পদকর্তা বলেছেন : ‘অমাবস্যায় পূর্ণিমা যোগে আজব-সম্ভব সম্ভোগ / জানলে খণ্ডে এ ভব রোগ / গতি হয় অখণ্ড দেশে।’
‘আজব-সম্ভব সম্ভোগ’ হল বাউলের কাম জয়ের সম্ভোগ। প্রেমে রূপান্তর হয় কাম তাঁদের ভাষায় ‘চন্দ্ৰসাধনা’ করলে। আর সিদ্ধিতে সাধকের স্থান হয় ‘অখণ্ড দেশে’। আর তার জন্যই সাধনভজন। গোপালের ‘চন্দ্ৰসাধন কর রে মন সময় থাকিতে’ গানটির কথা বলেছিলাম আমরা। গোপাল বলছেন সেখানে চারটি চন্দ্র মন আর পবন চার জা’গাতে চারের আসন / আর আতস খাক বাদে মিলন চলন চারেতে / লাল জরদ সিয়া সফেদ চারটি রঙেতে। / চার মঞ্জিলে খেলছে তারা রয়েছে চার হিকমতে। / চার কুতুব আর ষোল প্রহরী একশ আট চন্দ্র তাইতে ধরি / রয়েছে সব সারি সারি ধরাধরিতে।।/ অদ্য হয়ে সাড়ে চব্বিশ হয় জাহেরাতে / সাড়ে চারকে সাধলে পাবি সিদ্ধি হবে চার যুগেতে।।’
চন্দ্রের কথা কিছু আগেও বলেছি আমরা। বাউলের চন্দ্রে আছে শরীরের বর্জ্য পদার্থ, বাঁ নাকের শ্বাস, বিভিন্ন দেহাঙ্গ, এমন কী নখ পর্যন্ত। এগুলোর সাহায্যেই তাঁরা চান্দ্র ঘটনাতে সামিল হন। ‘চান্দ্র ঘটনা’ হল সঙ্গিনীর রজঃপ্রবাহ। এই রজঃপ্রবাহের মধ্যেই চলে সাধনা। সাধনার সঙ্গী চার চন্দ্র–দুই বর্জ্য আর দুই শরীরের রজ-বীর্য। ‘মন আর পবন’ অর্থাৎ কিনা যুগল মনের একাত্মতা এবং যুগল বায়ু বাঁ শ্বাসের গুরু শেখানো রপ্তকৌশল। চার জায়গাতে চলে চারের আসন। চারটি জায়গা চারটি দিক–পূর্ব, পশ্চিম, উত্তর, দক্ষিণ আর চারের সাধন আদি, নিজ, উন্মত্ত, গরল–যা কিনা দুই বর্জ্য ও রজ বীর্যেরই মতান্তর। চার রঙ–জরদ, সফেদ, সিয়া, লাল–তা হলে রজের চারদিনে পরিবর্তিত রূপ। স্রোতধারার চারদিনে চার রঙ ধারণ করে রজ। মতান্তরে স্রোতধারা বা রজঃপ্রবাহের তিন দিনে দিন রঙের হয় সঙ্গিনীর রজ–সফেদ, সিয়া, লাল। চার কুতুব চারদিক। ‘ষোল জন প্রহরী’ হল–ষড়রিপু আর দু’ভাগের পাঁচ পাঁচ করে দশেন্দ্রিয়। ‘একশ আট চন্দ্র’–অষ্টম পাশের আট আর ছয় চক্রের পদ্ম পাপড়ির একত্র যোগফল। সেজন্য বলা রয়েছে রয়েছে সব সারি সারি। আমাদের শরীরকে স্থূল শরীর হিসাবে দেখে থাকেন প্রথমে বাউল সাধক। এই স্থূল দেহ ত্যাগ হলে আসে জ্যোর্তিদেহ। তারপর মানসদেহ ও নিমিত্ত দেহের প্রতিষ্ঠান। বিজ্ঞানেও কিন্তু এই তিন স্তরের উল্লেখ আমরা পাই। Astral body (জ্যোর্তিদেহ), Mentral body (মানসদেহ), Casual body (নিমিত্ত দেহ)। ছয়টি যে চক্র বললাম তা মানব শরীরে বর্তমান। ইংরাজিতে মানবদেহ বলা হচ্ছে হিউম্যান বিং। Human এর Hue রঙ বা Colour Being হল আলো বা light. Human Being faces oftco IGT colour menifextation in light সুতরাং এভাবে দেখলে দেহ রঙপেন্সিলের একটা বাক্স। তার আধারে ছটি চক্র। মূলাধার (Root), স্বাধিষ্ঠান (Abdomen), মণিপুর (Solar Plexus), অনাহত (Heart), বিশুদ্ধ (Throat), আজ্ঞা (Third Eye)। যেটা বোঝাতে চাইছি এই সব প্রতীকী কল্পনাতেও কিন্তু বিজ্ঞান রয়েছে। গাঠনিক সেই অভিধাকে মেনেই চক্ৰ কল্পিত প্রতীকী নামকে ধরে রেখেছে।
বাউল বলেন কারণবারি, রস বা রজ। যা দেহেরই অন্তর্গত পদার্থ বাউলের যে যুগলমিলন তা ঘটে কিন্তু জ্যোর্তিদেহে। বাউল যাকে প্রবর্ত স্তর বলেন আর কী। এই স্তরে তিনি শেখেন শ্বাসাদির কাজ, আসন। সাধক স্তরে যুগল দেহ বাউল মতের ‘ভাবদেহ’ হবার জন্য পাঠ গ্রহণ করে। এই হল মানস দেহ। সিদ্ধিস্তর বাউলের নিমিত্ত দেহ। বিজ্ঞানে, প্রাণে এই তিনাবস্থার উল্লেখ আছে কিন্তু। বাউলের যে সাড়ে চব্বিশ চন্দ্র সাধনা তা যুগল মিলনে সসীমকে আসলে অসীম করে দেওয়া। তার জন্যই সাধক দেহের প্রত্যেকটি অঙ্গ প্রত্যঙ্গের মধ্যে দিয়ে অসীমের জন্য গোপন সংকেত রাখেন। সেই সংকেতের ইন্দ্রিয়গুলোর সাহায্য তিনি নেন। খোঁজাখুঁজি করেন লক্ষ্যস্থলটির জন্য। চতুর্দশ স্থল মঞ্জরীর কথা বলেন সাধক। বলেন শরীরের মধ্যে চোদ্দ কমল ফোটে কীভাবে ফোটে এই কমল? কপালে ভানু মঞ্জরী, চোখে রূপ মঞ্জরী, নাকে কস্তুরী মঞ্জরী, জিভে রস মঞ্জরী, কানে গুণ মঞ্জরী, গলায় ভূঙ্গ মঞ্জরী, দুই স্তনে রঙ্গ মঞ্জরী, নাভিতে লবঙ্গ মঞ্জরী, কোমরে কিঙ্কিণী। মঞ্জরী, লিঙ্গে রতি মঞ্জরী, উরুতে মোহন মঞ্জরী, পায়ে পদ্ম মঞ্জরী, হাতে বিলাস মঞ্জরী, হৃদয়ে প্রেম মঞ্জরী। সাধক বাউল সাড়ে চব্বিশ চন্দ্রে ও অষ্টম চন্দ্রে যে প্রত্যঙ্গগুলো স্পর্শ করেন সেখানে কিন্তু বৈষ্ণবীয় আধারের চোদ্দ মঞ্জরীই বর্তমান। সাধন-করনখে চুম্বন। করেন পুরুষ ও প্রকৃতি। অর্থাৎ কিনা তাঁরা বিলাস মঞ্জরীতে বিচরণ করেন তখন। যা কিছু চাওয়া-পাওয়া সব তাঁরা নষ্ট করে বসেন। পদনখে যখন চুম্বন চলে তখন থেকেই বর্ধিত শোভা উপরের দিকে উঠতে থাকে। পায়ে পদ্ম মঞ্জরী বর্তমান। শোভা খুলতে থাকে প্রতীকী এই পদ্মরূপে। গলাতে যখন চুম্বন চলে তখন যেন ভ্রমরের মতোই স্বর নিক্ষিপ্ত হয় (যাকে। কামশাস্ত্রে শীকার বলছে)। গলায় তাই ভৃঙ্গ মঞ্জরীর কল্পনা। অধরে বা ঠোটস্থ চুম্বনের অর্ধস্ফুট আওয়াজও ভৃঙ্গ মঞ্জরীতে আমরা রাখতে পারি। জিভের চুম্বনে লালা নির্গত হতে থাকে, মিশে যেতে থাকে তা এ-জিভে ও-জিভে। এখানে রস মঞ্জরীর অবস্থান। ললাটে চুম্বনকালে তেজ বা জ্যোতি নির্গত হতে থাকে। মনে রাখতে হবে ব্রহ্মরন্ধ্র কিন্তু সহস্রার চক্রতেই বিরাজমান। একে ভানু মঞ্জরী হিসাবে প্রতীককল্প দিচ্ছেন সহজিয়া বৈষ্ণব। অষ্টম চন্দ্রের মুখে যদি চুম্বন চলে তাহলেও সেটাকে ভৃঙ্গ মঞ্জরীরে রাখতে পারি আমরা। কেননা মুখ থেকেই মধুর বচন নির্গত হয়। স্তনের চুম্বনে আমোদ বা আনন্দ লাভ হয়। একে বলা হচ্ছে রঙ্গ মঞ্জরী। হাতের চুম্বনেও বিলাস মঞ্জরীকে ভাবতে পারি। বুকের চুম্বনে প্রেম মঞ্জরীকে। বুকের ভেতরই তো মন বা হৃদয়ের সিংহাসনকে রাখি আমরা। নাভি চুম্বনে ফুল। আধার দিলে তা অবশ্যই লবঙ্গ মঞ্জরী। যোনি চুম্বনকে উরুর মোহন মঞ্জরীর প্রতীক হিসাবে কল্পনা করে নিতে পারি।
