান শুরু করে দিলেন বাউল।
বললেন, আরেকখান চাঁদের গান গাই। বাবুরা সব এয়েছেন চন্দ্রকথা শুনতে। জানছেন। বুঝছেন। শুধোচ্ছেন সব। তা বাবুরা, দেখেন এবার চাঁদ কী কইছে। আপনাদেরও তো চাঁদপানা মুখ।
গৌরচন্দ্রিকা সেরে আবার গান ধরলেন বাউল। পরিচিত সেই গান। পূর্ণচন্দ্র দাসের কণ্ঠে বহুবার শোনা।
ও চাঁদ ফাঁকি দিয়ে ভোট নেবে, ভেবেছ আবার।
তোমায় চিনে গেছে সব ভোটার।
যেমন করেছ বোকামি, দেহ আক্কেল সেলামি,
বেলতলাতে বল ন্যাড়া যায় হে কতবার!
দেশের ভালো হবে বলে, মিলিয়া সকলে,
আদর অরে কল্লেম কমিশনার।
তার রাখলে খুব ধর্ম, করলে উচিত কর্ম
এমন ফিকির আঁটছ গলায় ছুরি দেবার।।
রইলে মনের মত হয়ে ডাকতেম সব সয়ে,
রাখতে পারলে কৈ তেমন পশার
কিসের অহঙ্কারে মত্ত, কদিন এই ইন্দ্রত্ব
তিন বছর বই আর তো, রবে না পাওয়ার।
তোমার নয় হে পিতৃশ্রাদ্ধ, সে করবে যে বরাদ্দ,
কড়া কথায় কারো নাই অধিকার।
যখন সাধারণের টাকা, সকলকে চাই ডাকা,
একলা হরির খুড়া কে তুমি তার।
তখন কাছা দিয়ে গলে, আমায় ভোট দাও বলে,
দ্বারস্থ হয়েছে সবার।
সেদিন গেছে চলে, এখন গেছ ভুলে,
দেখলে যেন চিনতে পার না আর।
করে গরবীকে পেষণ, শুষ্ককে শোষণ
সেই রক্তের ধনে তোমার এই কি ব্যবহার।
ওহে তিল কাঞ্চন হলে, অনায়াসে যায় চলে,
কর বৃষোৎসর্গ পরের ভাঁড়ারে।
আসরে দেখলাম চাঁদের আকর্ষণে এতক্ষণে জোয়ার নেমেছে। ভিড় বেড়েছে। আখড়া ছেড়ে মেলায় ঘুরে দেখি পিলপিল করছে মাথা।
বাউলের প্রথম গানে ‘চাঁদ’কে চিনতে পাড়ার কথাই বলা হয়েছে। বাউল বিশ্বাস করেন চন্দ্রময় মানুষের উপস্থিতি। তার শরীরে চাঁদ প্রতিনিয়ত খেলা করছে।
রতন বলেছিলেন, বাবুমশাই চাঁদ কী কেবল জলে খেলিছে, চাঁদ শরীরের জলকেও টানছে। উপরে তুলি দিচ্ছে।
আমি বুঝলাম রতন বীর্যর ঊর্ধ্বগতির কথাই বোঝাতে চাইছেন আমাকে।
এ গানে বাউল সাধকের আপশোস চাঁদ তার চেনা হল না। লগ্নে নেই চাঁদ। বাউলের নশ্বরতায় চাঁদ তাঁকে অমর, অনন্ত, অসীমের সন্ধান দেয়। সাধকের সাধনাকে চাঁদ সিদ্ধ গুণসম্পন্ন করে দেয়। বাউল তাই চন্দ্ৰসাধনাতে জোর দেন। গুরু সাড়ে চব্বিশ চন্দ্রের কাজ দেখান। সাধক তা প্রতিস্থাপন করেন সঙ্গিনীর শরীরে। সেই চাঁদের অসিদ্ধি, বেদনা, তার জন্য হাহাকার, আর্তি ফুটে উঠেছে পদকর্তার গানে। দেহচিত্তপ্রাণমন সব ঢেলে চন্দ্র উপাসনা করতে শেখান গুরু। সাধক সেই উপাসনার আস্তরণটুকু সরাতে পারেননি এখনও। কারণ চাঁদ তার আয়ত্ত্বে নেই এখনও। চাঁদ আয়ত্ত্বে না এলে সাধকের সিদ্ধির জন্য সাধনা করা বৃথা। কীভাবে চাঁদ আয়ত্ত্বে আসবে? পদকর্তা বলছেন: চাঁদ সর্বত্র ছড়িয়ে রয়েছে। চাঁদের হাতি, ঘোড়া, গরু, মেড়া, চাঁদ জগৎজোড়া। হাট বাজার লেনাদেনা সবেতেই চাঁদ। পদকর্তা আসলে বোঝাতে চাইছেন চন্দ্রময় মানুষের উপস্থিতি। আমাদের নাড়ি, চক্রে চাঁদ কীভাবে তার স্পর্ধিত শাসন চালাচ্ছে। কীভাবে সাধককে চাঁদ নিয়ন্ত্রণ করছে সেসব আমরা বলেছি।
