রজঃপ্রবাহকে বাউল বলেন রজঃস্নান। এই স্নানের চারটি গালভরা নামও আছে। গরল, উন্মাদ, রোহিনী, বাণ। চার নামই স্পষ্ট করে রজঃযোগ চারদিন। প্রথমদিন গরল। মানে হল বিষ। সেই বিষকেই সাধক সুধা করে দেন। দ্বিতীয় দিন উন্মাদ। বাউল বলেন জোয়ার শুরু হল। একে তাঁরা অমাবস্যাও বলে থাকেন। ঘোর অমাবস্যার তৃতীয় দিন। রোহিণী। রোহিণী কিন্তু চাঁদ প্রতীকের সামঞ্জস্যতা রাখছে। চন্দ্ৰপত্নী হলেন রোহিণী। বাউলের চন্দ্রনাড়ি জাগছে আর চন্দ্রপত্নী তৃতীয় দিনে যোগ্য সঙ্গিনী হয়ে সাধককে সাহায্য করছেন। সাধক চতুর্থ দিনে বাণে সিদ্ধ হচ্ছেন। বাণ বলতে কিন্তু বাউল লিঙ্গকে চিহ্নিত করেন। এই বাণকে উৰ্দ্ধরেতা দেন সাধক। বীর্য নিম্নগতি পায় না। তবে এই চারটিকে রজঃস্নানের চারটি দিনের রজঃপাতের নাম হিসাবেই দেখেন তাঁরা। স্নাননাম যদিও অনেকে বলেন। এই বৈপরিত্য গুরু অভিহিতের ফল। গুরু যেমন বলে থাকেন সাধককে, সাধক বাউল সেভাবে, সে নামে চিহ্নিত অরে থাকেন। ‘চারিচন্দ্র’ বলতে অনেকে আবার মল, মূত্র, রজ, শুক্র না বলে বলেন আদি, নিজ, উন্মত্ত, গরল। আদি হল আমিসত্ত্বা। নিজ হল নিজের মল-মূত্র। উন্মত্ত হল সঙ্গিনীর রজ। গরল হল গিয়ে শুক্র। বীর্যকেই তাঁরা অমৃত করে নেন, মানে বীর্যকে উধ্বপ্রবাহ দিয়ে ‘অধর মানুষ’, ‘অটল মানুষ’ হয়ে যান। অধর, অটল হল সিদ্ধ স্তরের দশা। স্কুল, প্রবর্ত, সাধক পেরিয়ে সিদ্ধ স্তরে তিনি ব্যক্তির উচ্ছ্বাস ঝেড়ে ফেলে দিয়ে সহজ হয়ে ভক্ত শিষ্যদের সামনে নিমগ্নতার আততিকে তুলে ধরেন। মত বিনিময় করেন।
সাড়ে চব্বিশ চন্দ্র হল করনখে দশ, পদনখে দশ, দুই গলায় দুই, অধরে এক, জিভে এক, কপালে দেড়। অষ্টম চন্দ্র বা অষ্টম ইন্দুর কথাও বলে থাকেন বাউল। ‘অষ্টম চন্দ্র’ হল মুখ এক, স্তন দুই, হাত দুই, বুক এক, নাভি এক, যোনি এক।
প্রশ্ন হল সংখ্যা চিহ্নিত এই প্রত্যঙ্গগুলোতে কী কাজ হয়ে থাকে? দেহ যখন দেহাতীত হয়ে ওঠে; বস্তুঙ্খলন থেকে উর্ধ্বে বিরাজ করে দেহ, রজঃবীজের নিয়ন্ত্রণ চলে এসে দেহ সংবৃত নির্জন হয়ে পড়ে যুগল মিলনে তখন সাধক ও সঙ্গিনীর এই সব প্রত্যঙ্গ মারফৎ স্বকীয় মৃত্যু ঘটে। এখানে চুম্বনে আত্মবিস্মৃত মগ্নতা আসসে। সাধক ও সঙ্গিনী ভুলে যান নিজস্বতা। সঙ্গমরত মানবশরীর সঙ্গমের ঊর্ধ্বে উঠে উপমেয়কেই যেন খুঁজে পায়। উপমেয় হল বাউল মতে, কামের মধ্য থেকে কামকে হেঁটে বাদ দিয়ে নিষ্কামী হওয়া। আর কামকে বাদ দেবার সাধনা গুরুই শেখান। সেজন্যই তা হল রপ্ত এক কৌশল। যে কৌশলে ‘সাড়ে চব্বিশ চন্দ্র’ ও ‘অষ্টম চন্দ্রের’ ব্যবহার অনিবার্য। এগুলো সবই সঙ্গমের। উপান্ত দশায় এসে গুরু নির্দেশিত সব পূর্ণচ্ছেদ। অমোঘ টানে বা আকর্ষণে প্রত্যঙ্গের ওসব স্থানে কখনও সংখ্যাচিহ্নিত চুম্বন, স্পর্শ ইত্যাদি কোনওভাবে সম্ভবপর নয়। এগুলোকে গুরুর সুমুদ্রিত স্বাক্ষর হিসাবেই শুধু দেখা ভালো। তবে ঊধ্বরেতা যথেষ্টই শরীর রপ্তের কাজ। কঠোর যোগসাধন না হলে তা হবে না। কী তন্ত্রে, কী বাউলে, দেহ সাধনায় সাধক সঙ্গমস্থ দশায় বীর্যকে উর্ধেরেতা দান করেন। তবে সন্ন্যাসী তো আর শরীর ছোঁন না, তাঁরা বলেন স্ত্রীসঙ্গে বিন্দুনাশ হয়। বিন্দুনাশ হলে আত্মক্ষয় ও সামর্থহীনতা আসে–’যদি সঙ্গং করোতেব বিন্দুস্তস্য বিনশ্যতি। আত্মক্ষয়ে বিন্দুহানাদসামর্থঞ্চ জায়তে।।‘ ‘পীত্বা মোহময়ীং প্রমোদমদিরামুন্মত্তীভূতং জগৎ’। ভর্তৃহরি এই কথা বলেছেন। বলেছেন মোহময়ী। প্রমোদরূপ মদিরা পান করে এই অনন্ত জগৎ উন্মত্ত হয়ে আছে। ‘ভগেন চৰ্ম্মকুণ্ডেন। দুর্গন্ধেন ব্রণেন চ। / খণ্ডিতং হি জগৎ সৰ্ব্বং সদেবাসুরমানুষ।।‘ এই আকর্ষণ থেকে। উদ্ধার পাবার পথ কী? অভ্যাস আর সংযম। সন্ন্যাসী তা রপ্ত করেন। তাঁরা ব্রহ্মবস্তু বলেন বীর্যকে। শরীরে তা আছে বলেই আনন্দ। যোগসাধনে বিন্দুধারণ না হলে উন্নতি সম্ভবপর। নয় কখনোই। ‘যোগিনস্তস্য সিদ্ধিঃ স্যাৎ সততং বিন্দুধারণাৎ।’ সতত বিন্দুধারণ করলে। যোগীগণের সিদ্ধি হয়। তাঁরা বলেন বীর্য সঞ্চিত হলে পরে মস্তিষ্কে প্রবল শক্তি সঞ্চয় হয়। এই শক্তির বলে একাগ্রতা সাধন হয়। সাধক অনেক উপরে উঠতে পারেন। সংসার ছাড়ার কথা বলেন সন্ন্যাসী। অর্থাৎ সংসারের ‘সং’ ছেড়ে ‘সার’কে গ্রহণ করতে বলেন তাঁরা। দুরাশার অন্ধকারে না ডুবে অসার রূপে ‘সং’ না সেজে ‘সার’ হয়ে সংসারে আশার সুধা ভরার কথা বলে থাকেন তাঁরা। সংসারে সার প্রসার করতে বলেন তাঁরা। অর্থাৎ শরীরের যোগ শরীরের উপাদানকে শরীরে রেখে শরীরকে পাশব-বাসনা থেকে মুক্ত রাখেন তাঁরা।
যুগল সাধনে ‘সার’ গ্রহণ হয় ঠিকই কিন্তু সংসারের ‘সং’ কিছু থাকে ঠিক। সে অন্যত্র আলোচিত বিষয়। বাউল তাঁর শরীর সংবেদিতার মন্ত্র বলে থাকেন গানে। যেমন লালন বলেছেন–’না জেনে করণ কারণ কথায় কথায় কি হবে/ কথায় যদি ফলে কৃষি তবে বীজ কেন রোপে? / গুড় বললে কি মুখ মিঠা হয়/ দিন না জানতে আঁধার কি যায়/ তেমনি জেনো হরি বলায় হরি কি পাবে।
বাউলের পৃথিবী এই পাওয়ার প্রতীকী উত্তরাধিকারকে সবসময় ধরে রাখে গানে। গান তাই বাউলের সাধন অনুভূতির ভাষা। গান তাঁর যথাযোগ্য আলোরই বৈরাগ্য। সেদিকেই আমরা মুখ ফেরাব।
