এখন প্রশ্ন এই সাড়ে ২৪টি স্থান স্পর্শ বা চুম্বন করা হয় কেন পুরোপুরি সম্ভোগ বা মিলনের আগে? করা হয় এই কারণেই, বাউল কামে থেকে নিষ্কামী হবার কথা বলে থাকেন। তাঁরা সঙ্গিনীর এই সাড়ে চব্বিশ চন্দ্র চুম্বন বা স্পর্শ করে কামকে ভোঁতা করে। দেন। কাম তখন প্রেমের দিকে ধাবিত হয়। এমন তাঁদের সাধনার বিশ্বাস। অষ্টম চন্দ্রও স্পর্শ বা চুম্বন এ কারণেই হয় বা হয়ে থাকে। তা এই কার্যকরণ সাধক কি সঙ্গিনীকে করেন কেবল? নাকি সঙ্গিনীও সাধকের সাড়ে চব্বিশ চন্দ্র চুম্বন করে থাকেন? উত্তরে মতান্তরে আছে। তবে প্রবীন প্রাজ্ঞ বাউল শশাঙ্কশেখর দাস বৈরাগ্যের মতকে গুরুত্ব দিলে তা দাঁড়ায় সাধকই তা করেন। সঙ্গিনীকে সাধনার জন্য প্রস্তুত করে নেন সাধক।
নবকুমার আমাকে বলেছিলেন, সঙ্গিনীও সাধকের সাড়ে চব্বিশ চন্দ্রকে জাগায়।
বললাম, অনেকে বলেন সাধক তা একা করেন।
বললেন, কখনও না। দুই গণ্ডে দু’বার যে তা ওই দুজনেরই না কি?
আমি তাঁকে আর বললাম না, দুই গণ্ডকে যদি গলার দু’ধারের স্পর্শ বলি তাহলে কি খুব ভুল ধরব? একথা তাঁকে আর বলা হয়নি। তার আগেই গান ধরলেন তিনি–
যদি হয় মহাভাবুক জেলে,
ধর্ম মাছ ধরতে পারে
ভাবের দ্বারে গুরু-ভাব-ভক্তি জাল।
বুঝলাম, চন্দ্র সাধনে আমার কথা তাঁর পছন্দ হয়নি। তাই যাদুবিন্দুর পদ গেয়ে আমার ভেতর যাতে গুরু-ভাব-ভক্তি–এসব আসে তারই ইঙ্গিত দিতে চাইছেন। নবকুমার।
*****
পদকর্তা গেয়েছেন: ‘রবিশশী রয় বিমুখা/ মাস অন্তে হয় একদিন দেখা/ সেই যোগের যোগে লেখাজোখা / সাধলে সিদ্ধি হয় অনায়াসে।‘
‘রবিশশী’ ইড়া-পিঙ্গলা নাড়ি। ‘মাস অন্তে একদিন দেখা’ রজঃপ্রবাহের দিন। ‘যোগের যোগ’ মহাযোগ। এই যোগে শরীর সাধনায় সিদ্ধির কথা বলছেন লালন।
‘দিবাকর নিশাকর সদাই/ উভয় অঙ্গে উভয় লুকায়/ ইশারাতে সিরাজ সাঁই কয়/ লালন রে তোর হয় না দিশে।’
ইড়া আর পিঙ্গলা নাড়ি ‘উভয় অঙ্গ’ অর্থাৎ কিনা সাধক ও সাধন সঙ্গিনীর মধ্যে লুকিয়ে আছে। তা জাগানোই দেহসাধকের কাজ। সে কাজ বা সাধনায় সিদ্ধির করণকৌশলই লালনকে দিতে চাইছেন তাঁর গুরু সিরাজ সাঁই। গুরু সাধনার দিশা দিতে চাইছেন শিষ্যকে।
লালন এভাবেই তাঁর পদে গুরুকে অধিপতির সিংহাসন দিয়েছেন। শরীর সাধনাতে গুরুর ভূমিকা অনস্বীকার্য। গুরু ছাড়া ও পথে সিদ্ধ হবার উপায় নেই কোনো। শুধু এ পথ কেন আধ্যাত্মবাদের পথে গুরুই দিশা। শিষ্যকে অজ্ঞানতার তিমির থেকে গুরুই উদ্ধার করেন। তাই সাধক ছুটে যান গুরুর কাছে। আমাদের শাস্ত্রও সেই নির্দেশ দিয়েছে–’মধুলব্ধো যথা ভৃঙ্গ পুষ্পৎ পুষ্পরং ব্রজেৎ / জ্ঞানলুব্ধস্তথা শিষ্যো গুরুব্বন্তরং ব্রজেৎ।।‘ ভ্রমর যেমন মধুর লোভে এক ফুল থেকে আরেক ফুলে ছুটে যায়, তেমনই জ্ঞানপিপাসু শিষ্য এক গুরু থেকে অপর গুরুর আশ্রয় গ্রহণ করবে।
পিতামাতাকে গুরু হিসাবে দেখা যায়, প্রথম গুরু হিসাবে তাঁদেরই স্থান দেওয়া হয়। বাউল বলেন যে তাঁদের প্রথম জন্ম পিতার বীর্য আর মাতার রজ নিয়ে। দ্বিতীয় গুরু মন্ত্রগুরু। বাউলও এমত মানেন। তন্ত্রে মন্ত্রযোগ নিকৃষ্ট শ্রেণীর হিসাবে দেখা হয়। বাউল তা মুখে না বললেও তাঁদের তৃতীয় জন্ম গুরুর হাতেই বলেই তাঁরা মনে করেন। কেননা গুরু নির্দেশিত পথেই দেহসাধনা চলে। তবে তন্ত্রে মন্ত্রযোগ নিকৃষ্ট শ্রেণীর হলেও তাঁর একটা বিশেষ স্থান আছে। বলা হয়েছে : ‘মনোহন্যত্র শিববাহন্যত্র শক্তিরণ্যত্র মারুতঃ। / ন সিধ্যন্তি বরারোহে কল্পকোটিশতৈরপি।’ মন্ত্র জপের সময়ে মন, পরম শিব, শক্তি এবং বায়ু পৃথক পৃথক স্থানে থাকলে অর্থাৎ এদের একত্র সংযোগ না হলে শতকল্পেও মন্ত্রসিদ্ধি আসে না। বলা হয়েছে: ‘মন্ত্ৰাৰ্থং মন্ত্ৰচৈতন্যং যোনিমুদ্রাং ন বেত্তি যঃ। / শতকোটিজপেনাপি তস্য বিদ্যা ন সিধ্যাতি।।’ মন্ত্ৰার্থ, মন্ত্র চৈতন্য, যোনিমুদ্রা না জেনে শতকোটি জপ করলেও মন্ত্রে সিদ্ধিলাভ হয় না। কেননা শরীরস্থ চক্রে যোনিমুদ্রাতে দেবদেবীর প্রতীকী রূপের কল্পনা রেখেই সাধক ধ্যানজপ করেন তাই সেগুলো সম্পর্কে সঠিক অভিহিত না থাকলে মন্ত্রজপে শরীর শক্তির জাগৃতি আসতে পারে না কিছুতেই। তন্ত্রসাধক বলেন তন্ত্র। ক্রিয়াকরণের যোগ। বাউল সাধক তা না বললেও এই সিদ্ধি ক্রিয়াকরণেরই সিদ্ধি। বলা হয় মন্ত্রের মধ্যে যে প্রাণশক্তি তা থাকে মণিপুর চক্রে–’মণিপুরে সদা চিন্তাং মন্ত্রাণাং প্রাণরূপকম্। মণিপুরে মন্ত্রের প্রাণরূপ সর্বদা কল্পনা করবে। মন্ত্রের প্রাণ জেনে ক্রিয়া না করলে মন্ত্রচৈতন্য কখনওই আসবে না। গুরুমন্ত্রকে সুষুম্নার মূলদেশে জীবরূপে চিন্তা করে মন্ত্র জপ করলে মন্ত্ৰার্থ ও মন্ত্রচৈতন্য আসে, তাই বলে থাকেন সাধক। ‘মূলমন্ত্র প্রাণবুদ্ধ্যা সুষুম্নমূলদেশকে। / মন্ত্ৰার্থং তস্য চৈতন্যং জীবং ধ্যাত্বা পুনঃ পুনঃ।।’
বাউলের চতুর্থ জন্ম হয় সিদ্ধিতে। আর সিদ্ধিতে ‘চন্দ্রসাধন’ অনিবার্য। বাউল তাঁর দেহতত্ত্বের গানে চন্দ্রসাধনের চাঁদের কথা বার বার বলে থাকেন।
মদন শাহের পদ:
চাঁদের গায়ে চাঁদ লেগেছে আমরা ভেবে করব কি
ঝিয়ের পেটে মায়ের জন্ম তারে তোমরা বল কি।
ঘর আছে তার দুয়ার নাই মানুষ আছে বাক্য নাই
কে তাহাদের আহার দেয় কেবা দেয় সন্ধ্যাবাতি।
ছ’মাসে হয় জীবের স্থিতি ন’মাসে হয় গর্ভবতী
হয় এগারো মাসে তিনটি সন্তান
কোনটি করবে ফকিরি।
বত্রিশ বাহু সোল মাথা গর্ভে ছেলে কয় গো কথা
কেবা তাহার মাতা পিতা এই কথাটি জিজ্ঞাসি।
বলে মদন শা ফকিরে মায়ে ছুঁলে পুত্র মরে
এই চার কথার অর্থ বললে তারই হবে ফকিরি।
