খ্যাপা মনোহরও চন্দ্রতত্ত্বের অনুপ্রেরণা নিয়েই এই ধরণের একটি পদ রচনা করেছিলেন জয়দেব-কেন্দুবিতে বসেই। গানের নীচে তারিখ রয়েছে ১৬-১-১৯৭০ সেই গানটিও আলোচনা প্রসঙ্গে আমরা দেখে নিই একবার।
খ্যাপা মনোহরের পদ:
চাঁদ উঠেছে চাঁদের গায়ে
তোমরা ভেবে করবে কী,
বাপের পেটে মায়ের জনম।
তারে তোমরা বলবে কী
চাঁদ উঠেছে চাঁদের গায়ে
তোমরা ভেবে করবে কী।
অমাবস্যায় একাদশী
বিধবা রহিল বসি
পূর্ণচন্দ্র কালশশী
নাম ধরে তার ডাকবে কী।
বাপের পেটে মায়ের জনম
তারে তোমরা বলবে কী।
প্রতিপদে পূর্ণিমা যার
(ক্ষ্যাপা) তিন ধারাতে জনম রে তার
গঙ্গা যমুনা সরস্বতী
বাপের দোহাই দিবে কী।
চাঁদ উঠেছে চাঁদের গায়ে
তোমরা ভেবে করবে কী,
বাপের পেটে মায়ের জনম
(ক্ষ্যাপা) তারে তোমরা বলবে কী!
দুটি পদের প্রথমেই দেখছি ‘চাঁদের গায়ে চাঁদ লাগার কথা রয়েছে। অর্থাৎ কিনা গুরু-শিষ্যের মিলনের কথাই এগুলোতে সব প্রতিভাত আছে। গুরু শিষ্যকে নির্দেশ দিচ্ছেন, টানছেন যেন চুম্বকদণ্ডের মতো। শিষ্য সেই প্রতিধর্মের লৌহকণিকা। লেগে যাচ্ছেন গুরুর গায়ে। অর্থাৎ কিনা গুরুর নির্দেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করে চলেছেন শিষ্য বাউল। সাধন এলাকার এই মার্গ নিয়ে তাই আমাদের ভাবনার কিছুই নেই। বাকসংযমের অনুধাবনীয় স্তরেই যেন আমাদের দাঁড়িয়ে থাকতে বলেছেন সাধক পদকর্তারা সব। মদন শাহের পদে এরপর রয়েছে ‘ঝিয়ের পেটে মায়ের জনম’। খ্যাপার পদে আছে আছে বাপের পেটে মায়ের জনম।
‘ঝি’ সন্তানের ইঙ্গিত দিচ্ছে। গুরু এখানে সন্তানের পদমর্যাদা পাচ্ছেন। গুরুর বেদবানী পালন করছেন শিষ্য। মানে হল গুরুকেই লালন করছেন তিনি। তাই গুরুর প্রতীকী রূপ পদে ‘ঝি’ বলেই। ‘ঝি’ প্রতিরূপ খ্যাপার গানে এসেছে ‘বাপ’ হয়ে। ‘বাপ’ গুরুতুল্য। বাপকে লালন করছেন মা। ‘মা’ বা মাতৃঅংশ বাউল সাধক নিজে। তিনি সাধনার দ্বারা যেন গুরুকে ধারণ করেই আছেন। তারই কথা বলেছেন পদকর্তারা। প্রতীকের সন্নিহিত আবেশ ভাঙ্গলে শিষ্যর গ্রন্থিমোচন হয়ে গুরুর আধারিত অংশ নিয়ে তিনি মাতৃভাবে প্রসাদ পেয়ে সন্তানস্বরূপ ধারণ করে থাকেন গুরুকেই। পদকর্তাদের এই অস্তিত্বরহস্য অনিবার্যের ইশারা। যা ভাষার প্রভাতী আলাপনের বীণাকে যেন বাজিয়ে ধরে।
মদন শাহের পদে তৃতীয় লাইনে রয়েছেঃ ‘ঘর আছে তার দুয়ার নাই মানুষ আছে বাক্য নাই/ কে তাহাদের আহার দেয় কেবা দেয় সন্ধ্যাবাতি।’ মদন শাহ ‘ঘর’ বলতে শরীর বুঝিয়েছেন। বাউল ভাষায় ঘর সব সময়ই স্ত্রীর প্রতিবিম্ব। বলেছেনঃ ‘ঘর আছে তার দুয়ার নেই’–দুয়ার হল দরজা। দরজা এখানে ইন্দ্রিয়দ্যোতক। আর দুয়ার নেই বলেই আলোচ্য ঘরে সন্ধ্যাবাতি দেবার দরকার নেই। ঘরই যখন অধিষ্ঠিত হয়নি, ইন্দ্রিয় তৈরি হয়নি, ক্রিয়াকৈবল্য শুরু হয়নি তখন আহারের প্রয়োজন হয়? আহার হল নাড়ির মতন। যার তরঙ্গে ওঠাপড়ার ঘর গড়ে ওঠে। আর তা তৈরি করতে পদকর্তা মদন তৈরি। এজন্য তিনি বলেছেন: ‘ছ’মাসে হয় জীবের স্থিতি ন’মাসে হয় গর্ভবতী / হয় এগারো মাসে তিনটি সন্তান/কোনটি করবে ফকিরি।
‘ছ’মাস ছটি রিপু। ‘ছ’মাসে জীবের স্থিতি–ছটি রিপু নিয়েই মানুষ থাকে তুঙ্গ তীব্রতায়। যার থেকে বেরোবার কথাই বলেন সাধক। ‘ছ’মাসের এক কন্যা’ও রিপুর ক্রিয়াত্মক কল্পনা। ন’মাসের গর্ভ–বাউল মতের নববিধা সেই ভক্তিরস। নটি চক্রের কথাও আমরা কিন্তু ভাবতে পারি। ‘এগার মাসের তিনটি সন্তান’–দশেন্দ্রিয় ও মনের সমন্বয়। এই সব একত্রিত করে এগুলো বশীভূত করে তবেই যেতে হবে সাধনা ও সংযমে। এর ফলে শ্রেষ্ঠ গুণ তিনটি সাধক শরীরে একত্রিত হবে। এই তিন গুণ হল জ্ঞান, বিবেক ও বৈরাগ্য।
শশাঙ্ক দাস বৈরাগ্য একবার আমাকে বলেছিলেন, দশেন্দ্রিয়, ষড়রিপু এগুলো সব হল গিয়ে বাবা চিনি খাওয়া রাক্ষুসি। শরীরের মধু সব খেয়ে নেয়। সাধনায় এদের আগে মারতে হবে বাবা।
‘বত্রিশ বাহু ষোল মাথা গর্ভে ছেলে কয় গো কথা/ কেবা তাহার মাতা পিতা এই কথাটি জিজ্ঞাসি। মদনের এই জিজ্ঞাসার উত্তর: ষোলমাথা = দশেন্দ্রিয় + ষড়রিপু। বত্রিশ বাহু = পঞ্চভুতের পাঁচ (ক্ষিতি,অপ, তেজ, মরুৎ ও ব্যোম) + পঞ্চগুণ বা স্বাদ (মিষ্টি, টক, লবণাক্ত, তেতো, ঝাল) + দশেন্দ্রিয় (পাঁচ কর্মেন্দ্রিয়–বাক, পাণি, পাদ, পায়ু, উপস্থ, এবং পাঁচ জ্ঞানেন্দ্রিয়–চোখ, কান, নাক, জিভ, ত্বক) + ছয় রিপু (কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ, মদ, মাৎসর্য) + আট দ্বার (দুই কান, দুই চোখ, দুই নাক, মুখ, পায়ু) = চব্বিশ। এর সঙ্গে ব্রহ্ম বস্তু দেড় আর অর্ধাংশ রজ ও বীর্য নিয়ে দেহ হয় পঁচিশ। তার সঙ্গে সাত যোগে হয় বত্রিশ। এই সাত হল সাত সাগর। শরীরের সাতটি উপাদানকে বাউল সাধক অভিহিত করেন সাত সাগরের নামে।
মূত্র (লবনসাগর),বীর্য (ক্ষীরোদসাগর),মজ্জা (দধিসাগর),চর্ম (ঘৃতসাগর), জিভ (জলসাগর), রক্ত (সুরাসাগর), রজ (ইক্ষুসাগর)। এগুলোকে ‘সপ্তধাতু’, ‘সপ্ততালা’ও বলেন বাউল। সর্বমোট এই বত্রিশটি উপাদান যা দেহস্থ ক্রমপরিণামী স্তর–বাউল তাঁর সিদ্ধির পূর্ণতা বিকাশে সেগুলো পুনর্লব্ধ নৈঃসঙ্গ করে নিয়ে সিদ্ধির অভিজ্ঞানপত্র রচনা করেন। সাধকের আখ্যাপত্রকে দূরে ঠেলে দেহসাধনার সর্বশেষ সিংহাসনটি দখল করে। বসেন। এজন্যই মদন শাহ ‘বত্রিশ বাহু সোল মাথায় গর্ভস্থ ছেলেকে’ জানতে, বুঝতে, উপলব্ধি করতে বলেছেন। মদন শা বলেছেন: ‘মাকে ছুঁলে পুত্র মরে।’ ‘মা’ কে? সাধক বাউল। ‘ছেলে’ গুরু। ‘গুরু’র পরবর্তীতে ‘শিষ্য বা সাধক বাউল’ সে জায়গাটা নিচ্ছেন। সাধনার অতল প্রয়াণ ঘটছে এখানে। গুরুর যেন মৃত্যু হচ্ছে। গুরুরূপী ছেলে মরে গিয়ে শিষ্যরূপী মা জেগে উঠছেন। শিষ্য মাতৃস্থ অবয়ব নিয়ে আবারও পরবর্তীতে তাঁর শিষ্যদের পূর্বচ্ছবিতে গুরু হয়ে মৃত্যুলাভ করবেন। এই কথা যদি কেউ অনুধাবন করতে না পারেন। তবে ‘ফকিরি’ মানে সাধনা বৃথা।
